'কায়দা-কানুনকে' ভয় পাচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা

  • স্বতন্ত্র চায় বেশি ভোটার নৌকা চায় নিজের ভোট
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৪, ১১:৩৩ এএম

সবকিছু সামাল দেওয়ার পর এবার ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য মুখিয়ে আছে আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে আগামীকাল রবিবার। আওয়ামী লীগের কাছে এখন নৌকা জেতার চেয়ে বেশি গুরুত্বের হয়ে উঠেছে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ঘটানো। ভোটার উপস্থিতি দেখিয়ে নির্বাচন পরবর্তী দেশি-বিদেশি সমালোচনা সামাল দিতে পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে আওয়ামী লীগ।

দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি সমালোচনা সামাল দেওয়া বা দুর্বল করার বড় হাতিয়ার হাতে পাবে আওয়ামী লীগ। তবে মাঠের চিত্র অন্যরকম। কেন্দ্রে ভোটার আনার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশ তৎপর হলেও দলের মনোনীত নৌকার প্রার্থীরা চান আটকাতে। কয়েকটি জেলা ও বেশ কয়েকটি সংসদীয় আসনে খোঁজ নিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

স্থানীয় ভোটার ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৌকার প্রার্থীরা ভোটার উপস্থিতিকে নিজেদের জন্য ঝুঁকির মনে করছেন।

রাজশাহী জেলার ছয়টি আসনের সবকটিতেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটার টানতে চান। নৌকার প্রার্থীরা চান আটকাতে। খুলনা, যশোর, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লার দুটি আসন, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের দুটি আসন, রংপুরের একটি, দিনাজপুর, বগুড়া, ঝিনাইদহ, গাজীপুর, নরসিংদী, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, বরিশাল, পিরোজপুরসহ কয়েকটি জেলায় ভোটার আটকাতে চান নৌকার প্রার্থীরা।

মন্ত্রিসভার এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামে ১৬টির মধ্যে ৭টি আসনে নৌকা নিশ্চিত বিজয়ের পথে থাকলেও ৯টিতে নৌকার প্রার্থীরা ভোটার আটকাতে চান। এসব জেলার স্থানীয় নেতারা মনে করছেন, ভোটার উপস্থিতি বেড়ে গেলে নৌকার বিপক্ষে ব্যালটে সিল পড়বে বেশি। ভোটার নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সেগুলো নৌকায়ই পড়বে। আবার স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মনে করছেন, ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের ভোটও পড়বে তাদের বাক্সে।

যেসব জেলার চিত্র পাওয়া গেছে, সেখানে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অধিক গুরুত্বের ভোটার উপস্থিতির চেয়ে নৌকার প্রার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিজেদের জেতাটাই। ভোটার কম আসুক অথবা বেশি তাতে কোনো আগ্রহ নেই তাদের। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটার উপস্থিতি ঘটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তবে যেসব আসনে নৌকা প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত সেসব আসনে নৌকার প্রার্থীরাও ভোটার টানতে সবরকম প্রচারণা করেছেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত না করে নৌকা জেতার চেয়ে ভোটার উপস্থিতি ঘটিয়ে স্বতন্ত্র জিতলে বেশি লাভ হবে। এটাই মনে করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তারা বলেন, নৌকা জিতল না স্বতন্ত্র প্রার্থী জিতল, এ বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার চেয়ে ভোটার উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেজন্যই মূলত ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র রাখার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটের মাঠে মারামারি-হানাহানি ঘটলেও প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো হুঁশিয়ারি করছে না আওয়ামী লীগ। বরং গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

স্বতন্ত্রদের কোনো প্রকার হুঁশিয়ারি জানালে ভোটের মাঠে ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব পড়তে পারে মনে করে দলটি। ফলে জেনেবুঝে চুপচাপ রয়েছে আওয়ামী লীগ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ চায় ভোটকেন্দ্রে সর্বোচ্চসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। তিনি বলেন, ‘এই ভোট শুধু জিতে আসার ভোট নয়। প্রার্থীদের কাছে নির্দেশনা হলো ভোটার নিয়ে আসা।’ খুলনা-৩ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন এ নেতা। তিনি বলেন, জেতার চেয়ে প্রচারণা বেশি চালিয়েছে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য।

