জাহাজ মালিকদের বিভক্তির নেপথ্যে

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:১৮ এএম

লাইটার জাহাজ মালিকদের বিভক্তির পেছনে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার রহস্য রয়েছে বলে জানা গেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি)। তাদের দাবি, জাহাজ মালিকদের প্রাপ্য টাকা না দেওয়া নিয়ে মতবিরোধের কারণে সংগঠন থেকে বের হয়ে গেছে আইভোয়াক।

অন্যদিকে বের হয়ে যাওয়া ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং বা আইভোয়াক বলছে, অভিযোগের খাতিরে অভিযোগ করছে ডব্লিউটিসি। গত বুধবার থেকে আইভোয়াক পৃথকভাবে লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম শুরুও করেছে।

এদিকে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে সংস্থাটির মহাপরিচালক কমোডর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম স্বাক্ষরিত জরুরি নৌ-বিজ্ঞপ্তিতে ডব্লিউটিসিকে একমাত্র স্বীকৃত ও বৈধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানে আজ রবিবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে দুপক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌপথে পরিবাহিত হয় লাইটার জাহাজ (অগভীর সমুদ্রে চলাচলের জন্য ছোট জাহাজ) দিয়ে। এই লাইটার জাহাজগুলো ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের আওতাধীন। কোনো আমদানিকারকের জাহাজের প্রয়োজন হলে ডব্লিউটিসি থেকে জাহাজ নিয়ে পণ্য পরিবহন করে থাকে। ডব্লিউটিসি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের (সিটি গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপসহ কিছু কোম্পানি) নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে। এসব শিল্প গ্রুপ নিজেদের লাইটার জাহাজ দিয়ে মাদার ভেসেল (গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী বড় জাহাজ) থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহন করে। যদি আরও বেশি জাহাজের প্রয়োজন হয় তখন তারা ডব্লিউটিসি থেকে জাহাজ নিয়ে থাকে। ডব্লিউটিসির অধীনে দেশে প্রায় দুই হাজার জাহাজ রয়েছে। বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টাল ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং বা আইভোয়াকের আওতাধীন জাহাজগুলো এই ডব্লিউটিসির সঙ্গে রয়েছে। কিন্তু আইভোয়াক ঘোষণা দিয়ে ডব্লিউটিসি থেকে বের হয়ে নিজেরাই আমদানিকারক থেকে পণ্য পরিবহনের অর্ডার নিচ্ছে গত বুধবার থেকে।

আইভোয়াক কেন বের হয়ে গেল : একাধিক লাইটার জাহাজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আইভোয়াকের বেশিরভাগ সদস্য পণ্যের এজেন্ট (আমদানিকারক থেকে পণ্য পরিবহনের কাজ নেওয়া) হিসেবে কাজ করে। আর তারাই ডব্লিউটিসি থেকে জাহাজ নিয়ে পণ্য পরিবহন করত। অর্থাৎ আমদানিকারকদের সঙ্গে তারাই মূলত যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ডব্লিউটিসি সৃষ্টির আগে নৌপরিবহন পরিচালন কমিটি নামেও তারা এই কাজ করে আসছিল।

এ বিষয়ে ডব্লিউটিসির আহ্বায়ক মোহাম্মদ নুরুল হক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের জাহাজ মালিকরা তাদের কাছে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা পাবে। এই টাকা না দিয়ে ফায়দা নিতে তারা বের হয়ে নতুনভাবে পণ্য পরিবহন করতে চাচ্ছে। কিন্তু সরকারি স্বীকৃত বৈধ প্রতিষ্ঠান একমাত্র ডব্লিউটিসি।’

তাদের কাছে কীভাবে ৬৫০ কোটি টাকা রয়ে গেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা যেহেতু আমদানিকারক থেকে পণ্যের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে। তাই তারাই আমদানিকারক থেকে টাকা নিয়েছে। সেই টাকা জাহাজ মালিকদের দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি। আর জাহাজ মালিকদের জাহাজ ডব্লিউটিসির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হয়।’

কিন্তু এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন আইভোয়াকের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘তারা যদি আমাদের কাছে টাকা পেত তাহলে এত দিন কোথায় ছিল? এত টাকা তো এক দিনে হয়নি। আর টাকা পেলে আইনি নোটিস দিতে পারত। এগুলো শুধু প্রতিবাদ করার জন্য প্রতিবাদ করা।’

তবে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে যে আপনাদের অবৈধ সংগঠন বলা হচ্ছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘আইনগতভাবে একমাত্র কোনো একটি সংগঠনকে বৈধ ও বাকিদের অবৈধ বলার সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে এমভি সাবিদ সুলতানা জাহাজের মালিক জাহাঙ্গীর আলমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট থেকে বলা হয়েছে, জাহাজ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে ডব্লিউটিসির বৈধতা নেই। তাই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ডব্লিউটিসিকে চিঠির মাধ্যমে স্বীকৃত ও বৈধ প্রতিষ্ঠান বলা বেআইনি।’

এর আগে ডব্লিউটিসি থেকে বের হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে আইভোয়াকের সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, জাহাজ মালিকদের সংগঠন বিসিভোয়ার কিছু নেতা ডব্লিউটিসিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে। সাধারণ জাহাজ মালিকদের স্বার্থ যেমন দেখা হয়নি, তেমনি পণ্যের আমদানিকারকরাও পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ পাননি। বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে কোথায় ব্যয় করা হয়েছে, তার হিসাবও পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করেও কোনো ফল না পাওয়ায় নতুন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কত টাকা পাওনা রয়েছে

ডব্লিউটিসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে জানা যায়, আমদানিকারকের এজেন্ট হিসেবে ৩৪ জনের নাম রয়েছে। এই ৩৪ জনের কাছেই ডব্লিউটিসির প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এ বিষয়ে ডব্লিউটিসির আহ্বায়ক মোহাম্মদ নুরুল হক বলেন, ‘এর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়জনের কাছে সবচেয়ে বেশি টাকা পাওনা রয়েছে। মূলত, তারাই বের হয়ে অন্য জাহাজ মালিকদের তাদের দলে ভেড়াচ্ছে।’

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের বক্তব্য

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌপথে পরিবহনে ডব্লিউটিসি স্বীকৃত ও বৈধ প্রতিষ্ঠান। এখন তাদের মধ্য থেকে একটি পক্ষ কেন বের হয়ে গেল তা জানার জন্য আমি উভয় পক্ষকে আজ রবিবার আমার দপ্তরে ডেকেছি। এখানে উভয় পক্ষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করবে। তারপর তাদের মধ্যে যেখানে মতবিরোধ থাকবে সেখানে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নৌপথে পণ্য পরিবহনে আমরা বিভাজন চাই না। আমরা চাই একসঙ্গে সমন্বিতভাবে সবাই কাজ করুক। নৌপথে পরিবহনে শৃঙ্খলার বিকল্প নেই।’

উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৬ কোটি ৬৮ লাখ টন পণ্য পরিবহন হয়েছে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে। ২৫ বছর ধরে ডব্লিউটিসির মাধ্যমে পণ্য পরিবাহিত হয়ে আসছে। নৌপথে একটি নির্ধারিত রেটে পণ্য পরিবহন এবং সিরিয়াল অনুযায়ী যাতে সব জাহাজ পণ্য পরিবহন করতে পারে সেজন্য ডব্লিউটিসি গঠিত হয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত