হাসিনার জয়ে পশ্চিম সাময়িকভাবে পিছু হটেছে

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:৫৫ এএম

সত্যি কথা বলতে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলাদেশের এবারের নির্বাচন নিয়ে  সেভাবে তেমন কোনো কৌতূহল দেখতে পাইনি। এই মুহূর্তে দুটো বিষয় স্থানীয় মিডিয়ার শিরোনামে। সুন্দরবন লাগোয়া সন্দেশখালিতে তৃণমূল আশ্রিত এক দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সির তদন্ত করতে যাওয়া নিয়ে তুলকালাম ঘটে যাওয়া। আর ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বাম যুবদের সমাবেশ। দুটির সঙ্গেই আগামীদিনের লোকসভা নির্বাচনের যোগ আছে। বামেদের শক্তি এ রাজ্যে ফিরছে কতটা, তার খানিকটা আঁচ পাওয়া যাবে এবারের ব্রিগেড সমাবেশে। অন্যদিকে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে থাকা তৃণমূল কি পারবে আগামী লোকসভায় বিপুল সংখ্যক আসন জিততে! ফলে পাশের বাড়ির নির্বাচন নিয়ে সাধারণভাবে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী সমাজের মধ্যেও প্রতিবেশীর ভোট নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।

অথচ, রাজনৈতিকভাবে অখণ্ড বাংলা বিভাজনের বহু বছর বাদেও এক ভূখ- অপরের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে ভারতের পণ্যের রমরমা দেখলে বোঝা যায় না যে আমি ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, সিলেট না পশ্চিমবঙ্গ, বিহার বা উত্তর প্রদেশের কোন অঞ্চলে বসে আছি। বাংলাদেশে বহুবার গেছি। যাই। যাব। আমাদের, এদেশের অনেক সাংবাদিকদের মতো সরকারি অতিথি হয়ে যাই না বলেই হয়তো খোলা মনে দেশটাকে দেখতে পাই। ফলে এটাও বুঝতে পারি যে, চাই বা না চাই ওদেশের ভালোমন্দ হাজার এড়িয়ে গেলেও আমাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। থাকবেও।

বাংলাদেশের ভোটের রেজাল্ট কী হবে তা নিয়ে এখানকার কারো কোনো সন্দেহ আগে থেকেই ছিল না। আর আজ যখন ভোট হয়ে গেল, রেজাল্টও বের হচ্ছে তখন তো দেখাই যাচ্ছে বিপুল ভোটে সর্বত্রই জিততে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষ অবশ্য আওয়ামী লীগ ছাড়া, খুব একটা অন্য কোনো দলের নামই শোনেননি সাধারণভাবে। আওয়ামী লীগ আর শেখ মুজিবুর রহমান এটুকুই এ রাজ্যের এক টুকরো বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ছবি বলতে বাড়তি হচ্ছে পদ্মা। ইলিশ মাছ। ভাষা আন্দোলন এবং বিপুল পরিমাণ নস্টালজিয়া। কীভাবে ভিটেমাটি ছেড়ে একদিন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পূর্বপুরুষদের চলে আসতে হয়েছিল সেই গল্প।

কখনো কখনো আমার অবশ্য মনে হয়, প্রশ্ন ওঠে যে গণতান্ত্রিক, সমাজবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ যে বাংলাদেশের স্বপ্ন একদিন মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমদরা দেখেছিলেন তা কি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়েছে! একটি পরিসংখ্যান দেখছিলাম ১৫ বছর আগে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় কোটিপতি প্রার্থী ছিলেন সাতাশ শতাংশ। আর এবার তা বেড়ে হয়েছে ৮৬ শতাংশ। এই যে রাতারাতি বিপুল সম্পদশালী প্রার্থীদের আবির্ভাব তার পেছনে ঠিক কী কী কারণ আছে জানতে খুব ইচ্ছে করে। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে স্মার্ট জনপদের কথা বলছেন তা তো নিশ্চিত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হচ্ছে। পদ্মা সেতু, প্রশস্ত উড়ালপুল, ঢাকায় মেট্রো রেল ইত্যাদি ইত্যাদি উপরিকাঠামো যে বদলে গেছে, আধুনিক হয়েছে তা নিয়ে তো সন্দেহ নেই।

আসলে উন্নয়নের, পরিবর্তনের এই মডেল সারা পৃথিবীতে নিও লিবারেল মডেল, যা দেশে দেশে ধনী-গরিবের মধ্যে বিপুল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিভাজন বাড়িয়ে তোলে। ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকার সর্বত্রই এই মডেলের কারণে বৈষম্য বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ক্ষোভ, যন্ত্রণা এবং দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বিপুল সংখ্যক জনগণের লড়াই-সংগ্রাম।

আপাত চোখে ভারত এখন শক্তিশালী এক দেশ। মজবুত অর্থনীতি, বিপুল প্রোপাগান্ডা, তর্জন-গর্জন, অমুক সড়ক, তমুক শপিং মল, আধুনিক প্রযুক্তি, বিদেশি পণ্য, মোদিজির দশ লাখ টাকার কোট, আদানি, আম্বানি আরও কত শত ধনীর সম্পদ বৃদ্ধি। অথচ সরকারি হিসাবেই আজও আমার দেশের পাঁচজন মানুষের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। ফলে নিও লিবারেল মডেল ঝকঝকে দেখতে হলেও সে কতটা খাঁটি তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। পাশাপাশি আরও একটা কথা, এখন সারা দুনিয়ার রাজনীতি বিজ্ঞানীরা বলছেন, তথাকথিত গণতন্ত্রের সংজ্ঞাই এখন বাতিল হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী যে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল তার পতাকা এখন ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা উন্নয়নের যে মডেলের ভিত্তি গত ১৫ বছরে বাস্তব করে তুলেছেন, এবার আরেক দফা সরকার গঠন করে সেটিকেই এগিয়ে নেবেন না বিভাজন কমানোর পরিকল্পনা নেবেন তা দেখার বিষয়।

যেহেতু আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা হয়নি, তবে গতিপ্রকৃতি-পূর্বাপর বিবেচনা করে ধরে নিচ্ছি শেখ হাসিনাই ভোটে জিতছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে জেতার ঘোষণার পরে, লিখে দিতে পারি, তিনি প্রথম অভিনন্দন বার্তাটি পাবেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে। তাই আপনি আমি বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামালাম কি ঘামালাম না তাতে কিছু এসে যায় না। ভারত সরকারের যথেষ্ট মাথাব্যথা রয়েছে প্রতিবেশীর অন্দরমহলের ঘটনা নিয়ে।

বাংলাদেশের তিন দিকেই প্রবল পরাক্রান্ত ভারতের উপস্থিতি জিও পলিটিক্যাল রাজনীতির দিক দিয়ে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে এই মুহূর্তে যে সরকার চলছে, তার পক্ষে দুটো সমস্যা বেশ জটিল। এই সরকার চরম হিন্দুত্ববাদী। ফলে রাজনীতির জন্য, ভোটের কারণে তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ পড়শীকে প্রায়ই খারাপ ভাষায় গালমন্দ করতে হয়। দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রীকেও বাংলাদেশের মানুষকে সকাল বিকেল ঘুষপেটিয়া বলে গাল দিতে হয়। সীমান্তে অনুপ্রবেশের ধুয়ো তুলে পড়শী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে গাল দিতে হয়। অথচ ভারত জানে, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশকে তার কতটা প্রয়োজন। ঢাকা গেলে আপনি এমন একটিও জিনিস পাবেন না যা ভারতের নয়। ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজার ব্রাশ পেস্ট থেকে রাস্তায় নেমে যে গাড়ি, ট্রাক, সিএনজি বা মধ্যবিত্ত ঘরে মোবাইল, কম্পিউটার। সর্বক্ষেত্রে ভারতের পণ্য। বাংলাদেশের খাদ্য আমদানির মুখ্য দেশ ভারত। ভারতের উত্তর-পূর্বের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশকে দরকার। তাই ভারত সবসময় খোলামেলা বলে যে তাদের জন্য বাংলাদেশে বন্ধু সরকার দরকার। ভোটের প্রয়োজন হলে গাল দেবে আর মুনাফা করতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করবে, ভারতের এই সুবিধাবাদী নীতি ইদানীং ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। পড়শী বন্ধু হলে তো আপত্তি নেই। কিন্তু সে যদি তার অপব্যবহার করে তাহলে তো মুশকিল।

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত আমদানি-নির্ভর। গর্ব করার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প তৈরি পোশাক শিল্প। আর দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে রয়েছে রেমিট্যান্সের ওপরে। ভারী শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এশিয়ার বিখ্যাত আদমজী জুটমিল বন্ধ হয়েছে ২০০২ সালে। শেখ হাসিনার সামনে অনেক পরীক্ষা। তার গর্বের স্মার্ট দেশ গড়ে উঠছে ঠিকই কিন্তু সেখানে চীনের নানামুখী উপস্থিতি ভূ-রাজনীতির প্রশ্নে মুখে পড়ছে। ভারত ও চীন দুই বিবদমান প্রতিপক্ষকে সামাল দিতে হবে তাকে একই সঙ্গে। কাজটি যথেষ্ট কঠিন তা একটি শিশুও অনুমান করতে পারে। যদিও ভোটের ঠিক আগের দিন চীনের সংবাদপত্র যেভাবে হঠাৎ মোদি সরকারের প্রশংসা করেছে তা গভীর ইঙ্গিতবাহী। হতে পারে চীন ভারতের সঙ্গে সমঝোতা করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কৌশলে ভাগবাটোয়ারা করে নিতে চাইছে। সেক্ষেত্রে চীনের লক্ষ্য আমেরিকাকে দূরে রাখা। এবার ভোটে হাসিনার জয়ে পশ্চিমের প্রভাব সাময়িকভাবে পিছু হটেছে এটা নিশ্চিত।

কিন্তু রাজনীতিতে চিরসত্য বলে কিছু হয় না। মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশের গর্বের বস্ত্র শিল্পের বিশাল ক্রেতা কিন্তু ইউরোপ আমেরিকাই। সে দিকটাও লক্ষ রাখতে হবে শেখ হাসিনা সরকারকে। এবার এই নিরঙ্কুশ জয় শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক স্তরে কিছুটা প্রশ্নের মুখে ফেলবে নিশ্চিত। তার মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন উঠবে। মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে ক্ষুব্ধ জনগণ ও সমর্থকদের দলটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। আন্দোলন গড়ে তুলতে পুরোপুরি ব্যর্থ একটি দলের ওপর আস্থা রাখাও সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন।

গণতন্ত্রের চিরায়ত মডেল যদি না থাকে তবে অন্য কোনো নতুন মডেল সামনে আসতেই পারে। শুধু দেখতে হবে তাতে জনগণের কতটা মঙ্গল হবে। এই মঙ্গল প্রশ্নেও বিএনপির বক্তব্য স্পষ্ট নয়। কেবল, আওয়ামী লীগ খারাপ আমি ভালো এ যুক্তি ধোপে টেকে না। পরিবর্তনের জন্য নতুন কোনো কর্মসূচি বিএনপি নিয়েছে বলে আমার অন্তত মনে হয়নি। তাছাড়া তাদের শাসনকালে বসন্তের বাতাস বয়ে যেত এমন কথাও সত্যি নয়।

লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত