সরকার খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের কৃষি খাতে ঋণ বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি কৃষিঋণ বিতরণ করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দিতে আমদানিনির্ভরতায় ঝুঁকতে হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন খাদ্য আমদানিতে তৃতীয় শীর্ষ দেশ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে খাতটিতে ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ দেবে ব্যাংক, যা এর আগের বছরের চেয়ে ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। এ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৪৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বা ১৫ হাজার ২৮০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। গত বছরের একই সময়ে ঋণ বিতরণ হয়েছিল ১২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা মোট কৃষিঋণের স্থিতি ৫৪ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা বকেয়া। সার্বিকভাবে কৃষি খাতে ঋণখেলাপির হার ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় তিন হাজার ৮৭৮ কোটি।
এদিকে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ১৫ হাজার ২৮০ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। শস্য, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি উৎপাদন খাতে বেশ ঋণ নিয়েছেন কৃষকরা। আলোচিত সময় কৃষকের ঋণ পরিশোধও সন্তোষজনক। এ সময় আগের নেওয়া ঋণ কৃষক ফেরত দিয়েছেন ১৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা।
দেশের কৃষিঋণ যেমন বাড়ছে, উৎপাদনও তেমন বাড়ছে। দেশের কৃষি খাতের উৎপাদন নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, উৎপাদনের নিরিখে দেশের ২২টি কৃষিপণ্য বিশ্বে শীর্ষ ১০ অবস্থানের মধ্যে আছে। যেমন ধান উৎপাদনে তৃতীয়, সবজি ও পেঁয়াজ উৎপাদনে তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, চা উৎপাদনে চতুর্থ এবং আলু ও আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।
সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বিশ্ব খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক বার্ষিক পরিসংখ্যান পুস্তিকা-২০২৩ এ জানিয়েছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববাজার থেকে প্রায় সোয়া কোটি টন খাদ্যপণ্য আমদানি করেছে। এতে বিশ্বের খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
এফএওর হিসাবে ২০২১ সালে বাংলাদেশ ৯ কোটি ৩৩ লাখ টনের মতো কৃষিপণ্য উৎপাদন করেছে। একই বছর বিশ্ববাজার থেকে প্রায় সোয়া কোটি টন খাদ্যপণ্য আমদানি করেছে। এখনো খাদ্য আমদানি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে গম, ভোজ্যতেল ও গুঁড়োদুধ।
এফএওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে। আর বিশ্বের খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। আমদানির দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন। দ্বিতীয় স্থানে ফিলিপাইন। আর খাদ্য রপ্তানির দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশ হচ্ছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, চীন ও ফ্রান্স। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে শেষের দিকে রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্য ঠিক করেছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের চেয়ে ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছর কৃষিঋণের লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
কম সুদে কৃষকদের হাতে ঋণ পৌঁছাতে এবার ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থার (এমএফআই) ওপর বেসরকারি ব্যাংকের নির্ভরশীলতা আরও কমিয়ে আনা হচ্ছে। আর এ জন্য ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ৫০ শতাংশ কৃষিঋণ বিতরণ বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা এতদিন ছিল ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া কৃষিঋণের কত অংশ কোন খাতে দিতে হবে, তাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জন্য প্রণীত কৃষিঋণ নীতিমালায় বলা হয়, ভবনের ছাদে বিভিন্ন কৃষি কাজ করা একটি নতুন ধারণা। বর্তমানে শহরাঞ্চলে যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত বাড়ির ছাদে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ফুল, ফল ও শাক-সবজির যে বাগান গড়ে তোলা হয় তা ছাদবাগান হিসেবে পরিচিত।
কৃষকরা স্থানীয় জাতের পরিবর্তে উচ্চ ফলনশীল জাত (উফশী) ও হাইব্রিড ধান চাষ করায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে টানা ষষ্ঠবারের মতো ধানের উৎপাদন বেড়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বোরো উৎপাদনের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বোরো মৌসুমে দুই কোটি সাত লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। এটি এর আগের অর্থবছরের তুলনায় তিন শতাংশ বেশি।
২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়ে তিন কোটি ৯১ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এটি সর্বোচ্চ রেকর্ড।
সাত বছর আগে বাংলাদেশে চালের মোট উৎপাদন ছিল তিন কোটি ৩৮ লাখ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ফসল উৎপাদন সামগ্রিকভাবে বেড়েছে। ধানি জমির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আধুনিক জাতের ফসল ফলানোয় চাল আমদানি কমেছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সাড়ে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করেছিল। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য বেশি। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গত ১ জুলাই থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি হয়নি। বিশ্লেষকদের বলছেন, গত অর্থবছরে উৎপাদন বেশি হওয়ায় চাল আমদানির প্রয়োজন হয়নি।
বাংলাদেশের উৎপাদন বাড়লেও কৃষিপণ্য রপ্তানির চিত্র পুরোটাই হতাশাজনক। এফএও সম্প্রতি যে হিসাব দিয়েছে, তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০২২ সালে মোট ৯ লাখ ৭৫ হাজার ডলার মূল্যের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করেছে। অবশ্য এর অর্ধেক হচ্ছে হিমায়িত মাছ। যার মধ্যে চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। এর বাইরে ফল ও সবজি, চাল ও ভুট্টার মতো দানাদার খাদ্য, মাংস, ভোজ্যতেল, ঘি, মধু ও দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। অবশ্য এসব পণ্যের বেশির ভাগই প্রবাসী বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য রপ্তানি হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজার বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য এসব পণ্য খুব বেশি রপ্তানি হয় না।
