প্রথমার্ধের নির্ধারিত ৪৫ মিনিট শেষ। চতুর্থ রেফারি নিয়নবাতি জ্বালিয়ে দেখালেন অতিরিক্ত ২ মিনিট। যোগ করা এই সময়টা পেরিয়ে গেলে অর্ধেক কাজ সারা হয়ে যায়। বসুন্ধরা কিংস নিজেদের ঘর সুরক্ষিত রেখে সেটা করেছে ঠিক, তবে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ১০ জনের দলে পরিণত হয়ে ফিরতে হয়েছে সাজঘরে। মাঝ মাঠে ওড়িশার মরোক্কান মিডফিল্ডার আহমেদ জাহোকে পেছন থেকে ট্যাকল করেছিলেন কিংসের উজবেক মিডফিল্ডার আসরর গফুরভ। সতীর্থকে ফাউল করতে দেখে ওড়িশার এক ফুটবলার দৌড়ে এসে গফুরভকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন। ভিয়েতনামের রেফারি এ ক্ষেত্রে যে বিচারটা করলেন, তা দেখে বিস্মিত গোটা স্টেডিয়াম। ওড়িশার সমর্থকরাও যেন একটু লজ্জাই পেয়ে গেলেন তাতে। গফুরভকে দেখানো হলো সরাসরি লাল কার্ড! আর ওড়িশার সেই খেলোয়াড়কে কার্ড না দেখিয়ে করা হলো সতর্ক! তাতেই আসলে সর্বনাশ হয় বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নদের। দ্বিতীয়ার্ধে সেনেগালের ডিফেন্ডার মোর্তাদা ফলের হেডে আরেকবার কপাল পোড়ে কিংসের। আর রেফারির বদান্যতায় ১-০ গোলের জয়ে গ্রুপসেরা হয়ে জোনাল সেমিফাইনালে নাম লেখায় স্বাগতিক ওড়িশা এফসি।
অথচ একেবারে পরিকল্পনা মেনেই খেলছিল কিংস। গ্রুপসেরা হতে যেহেতু ওড়িশা এফসির জয়ের বিকল্প ছিল না, তাই তারা শুরু থেকেই হাই-প্রেস ফুটবল খেলেছে। সেটা ছাড়া গতিও ছিল না তাদের। ম্যাচটা ড্র হলে যে অভিষেকেই পরের ধাপে যাওয়ার ইতিহাস গড়া হতো না। মাঠে তাই তাদের প্রাধান্য ছিল। তবে জয়টা হয়তো ঠিক এভাবে পেতে চায়নি স্বাগতিকরা। চেয়েছে মাঠে খেলেই সেরা হতে। সেটা তাদের হতে দেননি ভিয়েতনামের রেফারি। নইলে মাঝখানে ফাউলে যেখানে বড়জোর একটা হলুদ কার্ড হয়, সেখানে কেন গফুরভকে পেতে হবে মার্চিং অর্ডার!
