হাফেজ মিসবাহ উদ্দীন। ফরিদপুর ও আশপাশ অঞ্চলের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে হেফজ সম্পন্ন করেছেন, যাদের অনেকেই এখন কোরআনের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন দেশ-বিদেশে। এ অঞ্চলে কোরআনের আধুনিক মশকসম্পন্ন তেলাওয়াত এসেছে তার হাত ধরে। তার জীবনের সেসব নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন দেশ রূপান্তরের কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বেলায়েত হুসাইন
দেশ রূপান্তর : হেফজ বিভাগে পড়াচ্ছেন কত বছর হলো? আপনার কাছে পড়ে হাফেজ হয়েছেন কতজন ছাত্র এবং তাদের পড়ানোটা কেমন উপভোগ করেন?
হাফেজ মিসবাহ উদ্দিন : হেফজ বিভাগের শিক্ষক হিসেবে আমার পথচলা শুরু ১৯৯৫ সালে। প্রথমে একজন, পরে দুজন ছাত্রকে নিয়ে হেফজ পড়ানো শুরু করি। ১৯৯৪ সাল থেকে একটি মসজিদে খেদমতের মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা। ওই মসজিদেই ওদের আমি পড়াতাম। আমার কাছ থেকে কতজন হেফজ সম্পন্ন করেছে- এই হিসাব সঠিকভাবে বলা মুশকিল। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১১ সাল এই সময়ের মধ্যে গড়ে প্রতি বছর ২৫-৩০ জন ছাত্র আমার কাছে হেফজ শেষ করেছে। বর্তমানে আমার ছাত্র সংখ্যা তিনশোরও বেশি। এখন প্রতি বছর অন্তত ৫০ জন ছাত্র আমার কাছ থেকে হেফজ শেষ করে।
আর হেফজ বিভাগে শিক্ষকতায় আমি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই কোরআনের খেদমত এবং এই পরিবেশে থাকতে। কোরআনের সঙ্গে থাকা এবং ছাত্রদের নিয়ে কোরআন চর্চায় দিল ও মনে এক অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করি। যে প্রশান্তি অন্য কোথাও পাই না।
দেশ রূপান্তর : হেফজ বিভাগে পড়ানোর ভালো দিক কোনটি? এখানে পড়ানোতে বিরক্তি আসে কিনা?
হাফেজ মিসবাহ উদ্দীন : আমার কাছে হেফজখানায় পড়ানোর খারাপ কোনো দিক নেই, এখানে পড়ানোর মধ্যে সব দিককেই আমার কাছে ভালো লাগে এবং কোরআনের সঙ্গে সারাক্ষণ থাকা- এটাই সবচেয়ে ভালো মনে করি। পাশাপাশি হেফজখানায় পড়ানোর মধ্যে আমি কখনোই কোনো প্রকার বিরক্তি অনুভব করি না, তা যত সময়ই হোক না কেন। তবে, এই সময়ের ছাত্র এবং অভিভাবকদের কিছু আচরণে কষ্ট লাগে, কিন্তু বিরক্তি হই না।
দেশ রূপান্তর : শুরুর জীবন ও বর্তমান সময়ে হেফজখানায় শিক্ষকতার মধ্যে কি কোনো বিশেষ পরিবর্তন অনুভব করেন?
হাফেজ মিসবাহ উদ্দীন : শুরুর জীবন ও বর্তমান জীবনের শিক্ষকতার মধ্যে বিস্তর ফারাক। আগে কাঁচামাটির পাত্র তৈরির মতো ছাত্রদের গড়ে তুলতে পারতাম, এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিভাবকদের মনমতো ছাত্রদের গড়ে তুলতে হয়। এটা এমন হয়- যে ডাক্তার রোগমুক্তির জন্য তেতো ওষুধ দিলে অভিভাবক বলে ওঠেন- স্যার, আমার বাচ্চা তেতো ওষুধ খেতে পারে না, ওকে মিষ্টি ওষুধ দিন!
দেশ রূপান্তর : হাফেজ হওয়ার পর অনেকেই জেনারেল পড়াশোনা করতে চায়, তাদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী? নাকি হাফেজদের কওমিতে পড়াই নিরাপদ?
হাফেজ মিসবাহ উদ্দীন : আসলে যুগের চাহিদা হিসেবে প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক আলেমের কর্তব্য, একজন আলেমকে কেমন হতে হবে, সে বিষয়ে বলতে গেলে অবশ্যই উসমানীয় খেলাফতকে বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়! হাফেজ হওয়ার পর যদি কেউ জেনারেলে পড়াশোনা করতে চায়, আমাদের দেশের অবস্থা অনুযায়ী কাফিয়া বা শরহে জামি পড়ার পর অবশ্যই কোনো মুরুব্বির তত্ত্বাবধানে থেকে ওই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে। একজন হাফেজ বা আলেম হোক তার ইমান, আমল, আখলাক এগুলো ঠিক রাখতে কওমি মাদ্রাসাই সবচেয়ে নিরাপদ।
দেশ রূপান্তর : আপনার কোন শিক্ষকের আদর্শ দ্বারা আপনি অনুপ্রাণিত?
হাফেজ মিসবাহ উদ্দীন : বেশ কয়েকজন শিক্ষকের কাছে হেফজ পড়ার সুযোগ হয়েছে। তারা হলেন- হাফেজ মাওলানা আবুল খায়ের, হাফেজ মাওলানা নেয়ামত উল্লাহ, হাফেজ মাওলানা মোজাম্মেল। তন্মধ্যে হাফেজ মাওলানা কারী মোজাম্মেল (ইমাম, কাতার) সাহেবের কাছে আমি পড়া ঠিক করেছি। হেফজ জগতে আমি সবচেয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছি হাফেজ কারী ইদ্রিস সাহেবের মাধ্যমে, তার মাধ্যমেই আমি মেহনত করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি, মশক শিখি ও বিভিন্ন কারীদের সঙ্গে পরিচিত হই।
দেশ রূপান্তর : বর্তমানে হেফজখানার ক্লাস রুটিন কেমন হলে ভালো হয় বলে আপনি মনে করেন?
হাফেজ মিসবাহ উদ্দীন : হেফজখানার ২৪ ঘণ্টার যে রুটিন- এতে কিছুটা সময় কমিয়ে আনা যায়। তাতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন- সৌদি আরবে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত হেফজ পড়ে। অন্য সময় অন্যান্য পড়ালেখা করে। আর হেফজ এক শিক্ষকের কাছেই পড়া উত্তম। সাধারণত হেফজখানায় প্রতিদিন ‘সবক, সাতসবক, আমুখতা’ এই তিন রকমের পড়াশোনা হয়। এই প্রত্যেকটি পড়াই একটি আরেকটির পরিপূরক। প্রতিটি শিক্ষকের পড়ানোর পদ্ধতি ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। যেকোনো একজন শিক্ষক কোনো বিষয়ে অবহেলা করলেই অন্য দুইজন এগিয়ে যেতে পারবে না। অনেক সময় আবার মতানৈক্যেরও সৃষ্টি হয়। এজন্য নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে নির্দিষ্ট ছাত্র থাকাই উত্তম।
মূল কথা, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেকে নিজের সুবিধা অনুযায়ী রুটিন সাজিয়ে নেয়, সুন্দর নিয়মে করা প্রত্যেক রুটিনকেই শ্রদ্ধা করি। তবে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর করা রুটিনটাই সবচেয়ে উত্তম।
দেশ রূপান্তর : হেফজ শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্দেশে কোনো পরামর্শ!
হাফেজ মিসবাহ উদ্দীন : শিক্ষকদের উদ্দেশে বলতে গেলে, তিনটি বিষয় খেয়াল রাখলে প্রত্যেক শিক্ষকই শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হতে পারেনÑ প্রথমত, মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ; খুব প্রয়োজন ছাড়া ক্লাসের সময় মোবাইল ব্যবহার করবে না। দ্বিতীয়ত, একনিষ্ঠতার সঙ্গে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই খেদমত করা। এছাড়া গোনাহমুক্ত জীবনযাপন ও ছাত্রদের জন্য আন্তরিকভাবে মেহনত করা। প্রতিটি সময়ের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে মাথায় রাখা- হক্কুল ইবাদ রক্ষা করা।
ছাত্রদের উদ্দেশে বলব একটা বাচ্চা হেফজখানায় আসার আগে অবশ্যই তার নাজেরা খুব ভালোভাবে শেষ করে হেফজখানায় আসতে হবে, কেবলমাত্র নাজেরা দুর্বল থাকার কারণে অনেক ছাত্র হেফজখানা থেকে ঝরে যায়।
সাক্ষাৎকার গ্রহণে সহযোগিতা করেছেন মাহমুদ আল হানাফি
