দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যন্ত এলাকায় সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। যারা আগুন দিতে যাবে তাদের ধরে পুলিশের সোপর্দ করতে হবে।’
গতকাল শুক্রবার সকালে গোপালগঞ্জ সফরের দ্বিতীয় দিন নিজ নির্বাচনী এলাকা কোটালীপাড়ায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। সকাল পৌনে ১০টার দিকে কোটালীপাড়া পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নেতাকর্মীদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।
সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রতিনিধি মো. শহীদ উল্লা খন্দকারসহ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি কীভাবে নির্বাচন করবে প্রশ্ন তুলে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বিএনপির নেতা কে? তাদের কোনো নেতা নেই। বিএনপি চিন্তা করেছিল নির্বাচন হবে না, এখন নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে। একসময় বলেছিল নির্বাচন হতে দেবে না। উসকানি আছে যে, নির্বাচন ঠেকাও। নির্বাচনের শিডিউল হয়ে গেছে। এখন তারা মনে করছে নির্বাচন হয়েই যাবে।’
নির্বাচন করতে না পেরে বিএনপি মার্চ মাসের দিকে দেশে ‘দুর্ভিক্ষ ঘটানোর’ পরিকল্পনা করছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এটা হচ্ছে তাদের পরবর্তী পরিকল্পনা। এটা শুধু দেশের নয়, বাইরের দেশেরও পরিকল্পনা আছে। যেভাবেই হোক দুর্ভিক্ষ ঘটাতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখন দেখতে পারছি আন্দোলনের নামে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানো। পাকিস্তানের প্রেতাত্মা, হানাদার বাহিনীর প্রেতাত্মা এদের ওপর ভর করেছে। পুলিশকে যেভাবে মাটিতে ফেলে পেটাল, এর চেয়ে জঘন্য কাজ মনে হয় আর হতে পারে না। পুলিশ একটা গরিব মানুষের ছেলে, একটা চাকরি করে। তাকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা, সে যখন বেহুঁশ হয়ে গেছে, মৃতপ্রায়, তার মাথা থেকে হেলমেট ফেলে দিয়ে মাথায় কোপাল, মারল। কোন দেশে আমরা বাস করি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এরা বিএনপির নেতা। কী বীভৎস এরা। এভাবে একটা পুলিশ পিটিয়ে মারল। অ্যাম্বুলেন্সে পুলিশ ঢোকার পর সেখানে আগুন দিল। দুয়েকটা অ্যাম্বুলেন্স পোড়াল। সাধারণ রোগী নিয়ে যাচ্ছে সেই অ্যাম্বুলেন্সের ওপর তারা আক্রমণ করে। রোগীসহ অ্যাম্বুলেন্সের ওপর আক্রমণ করে বিএনপি। এই হলো তাদের চরিত্র। তাদের ওপর মানুষের আস্থা বিশ্বাস থাকবে কী করে। এখন আন্দোলনের নামে পোড়াও-জ¦ালাও। এদের শিক্ষাটা বোধহয় ওই ইসরায়েলের কাছ থেকে নেওয়া। যারা প্যালেস্টাইনের ওপর আক্রমণ করছে। হাসপাতালে লাশের স্রোত বয়ে যাচ্ছে গাজায়। তারা মনে হয় ওইখান থেকে শিক্ষা নিয়ে চলে।’
বিএনপিকে উদ্দেশ্যে করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আবার তারা আউটসোর্সিং আন্দোলন করে। সমাজের কিছু অবাধ্য লোকজনের হাতে টাকা দিয়ে আগুন দেওয়ায়। যুবদলের নেতা নিজে সরাসরি আগুন দিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছে। জনগণ কিন্তু সচেতন। তাদের ধরে ধরে পুলিশে দিয়ে দিচ্ছে।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাত্র ১৫ দিন আগে দেশ ছেড়ে যাওয়ার একেবারেই ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু তখন কেন যেন যেতে হলো। তারপর ফিরে আসলাম। ফিরে আসাটা কষ্টদায়ক ছিল। কারণ যেদিন এয়ারপোর্ট ছেড়ে যাই কামাল, জামালসহ প্রায় সবাই ছিল। সেই ’৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে এলাম। কিন্তু কাউকে পাইনি। বেঁচে গিয়েছিলাম। এটা হয়তো আল্লাহর ইচ্ছা ছিল। আসার পর থেকে আমার চলার পথ খুব মসৃণ ছিল না। যে ঘাতকরা আমার বাবা-মাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল তাদের বিচার হবে না। তাদের বিচার থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে। তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে।’
তিনি বলেন, ‘বারবার আমি মৃত্যুকে সামনে দেখেছি। এ কোটালীপাড়াতেও বিশাল বিশাল বোমা মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। মিটিংয়ে আক্রমণ, বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা এগুলোতে প্রতিনিয়ত। সরাসরি গুলি এ অবস্থার মধ্য দিয়েও আল্লাহ বারবার আমাকে বাঁচিয়ে রাখলেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করি। আবার ২০০৯ সালে সরকার গঠন করি। ২০০৯ থেকে আমরা এ পর্যন্ত একটানা সরকারে আছি। অন্তত আজ এটুকু বলতে পারি, বাংলাদেশটা বদলে গেছে। বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হয়েছে এখন আর খাদ্যের হাহাকারটা নেই। খাদ্য নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি। চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছতে পেরেছি। শিক্ষার সুযোগ আমরা সৃষ্টি করেছি। ঠিক যা জাতির পিতা চেয়েছিলেন। একটানা সরকারে থাকতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন দৃশ্যমান হতো না। আমরাই তো সেøাগান তুলেছিলাম আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। আমরা ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করেছি। আর সেই আন্দোলন সফল করতে সরকারে এসে একটানা সরকারে থেকে আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নত হয়েছে।’
কোটালীপাড়ায় মতবিনিময় শেষে শেখ হাসিনা সড়কপথে টুঙ্গিপাড়া যান। বিকেলে তিনি টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন। এরপর ঢাকার উদ্দেশে টুঙ্গিপাড়া ত্যাগ করেন।