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘কায়দা-কানুনকে’ ভয় পাচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা। অন্তত ২০টি সংসদীয় আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তাদের অনুসারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোটের মাঠে তাদের অবস্থান দিনে দিনে শক্ত-পোক্ত হচ্ছে। ভোট প্রচারণায় নেমে ভোটারদের সাড়াও পাচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। শুধু ভয় করছেন ভোটের দিন কোনো ‘কায়দা-কানুন’ ঘটে কি না সেটা। ‘কায়দা-কানুন’ না করলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়জয়কার হবে, এমন দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে।

ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা পেয়ে ভোট করছেন আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। তার ভোটে নামার মাধ্যমে সংসদীয় আসনের দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষ উজ্জীবিত হয়েছেন। জয়ের সন্নিকটে থাকা এ আসনের নৌকার প্রার্থী জেতার চেয়ে কেন্দ্রে ভোটার টানার প্রচারণা বেশি করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাসিম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রার্থী হওয়ায় তিনটি উপজেলা পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়ার সর্বস্তরের মানুষ ভোট উৎসবে মেতে উঠেছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাসিমের নির্বাচন প্রচারণার সমন্বয়ক জালালউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী পাপ্পু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেনী-১ আসনে ভোটবিপ্লব ঘটবে এবার। দলমত নির্বিশেষে সবাই নাসিম ভাইয়ের জন্য ভোট উৎসবে মেতে উঠেছেন।’

মাদারীপুর-৩ আসনে নৌকা মনোনীত প্রার্থী আবদুস সোবহান গোলাপ। তিনি আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। তার সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা বেগম কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এ আসনটিতে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হতে অনুরোধ জানিয়েছেন ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা। কিন্তু ভোটার উপস্থিতি কম ঘটানোর জন্য নৌকা প্রার্থীর সমর্থকরা বিভিন্ন অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নেত্রী (শেখ হাসিনা) ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ঘটনার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমি সেভাবে প্রচারণা চালিয়েছি। এ আসনে আমার প্রতিপক্ষ প্রার্থীর প্রচারণার দায়িত্বে থাকা নেতাকর্মীরা ভোটার আটকানোর জন্য অপপ্রচারে লিপ্ত। ভোটার উপস্থিতি বাড়লে পরাজয় ঘটবে এ ভয়ে ভোটার আটকানোর চেষ্টা করছে।’

পিরোজপুর-২ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট করছেন ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। প্রায় ৪০ বছর এ আসনটির রাজা তিনিই। এবার নিশ্চিত আসনেই তার রাজত্বকে নড়বড়ে করে তুলেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দীন মহারাজ। ঈগল প্রতীক নিয়ে এ প্রার্থী ভোটের মাঠ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন ইতিমধ্যে।

স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটের মাঠ মহারাজের নিয়ন্ত্রণে। এটা জেনে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থকরা ভোটারদের কেন্দ্রে আসা আটকাতে চান।’ তিনি মনে করেন, হস্তক্ষেপ না হলে পিরোজপুরেই নয়, সারা দেশে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয়জয়কার হবে।

দেশি-বিদেশি নানা ঝড়ঝাপ্টা সামাল দিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় থেকেছে আওয়ামী লীগ। শেষ পর্যন্ত আগামী রবিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেই ভোট। ভোটের পরে ভোট নিয়ে দেশি-বিদেশি সমালোচনা দূর করতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোটবিতর্ক দুর্বল করতে দুটি বিষয় গুরুত্বে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি বিএনপি নির্বাচনে না থাকলেও নিবন্ধিত বেশিরভাগ দল নির্বাচনে থাকলে বিএনপির না থাকা তখন আর বড় হয়ে উঠবে না মনে করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ২৮টি দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিএনপির নির্বাচনে না থাকাকে ‘ডিফাইন’ করা যাবে।

নির্বাচন বিতর্ক দূর করতে অন্যটি হলো ভোটার বাড়ানোর পরিকল্পনা। স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের মাঠে রেখে দিয়েছেন শেখ হাসিনা এ পরিকল্পনা থেকে। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনে থাকায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোট বাড়বে। নির্বাচন বিতর্ক মোকাবিলা করতে হলে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি হবে শেখ হাসিনার বড় অস্ত্র।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত