দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রভাবশালীদের দাপট পরিলক্ষিত হয়েছে ভোটের মাঠে। তবে ভোটকেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসাররা ছিলেন নীরব ভূমিকায়।
গতকাল রবিবার ভোটগ্রহণ চলাকালে বরিশাল ৩ ও ৫ আসনে বেশ কিছু কেন্দ্রে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত কেন্দ্রগুলো ছিল একদম নীরব। ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত প্রিসাইডিং অফিসারের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলোতে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি ভোট পড়েছে। এরপর থেকেই কেন্দ্রেগুলো প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়।
স্থানীয় ও ভোটারদের ভাষ্য, বরিশাল-৫ আসনের নির্বাচন হয়েছে একপাক্ষিক। আওয়ামী লীগের লোকজনই আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে দেয়নি। ট্রাক প্রতীকের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নিজেরাই এজেন্ট বানিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের কেন্দ্রগুলোতে বেশি প্রভাব ছিল তাদের।
সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের কেন্দ্রটি ছিল নৌকার দখলে। এমনটি অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, কেন্দ্রের চারপাশে নৌকা প্রার্থীর সমর্থকরা ঘিরে রেখেছে। দুপুর ২টা পর্যন্ত এ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৫৪২টি। মোট ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ১৭৬টি। এদিকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে থেকেই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুনের সামনেই কয়েকজন নারী ও কয়েকজন পুরুষ ভোটকক্ষে প্রবেশ করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ভোট দিতে দেখা যায়। তখন প্রিসাইডিং অফিসার বারবার অনুরোধ করলেও কেউ কর্ণপাত করেননি। এই কেন্দ্রের সামনে কয়েকজন তরুণ ভোটার ভোট দিয়ে আলাপ করছিলেন কে কয়টি ভোট দিয়েছেন সেটা নিয়ে। এই আলাপের সম্পূর্ণ রেকর্ড দেশ রূপান্তরের হাতে আছে।
কলেজ রোডের বাসিন্দ মো. হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলাকার একজন প্রভাশালী নেতা আছেন। তিনি ভাড়া করে নারী ভোটার নিয়ে আসছেন। তাদের সারা দিন কেন্দ্রের পাশেই বসিয়ে রেখেছেন। যখন সুযোগ হয় তখনই তারা ভোট দিয়ে আসেন। আমি ১০-১২ বার তাদের লাইন দিয়ে ভেতরে যেতে দেখেছি। এরপর আমি যখন ভোট দিতে গেলাম তখনো দেখি তারা ইচ্ছেমতো ব্যালটে সিল মারছে।’ এ বিষয়ে প্রিসাইডিং অফিসার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে সকাল থেকেই বরিশাল-৫ আসনের ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল ফাঁকা। কোথাও ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়নি। একই রকম চিত্র ছিল বরিশাল-১, ২ ও ৬ আসনে। এদিন সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বরিশাল নগরীর বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, অমৃত লাল দে কলেজ, কাউনিয়া প্রধান সড়কসংলগ্ন মানিক মিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সদর রোডের অশ্বিনী কুমার হল, শায়েস্তাবাদ মোয়াজ্জেম হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়, শায়েস্তাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি একেবারেই কম ছিল। আর এসব কেন্দ্রে পুরুষ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। অথচ কেন্দ্রের আশপাশে ট্রাক ও নৌকার সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এর কিছু সময় পর থেকেই কেন্দ্রগুলোর চারপাশে কমতে থাকে ট্রাকের প্রতীকের সমর্থকরা। তাদের অভিযোগ, নৌকার সমর্থকরা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের সরিয়ে দিয়েছে।
বরিশাল নগরীর বাসিন্দা মো. শামিম বলেন, ‘ভোট দিয়ে কী করব? দেখতে আসলাম। আমার ভোট এলাকার নেতারা দিয়ে দেবে।’
শায়েস্তাবাদের বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম বলেন, ‘ভোটারদের লাইন নেই। তাই দ্রুতই ভোট দিলাম। কিন্তু আমার মনে হয় না সব ভোটার ভোট দিতে আসবে। কারণ ভোট নিয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।’
অন্যদিকে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকায় ব্যালট বাক্সগুলো খালিই পড়েছিল। কেন্দ্রগুলোতে এজেন্ট, প্রিসাইডিং অফিসারসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্টরা একরকম গল্প-গুজব করেই কাটিয়ে দিয়েছে ভোটগ্রহণের সময়টি। এদিন সকাল সাড়ে ৮টায় বরিশাল নগরীর কাউনিয়া প্রধান সড়ক মানিক মিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রটি ভোটারশূন্য অবস্থায় দেখা যায়। সকাল ৯টায় নগরীর অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়, সকাল ১০টায় নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের নবগ্রাম রোডসংলগ্ন নওগাঁ মধ্যনগর বিদ্যালয়, সাড়ে ১০টায় নগরীর নব আদর্শ বালক ও বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে এ সময় গড়ে ২০০টি করে ভোট পড়েছে। এ ছাড়া বরিশাল সদর উপজেলার মধ্যে রায়পাশা ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ২১২ নম্বর কেন্দ্রে ৩ হাজার ২০০টি ভোটের মধ্যে সকাল ১০টার সময় ভোট পড়ে ২৪১টি। এরপর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্রাক প্রতীকের সালাহউদ্দিন রিপনের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা, কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ তার সমর্থক ও ভোটারদের ভোট দিতে বাধা প্রদানের অভিযোগ করেন নৌকার প্রার্থীর অনুসারী ও কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
এদিকে বরিশাল-৩ আসনে বাবুগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিন দেখা যায়, ১২১ নম্বর কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ৭৮৮। এর মধ্যে দুপুর ১২টার দিকে এ কেন্দ্রে ভোট পড়ে ২৩৮টি। এ আসনের ১০২ নম্বর কেন্দ্রের ২ কিলোমিটারের মধ্যে ভোটের এক দিন আগে থেকে বিকট আওয়াজ করা হয়। ওই কেন্দ্রে দায়িত্বরত এক আনসার সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা গত রাত (শনিবার) থেকেই শুনেছি, এই ১০২ নম্বর কেন্দ্রে বিকট শব্দ করছে। আর আজ (রবিবার) সকাল থেকেই একের পর এক ককটেল ফোটাচ্ছে, এতে আমরা আতঙ্কে আছি।’
এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. সুমন তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুপুর ২টার মধ্যে কেন্দ্রে ৭০০ ভোট পড়েছে। এখানে মোট ভোটার সংখ্য ৩ হাজার ৭২২। তবে শনিবার রাত থেকে কেন্দ্রের পাশে কিছু সময় পরপর বিকট শব্দ করা হচ্ছে। এতে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে পারে।’
এদিকে বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনে ছয় ঘণ্টায় ২৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। বেলা পৌনে ৩টায় দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বরিশাল সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার ওহিদুজ্জামান মুন্সী। তিনি বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। কোথাও এখন পর্যন্ত কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আমরা একটি আপডেট বের করেছি, সেখানে ২৩ শতাংশ ভোট পড়েছে।’
অন্যদিকে বরিশাল-৪ আসনে অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন আসনটির স্বতন্ত্র প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতা পঙ্কজ নাথ। তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় কোনো সহিংসতা হয়নি। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। যদিও বিএনপি-জামায়াত আওয়ামী লীগের একাংশের লোকজন ভোটারদের কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য প্রচারণা করেছে। সেটা না হলে ভোটের হার আরও বেশি হতো। এখন পর্যন্ত আমি মনে করি, হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ মিলিয়ে আমার ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে।’
