স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই। এ খাতে অনেক বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সরকারকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং ট্যারিফ (বিদ্যুতের মূল্য) নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান অবস্থা, অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ নিয়ে ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়ন অনুসরণ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা (এমসিপি) অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এখন পর্যন্ত, বাংলাদেশ সৌরশক্তি থেকে ৪৬১ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং আরও ৪১১৫ মেগাওয়াট প্রকল্প পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
চেঞ্জ ইনেশিয়েটিভের গবেষণায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রায় অসঙ্গতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদনের অনিয়ম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অতিরিক্ত ট্যারিফের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সৌর বিদ্যুতের দক্ষতা বেশি হলেও সেখানে তুলনামূলক কম সংখ্যক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ এলাকায় দক্ষতা কম হলেও সেখানে বেশি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চেয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে জাকির হোসেন বলেন, বর্তমান পরিসরে বাংলাদেশের জন্য সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জৈবশক্তি সহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিই নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি। প্রমাণিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির চেয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে জ্বালানি নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সাশ্রয়তা এবং জ্বালানি দুষ্প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উপরে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এই নীতিগত পরিবর্তনটি সাম্প্রতিক জলবায়ূ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থানেরও বিপরীত।
জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ এবং চেঞ্জ ইনেশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এম জাকির হোসেন খান বলেন, "জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের টেকসই অগ্রগতি নির্ভর করছে প্রকৃতিনির্ভর, সাশ্রয়ী এবং সার্বভৌম নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার উপর। কোনো অবস্থাতেই দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল যেন এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এখতিয়ার খর্ব করে অযৌক্তিক ট্যারিফের মাধ্যমে অনৈতিক ফায়দা লুটতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা অঙ্কূরেই বিনষ্ট করে দেয়া না হয় সেটি খেয়াল রাখতে হবে। কোনভাবে সম্ভাবনায় খাতটি বিতর্কিত হয়ে গেলে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারনা তৈরি হবে। বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। সবমিলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ব্যাহত হবে।”
প্রতিবেদনে সরকারি এবং বেসরকারি ট্যারিফের পার্থক্যের বিষয়টিও তুলে ধরে বলা হয়, বেসরকারি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৩ সেন্ট (সাড়ে ১৪ টাকা) করে আদায় করছে। বিপরীতে, সরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম পড়ছে ১০ সেন্ট (১১ টাকা)। এছাড়াও, যৌথ উদ্যোগের (সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন) প্রকল্পগুলোতেও সরকারি প্রকল্পের তুলনায় বিদ্যুতের দাম বেশি। বেশিরভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পই উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রতিযোগিতা না থাকায় বিদ্যুতের দাম ইচ্ছেমত আদায় করছে বিভিন্ন কেন্দ্রের মালিকেরা।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ট্যারিফের হার বিভিন্ন মালিক এবং ধারণ ক্ষমতার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। প্রতিবেশী দেশগুলিতে, নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন নির্ধারকের উপর ভিত্তি করে ট্যারিফ হার (বিদ্যুতের মূল্য) নির্ধারণ করে এবং বিভিন্ন প্রকল্পের বিস্তারিত ব্যয় অনুমান এবং ট্যারিফের হার প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের স্বচ্ছতা নেই। চলমান জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে জ্বালানি খাতে শুদ্ধাচার ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা খুবই জরুরী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বেশ কয়েকটা সুপারিশ তলে ধরা হয় চেঞ্জ ইনেশিয়েটিভের গবেষণায়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-উচ্চ সৌর বিকিরণ এবং বাতাসের গতিসম্পন্ন অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো; নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের জন্য পাওয়া অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত; প্রতিযোগিতামূলক প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণের উপর নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অনুদান এবং সুবিধাজনক তহবিলের নিশ্চয়তা, ঝুঁকিও ঋণ ফেরতের সক্ষমতা বাড়াতে এবং অর্থায়ন চাহিদা মেটানোর জন্য কার্বনট্যাক্স এবং অনুরুপ উদ্ভাবনী আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহন; একটি বিস্তৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়ন কৌশল তৈরি ইত্যাদি।
