সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে অগম্য জায়গা ব্রিটিশ রাজপরিবার। মাঝে মাঝে এ পরিবারের কিছু ঘটনা বাইরে এলে শুরু হয় তোলপাড়। সাম্প্রতিক এক ঘটনাই তার প্রমাণ। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
বাংলায় কৌতূহল ছিল ঠাকুরবাড়ি নিয়ে। কী হতো সেই বাড়ির অন্দরে তা নিয়ে লেখালেখিও হয়েছে অনেক। বহুল পঠিত বইও আছে। যদিও সাহিত্যে নোবেলজয়ী অমর কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের বাড়ির অন্দরের ঘটনাবলি খুব বেশি অজানা নেই আর। তবে হাজারেরও বেশি বছর ধরে টিকে থাকা বর্তমান ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্দরমহলের ঘটনাবলি অনেকটাই অজানা। যে কারণে সামান্য একটু ঘটনা বেরিয়ে এলেই হইচই পড়ে যায়। সম্প্রতি তেমন একটি ঘটনা আবার সামনে এসেছে। ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক ওমিড উইলিয়াম স্কোবির লেখা ‘এন্ডগেম’ বইয়ের একটি তথ্য ব্রিটিশ পরিবারকে নতুন করে বিতর্কে ফেলেছে। ওই তথ্যের কারণে বইটি বাজার থেকে তুলেও নেওয়া হয়েছে।
এন্ডগেম
রয়টার্স তাদের ৩০ নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে জানায়, অপরাহ উইনফ্রের সঙ্গে প্রিন্স হ্যারি এবং তার স্ত্রী মেগানের প্রায় তিন বছর পরে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে আবার ঝাঁকুনি লেগেছে। ২০২১ সালে ওই শোতে সাক্ষাৎকারে মেগানের বক্তব্য ছিল এমন যে, তার মা কৃষ্ণাঙ্গ এবং বাবা শ্বেতাঙ্গ হওয়ার কারণে ছেলে আর্চিকে যখন তিনি গর্ভে ধারণ করছিলেন তখন জন্মের পর শিশুর গায়ের রঙ কতটা কালো হতে পারে সে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং কথোপকথন হয়।
রয়টার্স জানায়, তবে ওই দম্পতি কে এমন মন্তব্য করেছিলেন তার নাম প্রকাশ করেনি। যদিও উইনফ্রে পরে স্পষ্ট করেছিলেন যে, শিশুর গায়ের রঙ নিয়ে করা মন্তব্যটি প্রয়াত রানী এলিজাবেথ বা তার স্বামী প্রিন্স ফিলিপের নয়।
তাদের ওই সাক্ষাৎকারের পর ক্ষোভ জানিয়ে বাকিংহাম প্রাসাদ রানীর পক্ষে একটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, স্মৃতি থেকে বলা কথা সবসময় ঠিক হয় না। তারা ব্রিটিশ রাজপরিবারে কখনো বর্ণবাদ ছিল না বলে দাবি করে।
অবশ্য প্রিন্সেস ডায়ানা ও বর্তমান রাজা চার্লসের ছোট ছেলে হ্যারি চলতি বছর এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি বা মেগান কেউ তাদের পরিবারের কাউকে বর্ণবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করেননি।
রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, তবে রাজপরিবারকে নিয়ে লেখা সাংবাদিক স্কোবির একটি নতুন বই বর্ণবাদের বিষয়টিকে আবার সামনে এনেছে। যা আবার ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যমে প্রথম পাতার খবর তৈরি করেছে।
তার বই ‘এন্ডগেম’-এ স্কোবি বলেছেন, যে উইনফ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পর চার্লস এবং মেগানের মধ্যে ব্যক্তিগত চিঠিতে জড়িত দুই ব্যক্তির নাম চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে যুক্তরাজ্যের আইন তাদের নাম প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বাধা।
নতুন বিতর্কের মুখে ডাচ প্রকাশক জানিয়েছেন, অনুবাদে ভুলের কারণে সাময়িকভাবে বইটি বাজার থেকে সরিয়ে নিয়েছেন তারা। তার দাবি, ডাচ সংস্করণে দুই রাজপরিবারের সদস্যের নাম ছিল। যদিও ইংরেজি সংস্করণে ওই অংশটুকুই বাদ পড়ে।
একই দিনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ওই বইয়ের ডাচ সংস্করণে ব্রিটিশ রাজপরিবারের দুই জ্যেষ্ঠ সদস্যের নাম কীভাবে বর্ণবাদে অভিযুক্ত হয়েছে তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মেগানের ছেলে আর্চি সম্পর্কে বর্ণবাদী আলোচনা করেছিলেন রাজা চার্লস এবং প্রিন্সেস অব ওয়েলস। বাকিংহাম প্যালেসের কাছে গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চায় গার্ডিয়ান। তবে তারা জানায়, ‘এটি এমন কোনো বিষয় নয়, যা নিয়ে আমরা মন্তব্য করতে পারি।’
আবার বইটির লেখক স্কোবির দাবি, তিনি বইয়ে কারও নাম উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, বইয়ে তিনি ‘বর্ণবাদী’ শব্দটিও ব্যবহার করেননি। তার দাবি, অনেক সাংবাদিকই ওই দুটো নাম জানেন।
তিনি বলেন, ‘নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিয়ে এখনো তদন্ত করা হচ্ছে। আমি একজন প্রকাশকের সঙ্গে বইটির ইংরেজি সংস্করণ লিখেছি এবং সম্পাদনা করেছি। আমি স্পষ্টতই ইতালীয়, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ডাচ বা অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতে পারি না। আমি অন্য সবার মতো হতাশ।’
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এর আগে এক প্রতিবেদনে জানায়, স্কোবির এন্ডগেম বইয়ে রাজপরিবারের সংকটের কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়। বইটিতে দাবি করা হয়, ক্রাউন প্রিন্স উইলিয়ামের কাজেও বিরক্ত তার বাবা রাজা চার্লস। এ ছাড়া বাবার ওপর আস্থা নেই প্রিন্স উইলিয়ামের।
ওই বইয়ে বলা হয়, প্রিন্স হ্যারি ও প্রিন্স উইলিয়াম, দুই ভাইয়ের মনোমালিন্য রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, উইলিয়াম বিশ্বাস করেন যে হ্যারিকে ‘থেরাপিস্ট দ্বারা ব্রেইন ওয়াশ’ করা হয়েছে। বইটিতে আরও বলা হয়, এলিজাবেথ মারা যাওয়ার দিন উইলিয়াম হ্যারির পাঠানো টেক্সটও উপেক্ষা করেছিলেন, যার ফলে হ্যারিকে বালমোরালে যাওয়ার জন্য বিমান ভাড়া করতে হয়েছিল।
স্পেয়ার
চলতি বছরের শুরুতে প্রিন্স হ্যারি ‘স্পেয়ার’ প্রকাশ করে তুমুল আলোচনার জন্ম দেন। খ্যাতনামা প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র্যানডম হাউজ থেকে ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত হওয়ার পর এ স্মৃতিকথা পৃথিবীর ১৬ ভাষায় প্রকাশিত হয়। গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রি-অর্ডার হওয়া বইয়ের তালিকায়ও ছিল এটি।
রাজা তৃতীয় চার্লস ও প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার ছোট ছেলে হ্যারির জন্ম লন্ডন শহরেই। যদিও স্ত্রী অভিনেত্রী মেগান মার্কেলকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকছেন তিনি এখন। বর্জন করেছেন রাজা উপাধি এবং তা রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জীবদ্দশায়।
নিজের স্মৃতিকথায় অগ্রজ প্রিন্স উইলিয়ামের বিরুদ্ধে গায়ে হাত তোলার অভিযোগ করেন হ্যারি। তার স্ত্রী মেগানকে প্রিন্স উইলিয়াম ‘অভদ্র’, ‘রূঢ়’, ‘বেয়াদব’ বলেছিলেন। এ নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে বাগ্যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে হ্যারির কলার চেপে ধরেন উইলিয়াম।
প্রিন্স হ্যারি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পেছনে এ ঘটনাকে অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন বইয়ে।
টানাপড়েন
গত বছরের সেপ্টেম্বরে মারা যান ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তার মৃত্যুর পর রাজার সিংহাসনে আরোহণ করেন প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারির বাবা ৭৪ বছর বয়সী চার্লস। তারপর থেকেই মূলত দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েনগুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।
২০২০ সালে স্ত্রী মেগানকে নিয়ে রাজপরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান হ্যারি। এরপর থেকে রাজপরিবার ও ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে।
ওই বই থেকে আরও জানা যায়, জনসমাগমকে প্রিন্স হ্যারি ভয় পেতেন। মানুষের সামনে কিছু বলতে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করতেন। আর সে সময় তিনি মাদক গ্রহণসহ নানা উপায়ে চেষ্টা করতেন আতঙ্ক কাটাতে। বইয়ে জানা যায়, তখন সাইকেডেলিক ওষুধও তাকে আতঙ্ক কাটাতে সাহায্য করে। সারা বছর ধরে যা খেতে শুরু করেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, স্মৃতিকথায় হ্যারি লেখেন, এসব ওষুধ তাকে খুব সীমিত সংবেদনশীল উপলব্ধির বাইরে অন্য একটি ‘জগৎ’ দেখতে দিত। বইয়ে হ্যারি স্বীকার করেন, অন্য রকম অনুভবের প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে তিনি কোকেন সেবন করতেন।
হ্যারির মা প্রিন্সেস ডায়ানা ১৯৯৭ সালে প্যারিসে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হন। মায়ের মৃত্যু প্রসঙ্গে হ্যারি তার বইয়ে লেখেন, ‘আমি মাকে সমাহিত করার স্থানে মাত্র একবার কেঁদেছিলাম। তার আগে কেনসিংটন প্যালেসের বাইরে হাঁটার সময় আমার অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল এবং অপরাধবোধ হচ্ছিল। আমার ধারণা, উইলিয়ামেরও সে সময় একই অনুভূতি হচ্ছিল। আমরা সেখানে মানুষের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলাম। হাসছিলাম। যাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলাম, তাদের হাত ভেজা ছিল। আসলে চোখের পানিতে তাদের হাত ভিজে গিয়েছিল। সবাই আমার মায়ের কাছের মানুষ ছিলেন। তবে আমার মায়ের সবচেয়ে কাছের দুজন, সবচেয়ে ভালোবাসার দুজন সেই মুহূর্তে কোনো আবেগ প্রকাশ করতে পারেননি। কারণ, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যদের জনসমক্ষে শোক প্রকাশের সুযোগ নেই। তাই যখন মাকে সমাহিত করা হয়, তখন ওই একবারই কাঁদতে পেরেছিলাম।’
তিনি আরও জানান, তার বাবা চার্লস একবারের জন্যও সেদিন তাদের জড়িয়ে ধরেননি।
বাবার দ্বিতীয় বিয়ে প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ডায়ানার মৃত্যুর পর ক্যামিলাকে বিয়ে না করতে বাবা চার্লসকে অনুরোধ করেছিলেন প্রিন্স উইলিয়াম ও তিনি।
প্রিন্স হ্যারি তার আত্মজীবনীতে আফগানিস্তানে সৈনিক হিসেবে কাজ করার সময় ‘২৫ তালেবান যোদ্ধাকে হত্যা করা’র কথাও স্বীকার করেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে কাজ করতেন হ্যারি। ওই সময় ২০১২-১৩ সালে কিছুদিনের জন্য আফগানিস্তানে ফরোয়ার্ড এয়ার কন্ট্রোলার এবং পরে হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন তিনি। স্পেয়ার-এ তিনি জানিয়েছেন, ওই সময় তিনি ছয়টি মিশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং প্রতিটি মিশনেই শত্রুপক্ষে নিহতের ঘটনা ঘটেছিল।
আরেক সাক্ষাৎকারে প্রিন্স হ্যারি বলেন, ভাই প্রিন্স উইলিয়াম ও বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আরেকটি বই লেখার মতো যথেষ্ট তথ্য তার কাছে আছে। স্পেয়ার-এর প্রথম খসড়াটি ছিল ৮০০ পৃষ্ঠার। সেখান থেকে ৪০০ পৃষ্ঠায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বাকি অংশ দিয়ে আরেকটি বই লেখা যেত।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যুক্তরাজ্যেই দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে রাজনৈতিক একটি ধারা। এর সঙ্গে বর্তমানে শুরু হয়েছে পারিবারিক বিরোধ। যার শুরুটা হয়েছিল প্রিন্সেস ডায়ানাকে দিয়ে। পৃথিবীবাসীর বুকে কাঁপন ধরিয়ে তিনি নিহত হন এক সড়ক দুর্ঘটনায়। যার রহস্য আজও খোলাসা হয়নি। তবে মানুষ তাকে জানে বিদ্রোহী হিসেবে। রাজপরিবারের কঠোর নিয়ম ও আনুগত্যকে অস্বীকার করেন ডায়ানা, যা পছন্দ হতো না বাকিংহাম প্যালেসের। এরপরই ডায়ানার মৃত্যু ঘটে।
মায়ের মৃত্যুর পর আরও বড় বিদ্রোহ করেন ছোট ছেলে হ্যারি। সঙ্গী তার স্ত্রী মরগান। রানী এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ রাজপরিবার যেন আরও দিশাহীন। যা মাঝে মাঝেই প্রকাশ পেয়েছে হ্যারির লেখা ও আচরণে। রাজা চার্লসও যথেষ্ট বয়সী হয়ে গেছেন। রাজপরিবারের দণ্ডভার এরপর প্রিন্স উইলিয়ামসের হাতেই পড়ার কথা। ভঙ্গুর রাজপরিবারকে তিনি কতদূর টেনে নিয়ে যেতে পারবেন, তা এখন দেখার বিষয়।
