বিদেশি মুদ্রা, বিশেষ করে ডলারের সংকট ঠেকাতে আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের সাময়িক সুফল পাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানি কমিয়ে আনা ও নজরদারি বাড়ানোয় বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে পেরেছে মুদ্রাবাজারের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। এ সময় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৭৬ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ১৮২ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
করোনা-পরবর্তী সময়ে হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি ও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়তে দেখা যায়। সে বছর রেকর্ড আমদানির ব্যয় মেটাতে গিয়েই বাংলাদেশ বিদেশি মুদ্রা, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের ব্যাপক সংকটের মধ্যে পড়ে। দ্রুত কমে যেতে শুরু করে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণের সরকারি-বেসরকারি ঋণও রিজার্ভে বাড়তি চাপ তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বাণিজ্যে কড়াকড়ি আরোপ করে। বিলাসী ও কম প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়। আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে মার্জিনের হার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ করা হয়। হুন্ডি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে বিদেশি বাণিজ্যে কঠোর নজরদারি চালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নানামুখী উদ্যোগে এলসি খোলা কমে গিয়ে আমদানি ব্যাপক হারে কমে যায়। বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারও অনেকটা কমে যায়। অবশ্য এলসিতে কড়াকড়ির কারণে সে সময় ব্যবসায়ীরা বিরোধিতা করলেও এখন তার সুফল পেতে শুরু করেছে দেশ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাণিজ্যে ঘাটতি পুরোপুরি কমে যাবে। তবে ডলার সংকটে এলসি খোলা কমে যাওয়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতি ও অনেক শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যায়, যা শিল্পের বিকাশে বাধা তৈরি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫৭২ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৯৬ কোটি ডলার। এতে ৪৭৬ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে দেশ। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি ১ ডলার ১০৯ টাকা ধরে) এর পরিমাণ ৫১ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১৮২ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্যে ঘাটতি কমেছে ৭০৬ কোটি ডলার বা ৫৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে গড়ে ১৪৪ কোটি ডলারের আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনতে পেরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সবশেষ তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে চলতি হিসাবে কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি। এই সূচকে উল্টো ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে। এ সময় ৫৮ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। আগের অর্থবছরের একই সময়ে চলতি হিসাব ঘাটতিতে ছিল। অর্থাৎ বছরের শুরুতে চলতি হিসাবে এখন ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল ৫৬৭ কোটি ডলার। চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ৮৮১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আগের বছর পাঠিয়েছিলেন ৮৭৯ কোটি ডলার। রেমিট্যান্স বেড়েছে শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ।
এদিকে, দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জুলাই-নভেম্বর সময়ে বাংলাদেশ যেখানে ২১৬ ডলারের এফডিআই পেয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে ১৮৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
আলোচিত সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে। এই সূচকটি আগের বছরের চেয়ে ১০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ কমে ৬৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার হয়েছে। আগের অর্থবছর একই সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৭৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
