সংঘাত নয় নির্বাচন হোক উৎসবমুখর

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:৫১ এএম

গণতন্ত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সহনশীলতা। নিজ পছন্দ অনুযায়ী, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্যই গণতন্ত্রের আবির্ভাব। যে বা যারা এই প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে জনগণের মতামতকে সানন্দে মেনে নেওয়ার মানসিকতা রাখেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিনিই নেতা হিসেবে এগিয়ে আসেন। স্বাধীনতাউত্তরকাল থেকেই গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। তবুও এ অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুদৃঢ় করতে প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগের প্রতি বাংলার জনগণ যদি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সমর্থন না দিত, তাহলে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ কখনো সর্বসাধারণের যুদ্ধ হিসেবে পরিগণিত হতো না। তাই এটি নির্দ্বিধায় বলা যায়, নিঃশঙ্ক চিত্তে, উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত সত্তরের সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের উৎপত্তিতে অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির জনক তথা বিশ্বের অন্যতম জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক ঘটনা, স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ছন্দপতন ঘটায়। একের পর এক সামরিক শাসকদের ছায়াতলে গড়ে ওঠে রাজনৈতিক দল। গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে ভোটাধিকার হরণ করে শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতন্ত্রের নামে এক ধরনের হোলি খেলা শুরু হয়। এভাবেই চলে যায় দুই দশক। পেশাজীবীদের অব্যাহত সমর্থন, গণতন্ত্রের প্রতি ছাত্রসমাজের অব্যাহত আন্দোলনের চাপে গড়ে ওঠে সাত দলীয়, পনেরো দলীয় ঐক্যজোট। যুগপৎ আন্দোলনে বিদায় নেয় ভোটাধিকার হরণকারী একনায়ক সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়েই ’৯১, ’৯৬ আর ২০০৮ সালে গণতন্ত্রের পুনঃআবির্ভাব হয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্যি ছলে, বলে, কৌশলে জনগণকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার অপকৌশলে বারবার হোঁচট খেয়েছে গণতন্ত্র, ভোটাধিকারের উৎসব থেকে বঞ্চিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। ইতিহাসের দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থেকে ঈর্ষণীয় উন্নয়ন উপহার দিয়ে শেখ হাসিনা অনন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুকুট পেলেও, জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেওয়ার চ্যালেঞ্জটি এখনো রয়ে গেছে। দেশি-বিদেশি উদ্বেগ সেই চ্যালেঞ্জটিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, ৭ জানুয়ারি একটি উৎসবমুখর ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিয়ে একদিকে তিনি জনগণের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠায় যেমন বদ্ধপরিকর, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রমাণ করতে চান বাংলাদেশেও ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে বিনা বাধায় পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে জনগণের। শতাধিক আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ, এমন সম্ভাব্য পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত বহন করে।

উল্টোদিকে, ‘জনগণ নয়, শেখ হাসিনাই ক্ষমতায় আনবেন’, এমন ধারণা পোষণকারী কিছু রাজনৈতিক নেতা যেন কোনোভাবেই শেখ হাসিনার সদিচ্ছার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। পরিস্থিতি বৈরী করে তুলছেন, সংঘাত ও সহিংসতার পরিস্থিতি তৈরি করে বঙ্গবন্ধুকন্যার সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। কেন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে কিছু সংখ্যক মানুষ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন, এ নিয়ে তাদের যেন ক্ষোভের সীমা নেই। শক্তিমত্তা আর দাপট দেখিয়ে, এদের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই যেন গণতন্ত্র বেঁচে যায়! আর এ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে শতাধিক সংঘাতের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, বহিঃশক্তির নানা ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে দৃঢ়চিত্তে বঙ্গবন্ধুকন্যা এগিয়ে যাচ্ছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দলীয় সরকারের অধীনে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান এবং নির্বাচন কমিশন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আসন্ন নির্বাচনটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ বেশিরভাগ প্রার্থী একই আদর্শের অনুসারী। এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়, দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকারে আসছে শেখ হাসিনার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আর বিপরীতে স্বতন্ত্র বিজয়ীদের সংখ্যাটি যে বেশি হবে তাও অনুমান করা যায়। মোট কথা সবাই বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আর স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে এমন একটি সরকার গঠিত হলে, বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি হবে বাধাহীন, শেখ হাসিনা হবেন বিশ্ববরেণ্য। মাত্র ৬০ থেকে ৭০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সে আসনগুলোতে মরিয়া হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ। এসব আসনে কিছু সংখ্যক রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট মানুষ জন-আকাক্সক্ষা আর শেখ হাসিনার চাওয়া-পাওয়া কোনো কিছুর প্রতিই শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করে, তারা যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে মরিয়া। কেউ বলছেন হাত কেটে দেবেন, কেউ বলছেন সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে বিজয় নিশ্চিত করবেন। যার ফলশ্রুতিতে ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত, সহিংসতা। যে কারণে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বল প্রয়োগ, সংঘাত, সহিংসতায় যদি নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে এই উদ্বেগ শেখ হাসিনার সদিচ্ছাকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করবে, মোটা দাগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ।

আগামীকালই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু উৎসবমুখর নির্বাচনের মাঠে সংশয় সন্দেহ বাড়ছে। একদল অতি উৎসাহী মানুষের বেপরোয়া কার্যক্রম, সেই সংশয় আর সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি  মোটামুটি নিশ্চিত, সব রেকর্ড ভঙ্গ করে বিজয়ের পথে বঙ্গবন্ধুর দল। বড়জোর ৬০-৭০টি আসনে তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কেউ কেউ শেখ হাসিনার সদিচ্ছা আর প্রত্যাশার বিপক্ষে লড়ছেন। সংঘাত-সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে তাদের এ লড়াই উৎসবমুখর নির্বাচনের পথে যেমন অন্তরায় সৃষ্টি করবে, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও প্রশ্নবিদ্ধ হবে নির্বাচন চূড়ান্ত বিবেচনায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ। যদিও বিএনপি নির্বাচনের দিনেও হরতাল ডেকেছে। তাতে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। এখনই নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের উচিত সময়ক্ষেপণ না করে সুকঠিন হাতে সংঘাত, সহিংসতাপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার পরিবেশ তৈরি করা। যদি তাই হয়, তবে একদিকে যেমন জিতে যাবে দেশ, অন্যদিকে একটি ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক বিশ্বে বঙ্গবন্ধু কন্যা হবেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অনুকরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

লেখক : কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক ক্যালগেরি, কানাডা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত