সামান্য মুদি দোকানি থেকে নিজেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ফজলুর রহমান। তার প্রতিষ্ঠানের নাম সিটি গ্রুপ এই প্রতিষ্ঠানের আটা, ময়দা, তেল, চিনি নিত্যপণ্যের ব্র্যান্ডের নাম ‘তীর’। তীর আর ধনুক হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে একটি। ধনুক দিয়েই তীর নিক্ষেপ করে লক্ষ্যভেদ করা।
ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময় অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে জন্ম তার পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। মানুষ যখন স্কুল-কলেজের শিক্ষাজীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকে তখন তিনি নেমে পড়েন জীবিকার সন্ধানে। ১১ জনের পরিবারের কঠিন দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে শিক্ষাজীবনকে বিসর্জন দিয়েছেন ফজলুর রহমান। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করে, আলোকিত করে জীবন, যুক্তিতর্ক করতে শেখায়, ভালোমন্দের পার্থক্য বোঝায়, উদার করে, মানবিক গুণাবলির সমন্বয় ঘটাতে সাহায্য করে।
ভাবুন, ফজলুর রহমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে দূরে থেকেও জীবনবোধ সম্পর্কে এত দামি উপাখ্যান রেখে গেছেন আমাদের জন্য, যা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির ইতিহাসে অনায়াসে জায়গা করে নেবে। স্বাধীনতার ৫২ বছর পর দেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, সেটি সত্যি বিরল এক ঘটনা। আমরা আগামী ৫০ বছর পর যখন এই বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র কল্পনা করব, সেখানে একজন ফজলুর রহমানের মূল্যায়ন কীভাবে হবে? সেটি হয়তো গবেষণারই বিষয়।
২০০৭ সালে তার মালিকানাধীন দেশের প্রথম বেসরকারি সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ‘সিএসবি নিউজ’ (অধুনা বিলুপ্ত)-এ কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। তখন তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করার সময় ২০০৮ সালে তার সঙ্গে ফোনে প্রথম আলাপ। নরম সুরে মিষ্টি গলায় কথা বলতেন। ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন। তখন তার ব্যবসার পরিধি এখনকার চেয়ে অনেক কম ছিল। কৌতূহলী সাংবাদিক হিসেবে একবার তার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছাপোষণ করি। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে বলেন, ঢাকায় আসেন। পুরান ঢাকার গে-ারিয়ায় সরিষা তেলের মিলের পাশেই তার অফিসটি ছিল বেশ বড়। প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের আলাপ ও দুপুরে খাবার খাওয়ার এক বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছিল তখন আমার।
কেমন সে অভিজ্ঞতা? শোনেন তাহলে। নকিয়া ব্র্যান্ডের ছোট্ট মোবাইল ফোনে যেমন কল আসছে তেমনটি টিঅ্যান্ডটি ফোনেও রিং বাজছে। পণ্য বেচাকেনা করছেন সানন্দে। তার সামনে বসা আমার সঙ্গেও কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে ব্যাংক চেকের ওপরের দিকে দ্বিতীয় দফায় ছোট্ট একটি স্বাক্ষর করে সেটি টাকা ওঠানোর উপযোগী করছেন। চেকের নাম্বারের সঙ্গে টাকার অঙ্কের মিল আছে কি না, সেটি দেখে নিচ্ছেন লেজার বইয়ে। পাশে দাঁড়ানো নির্মাণ ঠিকাদারের সঙ্গে কাজ নিয়ে দরদাম করছেন। একসঙ্গে এত কাজ করছেন নির্ভুলভাবেই। কথায় কথায় নির্মাণ ঠিকাদারকে বলছেন, আগের কাজে তো বেশি লাভ করতে পারোনি, সামনের কাজটা এর চেয়ে দ্বিগুণ। কত টাকা হলে পোষাবে তোমার। টেবিলের এক কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা নির্মাণ ঠিকাদার বললেন, আপনি দর ঠিক করে দেন। ফজলুর রহমান তখন জানতে চাইলেন আগের দর কত ছিল? ঠিকাদারের কাছ থেকে দর শুনে তাকে দ্বিগুণ লাভে দর ঠিক করে দিয়ে বললেন, তাড়াতাড়ি শেষ করো কাজ।
কাজের টেবিলের পর এবার খাওয়ার টেবিলে আমরা। তৎকালীন একজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা, ফজলুর রহমান ও আমি। বিশাল টিফিন ক্যারিয়ারে করে বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসা হলো নানা পদের। সবার আগে তিনি আমাদের প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে নিজের জন্য নিলেন সামান্যই। দ্রুত খাবার খেয়ে অনুমতি নিয়ে সিগারেট ধরালেন। আর আমাদের বললেন, আপনারা আস্তে আস্তে ভালো করে খাবারের স্বাদ নেন। আতিথেয়তায়ও তিনি যে ব্যতিক্রম সেটি বোঝা যায় তার এ ধরনের ব্যবহারে।
খাবার শেষে আবার তার চেয়ারে বসলেন। নিঃসংকোচে বলতে থাকলেন জীবনের নানা কাহিনি আর উত্থান পর্ব। কিছুটা শুদ্ধ বাংলা, কিছুটা ঢাকার আঞ্চলিক টানে যা বলছেন তা যেন রূপকথার গল্পের মতোই। মুদি দোকানে ক্রেতাদের কাছে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করার ছোট্ট একটি গল্প কানে বাজে এখনো। পাইকারি দোকান থেকে ১৬ কেজি ওজনের তেলের টিন মাথায় আর আড়াই মণ ওজনের তেলের ড্রাম পায়ে ঠেলে ঠেলে নিজের দোকানে নিয়ে আসতেন ফজলুর রহমান। এখানে পরিবহন খরচ সাশ্রয় হতো। কুলির মজুরির খরচও বেঁচে যেত। এভাবেই কায়িক শ্রম দিয়ে কম দামে পণ্য বেচে আজকের ফজলুর রহমানে পরিণত হয়েছেন তিনি। বিদায় বেলায় বললেন, যোগাযোগ রাখবেন, আসবেন। গিয়েছিও অনেকবার।
অনেক বছর পর আবারও মিডিয়ায় ফজলুর রহমানের বিনিয়োগ। এখনকার অন্যতম জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল ‘সময় টিভি’ শুরু হওয়ার আগেই বলেছিলেন, ‘বাহার ভাই, আপনাদের মতো কাজ জানা বোঝা লোকরা না এলে ভালো সংবাদমাধ্যম কীভাবে গড়ে উঠবে।’ আমার নিয়োগপত্র তৈরির ক্ষেত্রে ফজলুর রহমানের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, জানি না। তবে সময় টিভি কর্র্তৃপক্ষ আমার নিয়োগপত্র তৈরি করে দ্রুত যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানায়। দুর্দান্ত এক ‘সময় টিভি, টিম চট্টগ্রাম’ তৈরি করে ফেলেছিলাম। এর মধ্য থেকে নিজের ব্যক্তিগত কারণে যোগ দেওয়া হয়নি আমার। ‘এখন’ টেলিভিশনও ফজলু ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন। সব মিলিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৫টিরও বেশি। ২৫ হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী। ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। ব্যাংকের ঋণ ও লেনদেন থেকে শুরু করে নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস নিয়ে কোথাও কোনো অসন্তোষ, উচ্চবাক্য নেই, শোনা যায় না।
ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, একজন ফজলুর রহমান প্রমাণ করে গেলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও কীভাবে ঝুঁকি নিয়ে বড় শিল্পোদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাষ্ট্রকে ভ্যাট-ট্যাক্সের মতো বিশাল অঙ্কের রাজস্ব প্রদানের সক্ষমতা অর্জন করতে হয় সেটি বুঝিয়ে দিয়েছেন জীবদ্দশায়। মৃত্যুর আগপর্যন্ত অসুস্থ শরীর নিয়ে বিশাল এক শিল্প গ্রুপকে প্রাণ দিয়েছেন। ‘সেলফমেইড’ মানুষের কিংবদন্তি ও পথিকৃৎ ফজলুর রহমানরা জীবদ্দশায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পায় না। হয়তো এ নিয়ে তার আক্ষেপও ছিল না।
কবিতা লিখে, গল্প রচনা করে অমর উপন্যাস লিখে, খেলাধুলা করে, শিক্ষায় অবদান রেখে, শিল্পচর্চায় ভূমিকা পালন করে অনেকেই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘একুশে পদক’ ও ‘স্বাধীনতা পদক’ পাচ্ছেন কয়েক দশক ধরে। পাক তারা, পেতে থাকুক এই দুই রাষ্ট্রীয় সম্মান। কম তো নয় তাদের কৃতিত্বও। আধুনিক বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, সেখানে ফজলুর রহমানদের কৃতিত্বকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে রাষ্ট্র? এটা কি এখন অনিবার্য নয় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে মধ্যম আয়ের অগ্রসরমাণ অর্থনীতিতে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকার মতো সফল শিল্প স্থাপনের কারিগরদের ভূমিকাও কম নয়। সুতরাং তাদের জন্য সম্মান ও মর্যাদার আরেকটি জায়গা তৈরি এখন খুবই প্রয়োজন। তাহলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়াবে যে, আমরা দেশের প্রকৃত বীরদের সম্মান করতে শিখে গেছি।
আবাসিক সম্পাদক, একুশে টেলিভিশন, চট্টগ্রাম
