সম্পদ বেড়েছে খাদ্যমন্ত্রীর আয় বেড়েছে বাণিজ্যমন্ত্রীর

  • মন্ত্রীর বিদেশে ২৩০০ কোটির ব্যবসা
  • ১৮ জন শতকোটির মালিক
  • ১৮৯৪ প্রার্থীর ২৭ ভাগরই কোটিপতি
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:১৫ পিএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে ১৮ জনের শতকোটি টাকার বেশি সম্পদ (অস্থাবর সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে) আছে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘নির্বাচনী হলফনামার তথ্যচিত্র: জনগণকে কী বার্তা দিচ্ছে?’ শীর্ষক এই বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। প্রার্থীদের হলফনামা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করেছে টিআইবি।

পাশাপাশি জনগণের জানার জন্য টিআইবি ‘হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি’ শীর্ষক একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করেছে। এই ড্যাশবোর্ডে নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় ছয় হাজার হলফনামার আটটি তথ্যের বহুমাত্রিক-তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই ইন্টারঅ্যাকটিভ ড্যাশবোর্ড থেকে ঘরে বসেই ভোটাররা নিজ এলাকার প্রার্থীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন। টিআইবির তৈরি করা নির্বাচনী হলফনামার তথ্যচিত্র তুলে ধরেন এই গবেষণা দলের প্রধান মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

তথ্যচিত্র অনুযায়ী দেখা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে ১৮ প্রার্থীর ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ (অস্থাবর সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে) আছে, তাদের মধ্যে ১০ জন আওয়ামী লীগ মনোনীত। ৮ জন স্বতন্ত্র। এই ১৮ জনের মধ্যে সবার ওপরে আছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি বর্তমান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তার সম্পদের (অস্থাবর সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে) মূল্য ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার বেশি। তা ছাড়া, এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন।

তথ্যচিত্র বলছে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগে কোটিপতি প্রার্থী ছিলেন ২৭ শতাংশের কিছু বেশি। ১৫ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশ। ভূমি সংস্কার আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির ভূমির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা কৃষি-অকৃষি মিলিয়ে ১০০ বিঘা পর্যন্ত। অনেক প্রার্থীর নামেই বড় আকারের ভূমির মালিকানা রয়েছে। এ ছাড়া এবারের নির্বাচনেও নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ খুব কম। এই হার মাত্র ৫ দশমিক ১০ শতাংশ। অন্যদিকে, পুরুষ প্রার্থী ৯৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। প্রার্থীদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। প্রার্থীদের মধ্যে ৫৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ ব্যবসায়ী (মূল পেশা বিবেচনায়)। আর রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ প্রার্থী।

টিআইবি বলছে, হলফনামায় দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব তথ্য যাচাই করা যাদের দায়িত্ব, তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তাদের কাছে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, সরকারের মন্ত্রিসভার অন্তত একজন সদস্যের নিজ নামে বিদেশে একাধিক কোম্পানি থাকার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু হলফনামায় তা দেখা যায়নি। এই মন্ত্রী ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন ছয়টি কোম্পানি এখনো বিদেশে সক্রিয়ভাবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনা করছে, যার মূল্য ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। এই মন্ত্রী তার হলফনামায় বিদেশে থাকা সম্পদের ব্যাপারে তথ্য দেননি।

উল্লিখিত মন্ত্রীর নাম জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেহেতু তথ্য গোপনের ব্যাপার রয়েছে এবং তিনি (মন্ত্রী) নিজে তা প্রকাশ করেননি, তাই টিআইবি তার নাম প্রকাশ করছে না। তবে সরকারি কোনো কর্র্তৃপক্ষ যদি টিআইবির কাছে জানতে চায়, তাহলে তারা তথ্য-প্রমাণসহ দেবেন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাকালীন ১৫ বছরে সম্পদ বেড়েছে এমন শীর্ষ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের তালিকা তুলে ধরেছে টিআইবি। এদের মধ্যে ৮ জনের তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি। তারা হলেন:

১. সাধন চন্দ্র মজুমদার, মন্ত্রী, খাদ্য মন্ত্রণালয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার ৬৩৫০.১৮ শতাংশ

২. মো. জাকির হোসেন, প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার ২৮৫৮.০৬ শতাংশ

৩. গোলাম দস্তগীর গাজী, মন্ত্রী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার ২৭০৩.৯৭ শতাংশ

৪. ইমরান আহমদ, মন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার ২১৭৯.৯৯ শতাংশ

৫. নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, মন্ত্রী, শিল্প মন্ত্রণালয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার ৯৮২.৩০ শতাংশ

৬. জাহিদ মালেক, মন্ত্রী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার ৭৮৩.২৬ শতাংশ

৭. কামাল আহমেদ মজুমদার, প্রতিমন্ত্রী, শিল্প মন্ত্রণালয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার ৪৯৩.৯৪ শতাংশ

৮. জাহিদ আহসান রাসেল, প্রতিমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার ১২৯.৯৫ শতাংশ

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, হলফনামার তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয় না। নির্বাচন কমিশন, রাজস্ব বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন এ কাজটি করতে পারে। কিন্তু কেউই তা করে না। এখানে দায়সারাভাবে তথ্য দেওয়ার জন্যই দেওয়া হয়। তিনি বলেন, হলফনামার তথ্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও উদ্বেগজনক। প্রার্থীদের হলফনামা দেখে ভোটার যদি মনে করেন তিনি এই প্রার্থীকে ভোট দেবেন না, কিন্তু এই যে ভোট দেবেন না, সেই বিকল্প প্রার্থী তার সামনে নেই। জনগণের যে বিচারের ক্ষমতা ছিল, সেই বিচারের ক্ষমতা জনগণ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, ‘সমাজে দুটো শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। এক শ্রেণি অতিসম্পদশালী, আরেক শ্রেণি দিন আনে দিন খায়। অল্প কিছু লোকের আগ্রাসী সংস্কৃতির মধ্যে চলে গেছে দেশ। এটা বিপজ্জনক।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) শেখ মনজুর-ই-আলম প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত