ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে লোহিত সাগর থেকে সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ সরিয়ে নিচ্ছে মায়ার্সক ও হাপাগ-লয়েডের মতো বিশ্বের বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো। এতে অদূর ভবিষ্যতের জন্য পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ও খরচ বৃদ্ধি ঘটতে পারে বলে গ্রাহকদের সতর্ক করে দিয়েছে এসব কোম্পানি। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের একটি বড় অংশই এই পথ দিয়ে চলাচল করে। এর ফলে আগামীতে রপ্তানি পণ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাকের পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
জাহাজ কোম্পানিগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, লোহিত সাগরের পরিবর্তে এখন আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চালাতে হচ্ছে। এতে যাত্রাপথে সময় বেড়েছে এক থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত। আফ্রিকা ঘুরে রাউন্ড ট্রিপ যাতায়াতের কারণে জ্বালানি ও বিমা খরচের পাশাপাশি ক্রু-টাইমও বেশি লাগছে। এতে সব মিলিয়ে বাড়ছে শিপিং খরচ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ কিলোমিটার বাড়তি পথ পাড়ি দিতে হওয়ায় পণ্য পরিবহনে দুই সপ্তাহ বেশি সময় লাগছে। এতে পরিবহন খরচ ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাচ্ছে। জাহাজগুলো অতিরিক্ত খরচ হিসেবে প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারের জন্য ৭০০ থেকে দেড় হাজার ডলার পর্যন্ত মাশুল আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছে।
এ ধরনের বাড়তি খরচ বাংলাদেশের রপ্তানিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। জাহাজ পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল ও কানাডার বন্দরগুলোয়। যা মূলত লোহিত সাগর দিয়ে যায় এবং দেশের আমদানির আট থেকে ১০ শতাংশ আসে ওই পথ দিয়ে। এখন কনটেইনারবাহী জাহাজগুলো এই পথ এড়িয়ে চলায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়বে। যদিও এই ব্যয় ক্রেতারাই বহন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা রপ্তানিকারকের ঘাড়েই বর্তাবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। সার্বিক পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলোতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ বাড়ছে।
গত ৪ জানুয়ারি কন্টেইনার বুকিং প্রতিষ্ঠান ফ্রেইটস ডট কমের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে ব্লুমবার্গ জানায়, এশিয়া থেকে উত্তর ইউরোপগামী ৪০ ফুটের একটি কন্টেইনারের ভাড়া ৪ হাজার ডলার বেড়েছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ।
গত বছরের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। সেই থেকে গাজায় অব্যাহতভাবে বোমা হামলা ও স্থল অভিযান চালিয়ে আসছে ইসরায়েলি বাহিনী। এমন প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি হামাস যোদ্ধাদের সমর্থন দিতে লোহিত সাগরে পণ্য চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। কনটেইনারবাহী জাহাজ থেকে শুরু করে তেলের ট্যাংকার, যেকোনো দেশের পতাকাবাহী সব ধরনের জাহাজেই তারা হামলা করছে। এর ফলে সুয়েজ খাল হয়ে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
সুয়েজ খালের মাধ্যমে লোহিত সাগর দিয়ে এশিয়া থেকে ইউরোপে যাতায়াত সংক্ষিপ্ততম পথ। এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত এই পথে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, গাড়ি, শস্য ও ভোগ্যপণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়।
গত শুক্রবার রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক নৌ টহল দল লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা ঠেকানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। এ জন্য তৈরি করা হয়েছে মাল্টিন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভস বা বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা উদ্যোগ। ভারতও লোহিত সাগরের চারপাশে ভারতীয় কনটেইনারবাহী জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিচ্ছে। এতেও হুতিদের হামলা কমানো যায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে এ পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো সরিয়ে নিচ্ছে কোম্পানিগুলো।
গত ১ জানুয়ারি লোহিত সাগরে মায়ার্সকের একটি কনটেইনারবাহী জাহাজে হামলা চালায় হুতিরা। হামলাকারীরা জাহাজে ওঠারও চেষ্টা করে। ডেনমার্কভিত্তিক মায়ার্সক বিশ্বের বড় জাহাজ কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি, যা বিশ্বের কনটেইনার পরিবহন বাণিজ্যের ছয় ভাগের এক ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে মায়ার্সক জানায়, একটি জাহাজে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর লোহিত সাগরের দিকে চলাচলকারী সব জাহাজ থামিয়ে দেবে তারা। লোহিত সাগরের পরিবর্তে জাহাজগুলো এখন আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাতায়াত করছে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার মায়ার্সক এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘পরিস্থিতি ক্রমাগত অস্থির হচ্ছে এবং খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাদের হাতে থাকা সব তথ্য নিশ্চিত করছে যে ওই অঞ্চলে (লোহিত সাগর) উচ্চ নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে অদূর ভবিষ্যতে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপের দিকে সরিয়ে নেওয়া হবে।’
আফ্রিকা ও এশিয়া অঞ্চলের চারপাশে থাকা জাহাজগুলোকে এ বিষয়ে জানানো শুরু করেছে মায়ার্সক। ইতিমধ্যে তারা এশিয়ামুখী পাঁচটি কনটেইনারবাহী জাহাজের মধ্যে চারটিকে আফ্রিকার দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। জার্মানভিত্তিক কনটেইনার বহনকারী আরেক শীর্ষ জাহাজ কোম্পানি হাপাগ-লয়েড গত ১৮ থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে লোহিত সাগর অঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী অন্তত ২৫টি জাহাজকে সরিয়ে নিয়েছে। হাপাগ-লয়েডের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, এতে তাদের লাখ লাখ ইউরো বেশি খরচ করতে হয়েছে। পাশাপাশি এলাকা বিবেচনায় যাত্রার সময় এক থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছে।
বৈশ্বিক কনটেইনারবাহী জাহাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলাচল করে সুয়েজ খাল দিয়ে। কিন্তু বর্তমানে আফ্রিকার একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে জাহাজগুলোকে চলাচল করতে বলা হয়েছে। এতে এশিয়া ও উত্তর ইউরোপের মধ্যে প্রতি রাউন্ড ট্রিপের জন্য ১০ লাখ ডলারের অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হতে পারে।
