জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্য কর্তৃক নিষেধাজ্ঞার শঙ্কাকে কেন্দ্র করে দেশের একটি তৈরি পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ক্রেতার শর্তযুক্ত ঋণপত্র (এলসি) নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে রপ্তানির ৮৫ শতাংশ আয় আসা দেশের এই শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। তবে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ঋণপত্রে এমন কোনো শর্ত দেয়নি, দিয়েছে দুবাইয়ের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। এই ব্যাংকটি এক বছর ধরেই প্রতিটি ঋণপত্রেই এমন শর্ত দিয়ে আসছে।
দেশের পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এ তথ্য জানিয়েছে। গতকাল বিজিএমইএকে ফরাসি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান জেডএক্সওয়াই ইন্টারন্যাশনাল নিশ্চিত করেছে যে, তারা ঋণপত্রের ধারাটি সরিয়ে ফেলবে এবং প্রয়োজন হলে তারা সেই ধারা ছাড়াই একটি নতুন এলসি ইস্যু করবে।
গতকাল এক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত এলসি ধারার বিষয়ে স্পষ্টীকরণে বিজিএমইএ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে একটি নির্দিষ্ট কারখানার কাছে ক্রেতার পাঠানো এলসি ক্লজ-সংক্রান্ত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয় নিয়ে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, যা সঠিক নয়। বিষয়টি মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছে এবং জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
বহুল আলোচিত এলসিটি জেডএক্সওয়াই ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক ‘কারিবান’ নামে একজন ফরাসি ক্রেতা কর্তৃক জারি করা একটি মাস্টার এলসির বিপরীতে ট্রান্সফার করা হয়েছিল। জেডএক্সওয়াই বিজিএমইএর সদস্য ‘নিট কনসার্ন’-এর অনুকূলে এলসিটি হস্তান্তর করে। বিজিএমইএ এলসির কপি সংগ্রহ করে দেখতে পেয়েছে এটি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক দুবাই জারি করেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক দুবাই এলসিতে উল্লেখ করে, ‘আমরা জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্য কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত কোনো দেশ, অঞ্চল বা দলের সঙ্গে লেনদেন প্রক্রিয়া করব না। নিষেধাজ্ঞার কারণগুলোর জন্য আমরা কোনো বিলম্ব, নন-পারফরম্যান্স বা/ তথ্য প্রকাশের জন্য দায়ী নই।’
এলসিতে এমন শর্ত পাওয়ার পর বিজিএমইএ জেডএক্সওয়াইয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। উত্তরে জেডএক্সওয়াই আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাঠায়। একই সঙ্গে মূল ক্রেতা কারিবানও একটি স্পষ্টীকরণ বিবৃতি পাঠান। ওই ব্যাখ্যা ও বিবৃতিতে জানা যায়, কারিবান জেডএক্সওয়াই ইন্টারন্যাশনালের অনুকূলে তার মাস্টার এলসিতে এই ধারাটি সন্নিবেশিত করেনি। ধারাটি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক দুবাই দ্বারা সন্নিবেশিত করা হয়েছিল, যা তারা ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে প্রতিটি এলসিতে করে আসছে। ধারায় বলা নেই যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জেডএক্সওয়াই ইন্টারন্যাশনাল নিশ্চিত করেছে যে তারা এলসির ধারাটি সরিয়ে ফেলবে এবং প্রয়োজন হলে তারা সেই ধারা ছাড়াই একটি নতুন এলসি ইস্যু করবে।
সুতরাং, এলসি ধারার কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে, এমন গুজব ভিত্তিহীন ও ভুল বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।
এটা উল্লেখ্য যে, এলসিগুলো ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক ইনস্ট্রুমেন্ট, সংবিধিবদ্ধ আদেশ বা বিজ্ঞপ্তি নয়। সুতরাং এলসিকে বাংলাদেশের ওপর বাণিজ্য ব্যবস্থা প্রয়োগ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বার্তা হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা উচিত হবে না বলে মনে করে সংগঠনটি। দেশের কূটনৈতিক মিশন থেকে বা কোনো অফিশিয়াল সোর্স থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যব্যবস্থা আরোপের কোনো তথ্য পায়নি বিজিএমইএ। এই প্রেক্ষাপটে, সব ব্র্যান্ড, রিটেইলার এবং তাদের এজেন্টদের বাহ্যিক ইস্যুগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যকে মিশিয়ে জটিল না করে তোলার জন্য, বিশেষ করে এ ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে এমন কোনো অপ্রয়োজনীয় ধারা সন্নিবেশ না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান স্পষ্টীকরণ চিঠিতে জানিয়েছেন, বিশ্ব বাণিজ্যের দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; মানবাধিকার এবং পরিবেশগত ডিউ ডিলিজেন্স ক্রমবর্ধমানভাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলোও বাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে। যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাণিজ্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, তাই বাণিজ্যনীতি-সংক্রান্ত যেকোনো নতুন বিষয় আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই আমাদের অগ্রগতির ধারা ধরে রাখতে হবে এবং আমাদের ব্যবসায়িক মডেল, কৌশল এবং উৎপাদন কর্মকান্ডগুলো পরিমার্জন করে ইএসজি (পরিবেশ, সামাজিক এবং শাসন) অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে একীভূত করতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও কল্যাণ সমুন্নত রাখার জন্য আমাদের শিল্প যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে পোশাকশিল্পের বিষয় থাকলে সেখানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কোনো ভিত্তি নেই।
