ডিসেম্বর মাসে দেশের গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কয়েক বছর ধরেই তাপমাত্রা বেশি থাকছে, এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৩ বছরের মধ্যে এবার ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। শুধু ডিসেম্বরেই নয়, চলতি মাসেও দেশে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হবে না।
১৪ অক্টোবর বর্ষার মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের পর দেশ রূপান্তরে ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত হয়েছিল ‘এবার শুরু হচ্ছে উষ্ণ শীতকাল’। জানুয়ারি মাসে এসে সে পূর্বাভাস যে সঠিক ছিল তা প্রমাণিত হয়েছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি দেশের শীতলতম মাস; সবচেয়ে বেশি শীত থাকে জানুয়ারি মাসে। সাধারণত এ মাসে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, পশ্চিম-মধ্যাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওপর দিয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। চলতি মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এবার মৃদু ও মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বইতে পারে; শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলেও দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের বেশি থাকবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অনুমান করেছিলাম, এবার শীতের তীব্রতা কম থাকবে। বাস্তবেও রেকর্ড হয়েছে তা-ই এবং আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে।’
মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা বেশি বছরের উপাত্ত বের করার সময় পাইনি। দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সালের পর এবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। এ সময়ে সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ২০১৫ সালে মাইনাস ২ দশমিক ৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওই বছর সবচেয়ে বেশি শীত অনুভূত হয়েছিল। সে বছর স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রা থাকার কথা ছিল ১৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কিন্তু রেকর্ড হয়েছিল ১১ দশমিক ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।’
তাপমাত্রার পারদ ঊর্ধ্বমুখী কেন জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, ‘বৈশ্বিক কারণে এবার তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী। এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ছে।’
একই রকমের মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিম-লের বাইরে নয়। বিশ্ব জুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং এর প্রভাবে এখানেও বাড়ছে।’
এ বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত পোষণ করেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকান্ড তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। এর ফল আমরা ভোগ করছি।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্তে দেখা যায়, গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে সৈয়দপুরে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঈশ্বরদীতে রেকর্ড হয়েছে ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ডিসেম্বরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে গত ১৬ ডিসেম্বর তেঁতুলিয়ায় ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে ৩৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত মাসে গড়ে স্বাভাবিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকার কথা ১৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি জানুয়ারিতে স্বাভাবিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকার কথা ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সাধারণত কোনো অঞ্চলে ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এবার এলনিনোর (উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত) বছর। বিশ^ আবহাওয়া সংস্থার ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী মাস পর্যন্ত এলনিনোর প্রভাব থাকবে। যেহেতু এলনিনোর প্রভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে উত্তপ্ত আবহাওয়া বিরাজ করবে, তাই এবার শীতের তীব্রতা কম থাকতে পারে। উষ্ণ শীতকাল হতে পারে।
