অসহযোগ বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

প্রথম দিনে রিজভী ছাড়া কেউ রাজপথে ছিলেন না

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:৩৫ পিএম

দলের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের জনগণকে ৭ জানুয়ারির ভোটে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার আহŸান জানিয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিল পরিশোধ না করা, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন না করা, ব্যাংকে টাকা জমা না রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তবে দলের নেতাকর্মীরা হাইকমান্ডের এ নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়ন করবে সেটা দেখার বিষয়। তাছাড়া দেশের জনগণকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে অসহযোগ আন্দোলন বাস্তবায়ন করা খুবই চ্যালেঞ্জের বিষয়। এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করেছে। সংবিধানস্বীকৃত মানুষের সব অধিকার থেকে সরকার বঞ্চিত করছে। তাছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। দেশের মানুষ ভালো নেই। তারা পরিবর্তন চায়। তাদের জন্যই আমাদের আন্দোলন। আমরা আশা করছি সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার জন্য আমরা যে আন্দোলন করছি তাতে সাধারণ মানুষ সাড়া দেবে। এর আগে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে হরতাল, অবরোধ সফল হয়েছে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি যে সফল হয়েছে, তা দেশের ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।

দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ কোনো ধরনের পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই ঘোষণা করা হয়েছে এ কর্মসূচি। কর্মসূচি শুরুর প্রথম দিন গতকাল বৃহস্পতিবার কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে রাজধানী ঢাকায় লিফলেট বিতরণ করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, কর্মসূচির প্রথম দিনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক নেতার রাজপথে নামা উচিত ছিল।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি। কর্মসূচি তো শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশে। তাই সারা দেশের নেতাকর্মীরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। আশা করছি শিগগিরই জনগণের অংশগ্রহণে কর্মসূচি সফল হবে। কারণ বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে যে কর্মসূচি পালন করছে, তা বিএনপি কিংবা শরিক দলগুলোর আন্দোলন নয়। এ আন্দোলনে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন কর্মসূচিতে যেসব আহŸান জানানো হয়েছে তা খোদ বিএনপির নেতাকর্মীদের পক্ষেই পালন করা সম্ভব নয়। কারণ গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিল বন্ধ করলে তা এসব লাইন কেটে দেওয়া হবে। তখন পরিবারের সবাই বেকায়দায় পড়বেন। শুধু একটা বিষয় সম্ভব সেটা হলো আদালতে হাজিরা না দেওয়া। অবশ্য আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে নেতাকর্মীরাই গ্রেপ্তার এড়াতে এমনিতেই আদালতে হাজিরা দিতে যাচ্ছেন না। অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণার আগে কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিবেশ তৈরি করার দরকার ছিল।’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি অসহযোগ আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। পরে গত বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ অসহযোগ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘আজ এই মুহূর্ত থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করুন। আগামী ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচন বর্জন করুন। নির্বাচনে ভোটগ্রহণে নিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালনে বিরত থাকুন।’

দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, ‘বর্তমান অবৈধ সরকারকে সব ধরনের ট্যাক্স, খাজনা, ইউটিলিটি বিল এবং অন্যান্য প্রদেয় স্থগিত রাখুন। ব্যাংক খাতের মাধ্যমে সরকার সবচেয়ে বেশি অর্থ লুটপাট করেছে। ফলে ব্যাংকে টাকা জমা রাখা নিরাপদ কি না, সেটি ভাবুন।’ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মিথ্যা ও গায়েবি মামলায় অভিযুক্ত লাখ লাখ রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আপনারা আজ থেকে আদালতে মামলায় হাজিরা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।’

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা একটা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আছি। কারণ সরকার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের খুন, গুম, হামলা, মামলা দিয়ে পর্যুদস্ত করে রেখেছে। নিজেরা নাশকতা করে বিরোধী নেতাকর্মীদের আসামি করছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিল দফায় দফায় বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ^াস উঠেছে। মনেপ্রাণে তারা এ সরকারকে চায় না। তাই বিএনপি একটি দায়িত্বশীল দল হিসেবে, জনগণের দল হিসেবে জনগণের পক্ষে আন্দোলন করছে। আমাদের বিশ^াস জনগণই আমাদের আন্দোলন সফল করবে।’
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। গত ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে দলের মহাসমাবেশ পুলিশ পÐ করে দেয়। এরপর আমরা হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় অসহযোগ কর্মসূচির ঘোষণা করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এখন জনগণের স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণে কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমরা রাজপথে নামব। জনগণের মধ্যে আমাদের আহ্বান সংবলিত লিফলেট বিতরণ করব। আশা করছি জনগণের অংশগ্রহণে কর্মসূচি সফল হবে।’
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক ছাত্রনেতা শফী আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করেছে। এটাকে আমি পজিটিভলি দেখছি। তারা অহিংস আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। জনগণের প্রতি আহŸান জানাচ্ছে নির্বাচন বর্জন করার জন্য। এখন দেখা যাক নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ কতটা হয়। যতটুকু জেনেছি সরকার ধারণা করছে শতকরা ১২ ভাগ ভোট পড়বে। তবে আমার মনে হয় শতকরা ৫ থেকে ৭ ভাগ ভোট পড়তে পারে।’


অসহযোগ আন্দোলন বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করেছে বিএনপি। কিন্তু সরকারের দমনপীড়নের মুখে তারা কত রাজপথে নেমে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারবে সেটা দেখার বিষয়। তাছাড়া জনগণ কতটা সাড়া দেয় না দেয় সেটা সময় বলে দেবে।’
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি মহাত্মা গান্ধীর প্রেমে পড়েছে। দলটি সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ে শুরু থেকেই অহিংস, শান্তিপূর্ণ বাতাবরণে আন্দোলন করে যাচ্ছে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সেই যুগ তো আর নেই। তাছাড়া বিএনপি গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের বিল পরিশোধ না করার যে আহŸান জানিয়েছে, তা খোদ তাদের দলের নেতাকর্মীদের দিয়ে পালন করাতে পারবে কি না, সেটা একটা চ্যালেঞ্জ।’


সম্প্রতি বিশে^র কোনো দেশে এ ধরনের অসহযোগ আন্দোলনের কোনো রেকর্ড আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সমসাময়িক সময়ে বিশে^র কোনো দেশের বিরোধী দল এমন কর্মসূচি পালন করেছে বলে জানা নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। তবে সেই মাপের নেতা তো এখন আর নেই। কারণ সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল বঙ্গবন্ধুর। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি।’ 

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মসূচিতে যখন জনগণের সম্পৃক্ততা থাকে তখন এ ধরনের কর্মসূচি কার্যকর হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অসহযোগ কর্মসূচি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে আমরা ধারণা নির্বাচনের আগে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে এমন কর্মসূচি দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রতি বিএনপি যে আহ্বান জানিয়েছে, তা বাস্তবায়ন তখনই হবে যখন জনগণ মনে করবে সরকার আর নেই। বর্তমানে সে পরিস্থিতি নেই। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে সারা দেশে বিএনপি-জামায়াত যে আন্দোলন করেছে, সেভাবে ঢাকায় কিছু করতে পারেনি। আন্দোলন সফল করতে হলে ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মসূচির কথা মাথায় রাখতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত