নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নামমাত্র মূল্যে বসতভিটা বিক্রি না করায় রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ও তার ভাই মিজানুর রহমানের নির্দেশে শিশু হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করে ভুক্তভোগী পরিবার।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করে পরিবারের সদস্যরা বলেন, ‘ওসমান গণি স্বাধীন নামে ৯ বছর বয়সী শিশুকে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ যাতে শনাক্ত না হয় এজন্য থেঁতলে দেওয়া হয় তার মুখ, অ্যাসিডে ঝলসে দেওয়া হয় শরীর। লাশ গুম করতে হত্যার পর মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় বালু নদীতে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নিহত শিশু স্বাধীনের বাবা শাহিনুর রহমান শাহীন, মা উম্মে হানি মুন্নী ও দাদা রেজাউল করিম। তারা নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া গ্রামের বাসিন্দা।
বাবা শাহিনুর রহমান শাহীন অভিযোগ করে বলেন, ‘রফিক এলাকায় প্রভাবশালী। তার রয়েছে বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। ফলে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ হত্যা মামলা না নিয়ে অপমৃত্যুর মামলা করার পরামর্শ দিয়েছে।’ এ সময় হত্যাকারীদের বিচারের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে শিশুর বাবা আরও বলেন, ‘গত ৪ ডিসেম্বর ইদারকান্দি গ্রামে নির্মাণাধীন সেতুর নিচে বালু নদী থেকে ৯ বছরের একটি শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। আমি সেই শিশুর হতভাগ্য পিতা। আমার অবুঝ সন্তানের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না, তাকে নৃশংসভাবে খুন করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।’
প্রভাবশালীর নির্দেশে শিশু স্বাধীনকে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানের হত্যাকারী আমাদের ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও রংধনু গ্রুপের মালিক রফিকুল ইসলাম এবং তার ভাই মিজানুর রহমান। তারা এত প্রভাবশালী যে, সন্তানকে কবর দেওয়ার পর আমরা বাড়িতে থাকতে পারি না।’
শাহিনুর রহমান শাহীন বলেন, ‘সন্তানের হত্যাকা- নিয়ে কথা বললে আমাদেরও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বাড়িতে পাহারা বসিয়েছে। নিজেদের জীবন বাঁচাতে বাড়ি থেকে আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছি। সন্তান হত্যার বিচার পেতে আমরা মামলাও করতে পারিনি, থানা পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মামলা না দিয়ে অপমৃত্যুর মামলার পরামর্শ দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম গত দুই মাস আগে আমাদের বাড়ি নামমাত্র দামে কিনতে তার বোনকে পাঠান। তার সঙ্গে আরেকজন নারীরও ছিলেন। তারা আমাদের বাড়িটি রফিকুল ইসলাম কিনতে চান বলে জানালে আমার বাবা রেজাউল করিম বলেন, বাড়ি বিক্রি করলে আমরা থাকব কই। তারপরও যদি কখনো বিক্রি করি আমি নিজেই রফিক সাহেবের বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসব, তোমাদের আর কষ্ট করে আসতে হবে না। বাড়ি বিক্রি করতে রাজি না হওয়ার পর থেকে রফিকুল ইসলাম ক্যাডার বাহিনী দিয়ে হামলা, নির্যাতন, নিপীড়ন, চাঁদাবাজি শুরু করেন। তারা একাধিকবার আমাদের বাড়িতে হামলা করেছে। আমাদের দোকানে দুই দফা হামলা ও আমার বাবা এবং আমার ওপর হামলা করে। পরে আমার নাওড়াপাড়ার মুদির দোকানটি বন্ধ করে দিয়েছে। তারপরও আমরা বাড়িটি বিক্রি করতে রাজি হয়নি।’
সংবাদ সম্মেলনে শাহিনুর রহমান বলেন, ‘আমার সন্তানকে হত্যার এক সপ্তাহ আগে রফিকুলের ভাই মিজানুর রহমান উচিত শিক্ষা দেবেন বলে বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে যান। ঠিক এক সপ্তাহ পর আমার সন্তান নিখোঁজ হয়। এরপর আমরা লাশ পাই। লাশ যাতে শনাক্ত না করা যায়, সেজন্য পুরো মুখ থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। পুরো শরীর অ্যাসিড জাতীয় কিছু দিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়েছে। আমরা পরনের প্যান্ট দেখে লাশ শনাক্ত করি।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘গত ১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আমার স্বাধীন নিখোঁজ হলে আত্মীয়স্বজনরা মিলে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাকে পাইনি। এরপর রাত ৮টার দিকে তার সন্ধান চেয়ে মাইকিং শুরু করলে রফিকুল ইসলামের লোকজন বাধা দেয়। তারা বলে, রফিকুল ইসলামের নির্দেশ এ বিষয়ে কোনো মাইকিং করা যাবে না।’
শাহীন বলেন, ‘আমার সন্তানের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে বাড়ি নিয়ে আসি। বাড়িতে এসে দেখি রফিকুলের লোকজন হুজুর নিয়ে অপেক্ষা করছে। বাড়িতে গাড়ি আসার পর তারা লাশের কাছে আর আমাদের যেতে দেয়নি। আমার সন্তানের মরদেহটাও শেষবারের মতো কাউকে দেখতে দেয়নি। রফিকুল ইসলামের নির্দেশে পরিবারের অনুমতি না নিয়েই রাতের অন্ধকারে আমার শিশুকে কবর দেয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ হত্যাকা-ের বিচার চাই। আর কারও মায়ের বুক যাতে খালি না হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ হত্যাকা-ে আমাদের করা অভিযোগটি আমরা চাই সিআইডি নতুবা পিবিআই তদন্ত করুক। আমাদের বিশ্বাস সিআইডি বা পিবিআই তদন্ত করলে হত্যাকা-ের আসল রহস্য উদঘাটন হবে ও প্রকৃত অপরাধীরা শনাক্ত হবে।’
নিহত শিশুর দাদা রেজাউল করিম বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে একটি মুদি দোকান আছে। এক রাতে দোকানে শুয়ে আছি, আড়াইটা-তিনটার দিকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কিছু লোক এসে আমার দোকানে ভাঙচুর করে, দোকানের শাটারে শাবল দিয়ে আঘাত করে। বাড়ি গিয়ে গালাগাল করে আমার ছেলেকে বের হয়ে আসতে বলে। তখন আমার স্ত্রী ছেলেকে বলছিল তারা এমন করছে কেন, মিজানকে ফোন দে। তখন তারা বলে আমরা কি মিজানের অর্ডার ছাড়া এখানে আসছি নাকি? তারা আমার ছেলেকে ঘর থেকে বের করছে। আমার স্ত্রী তাদের পা ধরে মাফ করে দিতে বলেছে। এর ১০-১৫ দিন পর ছেলেকে দোকানে গিয়ে মারধর করা হয়। এ ছাড়া প্রায়ই তারা এসে টাকা নিয়ে যায়।’
