দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শেষ আজ শুক্রবার সকাল ৮টায়। গত ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর পর প্রচার-প্রচারণার শেষ মুহূর্তে এসেও প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা থামেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রচারের শেষ দিনের প্রচারণায় অধিকাংশ আসনে ছড়িয়ে পড়ে নির্বাচনী উত্তাপ। প্রচারের শেষ সুযোগ কাজে লাগাতে মরিয়া ছিলেন বিভিন্ন আসনের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। ফলে শেষ সময়ে নির্বাচনী প্রচারে বেশ কিছু জায়গায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন প্রার্থীদের সমর্থকরা।
এর মধ্যে গত বুধবার মধ্যরাতে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর এক সমর্থককে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে। আর পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থককে আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকরা কুপিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ নিয়ে এবারের নির্বাচনী সংঘাতে ছয়জনের প্রাণ গেল। এর আগে হামলা-মারধরে পিরোজপুর, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর ও বরিশালে প্রাণ যায় চারজনের।
এদিকে গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ে আরও আটটি সংসদীয় আসনে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৯ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া আগুন দেওয়া হয় কয়েকটি নির্বাচনী ক্যাম্প ও যানবাহনে।
মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের চরাঞ্চল মোল্লাকান্দিতে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের সমর্থককে গুলি করে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহতের নাম ডালিম সরকার (৩৫)। এ ঘটনার সঙ্গে এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ফয়সাল বিপ্লবের সমর্থকরা জড়িত বলে দাবি করা হচ্ছে। বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে সদর উপজেলার চরাঞ্চল মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মুন্সীকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ডালিম ওই গ্রামের নুর হোসেন সরকারের ছেলে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ডালিমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে গতকাল ভোররাত ৪টার দিকে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গতকাল দুপুরে মুন্সীকান্দি গ্রামে গেলে সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করতে দেখা গেছে। নিহত ডালিম আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থক হলেও মূলত তিনি বিএনপিকর্মী বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। আবার নিহতের স্বজনরা বলছেন, মুন্সীকান্দি গ্রামের বিএনপির সক্রিয় কর্মী উজির আলী ও নজরুলদের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল ডালিমের। ওই বিরোধের জেরে উজির আলী ও নজরুলের নির্দেশে মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিপন হোসেন পাটোরায়ীর ছোট ভাই শিপন পাটোয়ারীর নেতৃত্বে একটি গ্রুপ গুলি চালিয়ে ডালিমকে হত্যা করে। ইউপি চেয়ারম্যান রিপন হোসেন পাটোয়ারী স্বতন্ত্র প্রার্থী ফয়সাল বিপ্লবের সমর্থক।
ওই গ্রামের বাসিন্দা বন্ধু হাসিবুল ইসলাম জানান, বুধবার মধ্যরাতে মুন্সীকান্দি গ্রামের মোল্লাবাড়িতে ডালিম কয়েকজনের সঙ্গে বসেছিলেন। তাদের সঙ্গে হাসিব নিজেও ছিলেন। এ সময় স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক ইউপি চেয়ারম্যান রিপন হোসেনের ভাই শিপন, সোহাগ, ইকরাম, পলাশ ও রতনসহ কয়েকজন তার ওপর হামলা চালায়। সেখানে সোহেল নামে একজনকে পেটায় ও ডালিমকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরে আহতদের উদ্ধার করে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, রাত দেড়টার দিকে আহত অবস্থায় দুজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে ডালিম নামে একজনের বাঁ পাঁজর গুলিবিদ্ধ ছিল। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থান্দার খায়রুল হাসান বলেন, ঘটনার পর থেকে ওই গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনের নাম তদন্তে উঠে এসেছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ফয়সাল বিপ্লব বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমার সমর্থক বা কর্মী কোনোভাবেই জড়িত নয়। আমার কর্মী-সমর্থকদের ওপর মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগ তুলছে।’ আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহী প্রার্থী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।’
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বাদুরা গ্রামে বুধবার বিকেল ৪টার দিকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন জাহাঙ্গীর হোসেন। কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে তাকে গতকাল সকাল ৮টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত জাহাঙ্গীরের বড় ভাই মোজাম্মেল হক জানান, তাদের বাড়ি মঠবাড়িয়া উপজেলার বাদুরা গ্রামে। বাবার নাম তোতাম্বর। স্থানীয় মেরুখালী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর। সংসদ নির্বাচনে সেখানকার স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শামীম শাহনেওয়াজের কলারছড়ি প্রতীকের সমর্থক ছিলেন জাহাঙ্গীর। বুধবার বিকেল ৪টার দিকে বাড়ি থেকে হেঁটে বাজারে নির্বাচনী ক্যাম্পে যাচ্ছিলেন। তখন স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. রুস্তুম আলী ফরাজির (ঈগল) সমর্থকরা পেছন থেকে তার মাথায় এলোপাতাড়ি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরে তাকে উদ্ধার করে মঠবাড়িয়া সদর হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
মঠবাড়িয়া থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্বশত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।’
গোপালগঞ্জ-১ আসনে জনসভা করাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রবিউল আলম শিকদার ইটের আঘাতে আহত হন। গতকাল বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। এ সংঘাতে জড়িত অভিযোগে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে আটক করা হয়েছে।
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর তিন সমর্থককে নৌকার সমর্থকরা পিটিয়ে আহত করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বুধবার রাতে পৌরসদরের বোয়ালমারী চৌরাস্তায় একটি খাবার হোটেলে এ ঘটনা ঘটে। একই রাতে উপজেলার শেখর ইউনিয়নের শেখর গ্রামে ঈগল প্রতীকের দুই সমর্থক ভোট চাইতে গিয়ে নৌকার সমর্থকদের হাতে মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জামালপুর-৫ (সদর) আসনের রানাগাছা ইউনিয়নে নৌকার সমর্থকদের তিনটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারকেন্দ্র ভাঙচুরের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। বুধবার রাত ৯টার দিকে সদর উপজেলার নান্দিনা মহেষপুর কালীবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এরপর স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা নান্দিনা মহেষপুর কালীবাড়ি এলাকায় জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে তিন পুলিশ সদস্যসহ আটজন আহত হন।
ঝিনাইদহে নির্বাচনী সমাবেশ কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় দুটি জায়গায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। গতকাল সকালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রফিকুল ইসলাম এ আদেশ জারি করেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী নাসের শাহরিয়ার জাহেদী ও নৌকার প্রার্থী তাহজীব আলম সিদ্দিকীর জনসভাকে কেন্দ্র করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কুমিল্লার চান্দিনায় নৌকার প্রচারণার মাইকিংয়ের সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার রাত ৮টার দিকে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছায়কোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে একজন অগ্নিদগ্ধসহ দুজন আহত হয়েছেন। নৌকার সমর্থকদের অভিযোগ, স্বতন্ত্র ঈগল প্রতীকের প্রার্থীর অনুসারী এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
গাজীপুরের শ্রীপুরে নৌকার নির্বাচনী অফিসে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা আগুন দিয়েছে বলে দাবি করছেন নৌকার কর্মী-সমর্থকরা। এ সময় অফিসে রাখা অন্তত ২৫টি প্লাস্টিকের চেয়ার লুট হয়। বুধবার মধ্যরাতে তেলিহাটি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের টেপিরবাড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
খুলনা-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএম মোর্ত্তজা রশিদী দারার কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্রে গেলে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন নৌকার প্রার্থী আবদুস সালাম মুর্শেদী। গতকাল খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়।
রাজবাড়ী-২ আসনে নৌকার প্রার্থী জিল্লুল হাকিমের ছেলে মিতুল হাকিমসহ সমর্থকের বিরুদ্ধে অস্ত্র দেখিয়ে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক বরাবর এ অভিযোগ দেন আসনটির স্বতন্ত্র প্রার্থী (ঈগল) নূরে আলম সিদ্দিকী।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক এবং ঢামেক ও সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধি
