সময় যত গড়াচ্ছে ততই জটিল হচ্ছে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিস্থিতি। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এ সংঘাতে নিহত হয়েছে ১৮ হাজার ফিলিস্তিনি। গাজা ও পশ্চিম তীর মিলিয়ে ইসরায়েলি হামলায় আহত মানুষের সংখ্যাও প্রায় ৫০ হাজার। কিন্তু এখনো সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই। মাঝে সপ্তাহখানেক যুদ্ধের বিরতি থাকলে পরে গাজায় হামলা আরও বাড়িয়েছে ইসরায়েল। এ দফায় অবশ্য ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা হামাসের শক্তি অনেকাংশেই কমাতে পেরেছে। গত রবিবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তারা হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। অবশ্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এ দাবি উড়িয়ে দিয়েছে হামাস। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটি বলেছে, তারা লড়াই চালিয়ে যাবে। ইসরায়েলে একজন ফিলিস্তিনি বন্দি থাকলেও তারা তাদের হাতে আটক কোনো ইসরায়েলিকে জীবিত ছাড়বে না।
বিবিসি জানাচ্ছে, হামাসের হাতে এখনো দেড় শতাধিক ইসরায়েলি নাগরিক বন্দি আছেন। কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় কিছু বন্দিবিনিময় হলেও পরে তা স্থগিত হয়ে যায়।
এদিকে লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সহিংসতার তীব্রতা বেড়েছে। দুপক্ষই সীমান্তে হামলা-পাল্টা হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, গতকাল সোমবার সকালে লেবানন থেকে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের শহর মা’ওলাত-তারসিহায় অন্তত আটটি রকেট ছোড়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে ছোড়া রকেট আয়রন ডোম ব্যবহার করে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি রকেট উন্মুক্ত স্থানে পড়েছে। তবে হিজবুল্লাহর ছোড়া এ রকেটে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের নাকোওরা, জিবকিন, ইয়ারিন, মারওয়াহিন ও জেব্বানে বোমা হামলা চালিয়েছে।
দুই মাসে আগে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ বাধার পর ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শুধু অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময় ছাড়া দুপক্ষের মধ্যে অব্যাহতভাবে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০০৬ সালের পর যা হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের ঘটনা। তবে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের এ সংঘাত সীমান্ত এলাকাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ হুমকি দিয়েছে, যতক্ষণ দখলদার ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় তাদের বর্বরতা বন্ধ না করছে ততক্ষণ তাদের এসব হামলা অব্যাহত থাকবে। গোষ্ঠীটি আরও হুমকি দিয়েছে, হামলার তীব্রতা দিন দিন শুধু বৃদ্ধি পাবে।
হিজবুল্লাহর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলিদের হামলায় এখন পর্যন্ত তাদের ১০০ যোদ্ধা নিহত হয়েছে। ইসরায়েলিরা তাদের হতাহতের তথ্য প্রকাশ না করলেও; হিজবুল্লাহর দাবি, তাদের হামলায় একশরও বেশি ইসরায়েলি সেনা আহত বা নিহত হয়েছে।
৭ অক্টোবর থেকেই গাজায় ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েল। প্রথমে তারা গাজার উত্তরাংশে গাজা সিটি ও এর আশপাশের অন্যান্য এলাকায় অবিরাম বোমাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তখন গাজার দক্ষিণাংশকে নিরাপদ ঘোষণা করে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১১ লাখ বাসিন্দাকে দক্ষিণে চলে যেতে বলে। এরপর গাজা সিটিসহ গাজা ভূখণ্ডের উত্তরাঞ্চলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ইসরায়েলি বাহিনী। ব্যাপক প্রাণহানির মধ্যে গাজা সিটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে স্থল অভিযান চালায়। এরপর কাতার ও মিসরের প্রচেষ্টায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েল ও হামাস এক সপ্তাহের একটি অস্থায়ী ‘মানবিক বিরতি’তে সম্মত হয়ে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে।
১ ডিসেম্বর ওই বিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে থেকেই দুপক্ষের মধ্যে ফের সংঘাত শুরু হয়ে যায়। এ পর্যায়ে ইসরায়েল গাজার দক্ষিণাংশে ব্যাপক হামলা শুরু করে। এ অংশের প্রধান শহর খান ইউনিস হয় তাদের প্রধান লক্ষ্যস্থল। তবে এ সময় গাজার উত্তরাংশেও হামলা অব্যাহত রাখে তারা।
গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় নিহতদের একটি বড় অংশ বেসামরিক আর তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সর্বশেষ সোমবার ভোররাত থেকেই খান ইউনিস ও রাফায় তীব্র বোমাবর্ষণ করে চলেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেশ কয়েকটি বাড়িতে রাতভর অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
জাতিসংঘের মানবিক দপ্তর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ৯ ও ১০ ডিসেম্বর ইসরায়েলি সেনারা গাজার উত্তরাঞ্চলে আশ্রয়ের খোঁজে থাকা কয়েকশ ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে। এদিন খান ইউনিসে হামাস যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াইরত ইসরায়েলি বাহিনীর ট্যাংকগুলো আরও পশ্চিম দিকে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু ব্যাপক প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
