আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ঠিকঠাক রেখেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উন্মুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন জোটের প্রধান নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন অর্থবহ করতে হলে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য নির্বাচন উন্মুক্ত রাখতে হবে। সবাই দাঁড়ান, যিনি জিতে আসতে পারেন।’ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসন বণ্টন নিয়ে গতকাল সোমবার গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হয়ে এ বৈঠক চলে কয়েক ঘণ্টা। শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় রাতের খাবারের আয়োজন ছিল।
বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচন উৎসবমুখর করতে আমি চাই প্রত্যেক আসনই উন্মুক্ত থাকুক। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবাই জিতে আসুক। নির্বাচন উৎসবমুখর করতে এটা চাই আমি।’
তবে প্রধানমন্ত্রীর উন্মুক্ত নির্বাচনের মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন জোটের অন্য নেতারা। তারা আসন সমন্বয় ও জোটগতভাবে নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেন। অন্ততপক্ষে বর্তমান সংসদে রয়েছেন জোটের এমন চার নেতার নির্বাচনী আসনে সমঝোতার জন্য শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানান জোটের অন্য দলের নেতারা। বর্তমান সংসদে আওয়ামী লীগ ছাড়াও জোটের আরও চারটি দলের প্রতিনিধিত্ব ছিল, সেটা যেন থাকে সেই অনুরোধ করা হয় প্রধানমন্ত্রীকে। বর্তমান সংসদে থাকা ১৪ দল নেতারা হলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাসদের হাসানুল হক ইনু, তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী ও জাতীয় পার্টির (জেপি) আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা দেশ রূপান্তারকে বলেন, শেষ পর্যন্ত আসন ছেড়ে দেওয়া হতে পারে জোটের এ চার নেতাকে। তবে জোটের অন্য যেসব নেতা নির্বাচন করবেন, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই নির্বাচনে জিতে আসতে হবে। উন্মুক্ত নির্বাচনে সায় না দেওয়ায় বৈঠকে আলোচনার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুর নেতৃত্বে একটি টিম করে শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলা ও আসন সমন্বয়ের দায়িত্ব দেন। এই টিম শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে বিস্তারিত আলোচনার তথ্য জোট নেতা শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেবে দুয়েক দিনের মধ্যে।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা জোটের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়ে আরও বলেন, মেনন, ইনু, নজিবুল বশর ও মঞ্জুর আসনে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জোটের বাকি আসন উন্মুক্ত রাখা হবে। এ চারজন ছাড়া জোটের সব প্রার্থীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই আসতে হবে। বৈঠকের একপর্যায়ে জোটের শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া সংসদ সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘৬০ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে আমি জনপ্রতিনিধি হতে পারিনি। আমার আকাক্সক্ষা রয়েছে জনপ্রতিনিধি হওয়ার। আমাকে সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করছি।’ তিনি চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। দিলীপ বড়ুয়া আরও বলেন, ‘সুযোগ না পেলেও ১৪ দলে আছি, থাকব।’ এ সময় ১৪ দলকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন তিনি।
জোটের আরেক শরিক কমিউনিস্ট কেন্দ্রের নেতা ডা. অসিত বরণ বলেন, ‘আমরা আসন ভাগাভাগি করতে আসিনি। বলতে এসেছি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জোট ১৪ দলকে আরও শক্তিশালী করা হোক।’
সবার বক্তব্য শেষে জোটের প্রধান নেতা শেখ হাসিনা বলেন, ‘শ্রমিক ইস্যু নিয়ে আমেরিকা বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। এত কমমূল্যে শ্রমিক পৃথিবীর আর কোথায় পাবে তা আমিও দেখব। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। আমি ভয় পাই না। সবাই আমাকে প্রশ্ন করে এত সাহস পাই কোথায়? আমিও বলি, আমার সাহস এ দেশের জনগণ। জীবন দিয়ে হলেও মানুষের পাশে থাকব।’
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও দলীয়ভাবে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছে। এবার জোটগতভাবে নির্বাচন হবে কি না আর হলেও আসন বণ্টনের সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। এ নিয়ে জোটের শরিক দলগুলো একধরনের ধোঁয়াশায় রয়েছে। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ থাকলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না শরিক দলের নেতারা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৮টি দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে শরিক জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর কুষ্টিয়া-২ ও জাতীয় পার্টির সেলিম ওসমানের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে প্রার্থী দেয়নি দলটি। এ ছাড়া শরিকদের বাকি সাতটি এবং বিকল্পধারার দুটি আসনেও দলীয় প্রার্থী দেয় আওয়ামী লীগ।