ম্যাচের শুরুতে কিংসের মনোযোগ ছিল ঘর সামলে আক্রমণে যাওয়ার। তাই আক্রমণের জায়গা করে নিতে পারে ওড়িশা। ম্যাচের ১০ মিনিটে কিপার মেহেদী হাসান শ্রাবণের কৃতিত্বে বেঁচে যায় কিংস। ডান দিক থেকে সাকামতোর ক্রস দিয়েগো মাউরিসিওর পায়ে পৌঁছানোর আগে পাঞ্চ করে বিপদমুক্ত করেন তরুণ কিপার। ১৭ মিনিটে ববুরবেকের ক্লিয়ারেন্স ভালো জায়গায় পেয়েও শ্রাবণের পরীক্ষা নিতে পারেননি ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার দিয়েগো মাউরিসিও। ২৯ মিনিটে প্রথম আক্রমণে গিয়েছিল কিংস। প্রতি আক্রমণ থেকে বল পেয়ে ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে সতীর্থদের পাস না দিয়ে নিজেই শট নেন রাকিব, যা ওড়িশা কিপার আমরিন্দর সিং সহজেই আয়ত্তে নেন। এরপর যোগ করা সময়ে বিতর্কিত রেফারিংয়ের শিকার হয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়তে হয় গফুরভকে। মেজাজ হারানোয় হলুদ কার্ড দেখতে হয় কিংস কোচ অস্কার ব্রুজনকেও। তাই বিরতির বাঁশি বাজার পর কিংসের যোদ্ধারা হাত তুলে সারেন্ডার করার ভঙ্গিমায় প্রতিবাদ জানান রেফারির প্রতি।
বিরতি থেকে ফিরে ১০ জন নিয়ে ভালোই লড়ছিল কিংস। তবে ঘড়ির কাঁটা ৬০ মিনিট পেরোতেই মুহূর্তে অসতর্কতায় গোল হজম করতে হয় তাদের। শ্রাবণ আরেকটা ভালো সেভে ওড়িশাকে হতাশ করেছিলেন। বাঁ দিক দিয়ে সমন্বিত আক্রমণে গিয়ে রয় কৃষ্ণা জোরালো শট নেন; যা কোনোমতে রুখে দেন পুরো ম্যাচে নির্ভুল খেলা কিংস কিপার। তবে সেই কর্নারেই কপাল পোড়ে কিংসের। যে দুজনকে নিয়ে ছিল ভয়, সেই আহমেদ জাহো এবং ফলেই মিলিত চেষ্টায় গোলের উল্লাসে মাতে ওড়িশা। জাহোর কর্নার মার্কারদের ছিটকে অনেকটা লাফিয়ে নিখুঁত হেডে গোল করেন দীর্ঘদেহী সেনেগালিজ ডিফেন্ডার ফল।
পিছিয়ে পড়ার পর কিংস চেষ্টা করেছে আক্রমণে গিয়ে ম্যাচে ফেরার। তবে গফুরভের মতো একজন সৈনিককে হারিয়ে তাদের আক্রমণগুলো বারবার খেই হারিয়েছে ওড়িশার বক্সের সামনে। তিন ব্রাজিলিয়ান রবসন রবিনহো, মিগেল ফিগেইরা ও ডরিয়েলটন গোমেজকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রেখেছে ওড়িশার রক্ষণ। রাকিব হোসেন ডান দিক দিয়ে পারেননি সুযোগ তৈরি করতে। ৭৭ মিনিটে বিশ্বনাথ ঘোষের জায়গায় মাঠে এসে সেভাবে সুবিধা করতে পারেননি শেখ মোরসালিনও। তাই আগের দুবারের মতো এবারও গ্রুপের দ্বিতীয় হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে কিংসকে।
কিংস কোচ অস্কার ব্রুজনের আগের দিনের শঙ্কাটাই সত্যি হলো। ব্রুজন আগের দিন বলেছিলেন, যদি রেফারিংটা প্রশ্নাতীত হয়, তবে স্বাগতিকদের অভিনন্দন জানাতে তার আপত্তি থাকবে না। হারের পর ওড়িশার খেলোয়াড়দের অভিনন্দন ঠিকই জানিয়েছে কিংস। তবে সবাইকে পেছনে ফেলে ম্যাচের নায়ক (পড়–ন খলনায়ক) বনে যাওয়া ভিয়েতনামের রেফারি গো দু লানকে ধিক্কার জানাতে আবারও সদলবলে হাত তুলে দাঁড়িয়েছেন ব্রুজন। তাতে হয়তো ম্যাচের ফলের ব্যত্যয় ঘটবে না। কিংসেরও হয়তো আরও শক্তি সঞ্চয় করে খেলা হবে না পরের ধাপে। তবে ফি বছর রেফারির হাতে খুন হওয়ার তো একটা প্রতিবাদ তারা মাঠেই করতে পারলেন।
