রাজধানীর বাড্ডা সাঁতারকুলে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খতনার পর পাঁচ বছরের শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় মামলা করেছেন তারা বাবা। চিকিৎসায় অবহেলা ছিল কি না, তা জানতে তদন্ত কমিটি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী।
গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম শাহজাহান আকন্দ শুভ এ রিট আবেদনটি করেন। এতে শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় বিবাদীদের (রিট মামলার বিবাদী) ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, আয়ানের পরিবারকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলের আরজি জানানো হয়েছে। আবেদনে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি ও রেজিস্ট্রারকে বিবাদী করা হয়েছে।
একই সঙ্গে অবহেলার অভিযোগে ইউনাইটেড হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সনদ বাতিলের নির্দেশনাসহ এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এক সপ্তাহের মধ্যে দাখিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে আবেদনে।
গত ৩১ ডিসেম্বর বাড্ডার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুন্নতে খতনা করা হয় আয়ানের। খতনা শেষ হলেও আয়ানের জ্ঞান না ফেরায় তাকে গুলশান-২-এর ইউনাইটেড হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখানে আয়ানকে রাখা হয় শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে। সাত দিন পর গত রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আয়ানকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরা। ওই দিন রাতেই ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আয়ানের মৃত্যুসনদ দেয়। তাতে বলা হয়, আয়ানের মৃত্যুর কারণ কার্ডিও-রেসপিরেটরি ফেইলিউর, মাল্টিঅর্গান ফেইলিউর এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।
এ ব্যাপারে রিট আবেদনকারী আইনজীবী শাহজাহান আকন্দ শুভ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের অনুমতি নিয়ে আবেদনটি করা হয়েছে। আদালত বৃহস্পতিবার (আগামীকাল) শুনানির জন্য উপস্থাপন করতে বলেছেন।’
এই আইনজীবী আরও বলেন, ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে ১৫ বছর ধরে চিকিৎসাজনিত অবহেলার অনেক অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাধারণত এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা আলোর মুখ দেখে না। সে জন্য কমিটির প্রতিবেদন সাত দিনের মধ্যে দাখিলের নির্দেশনা চেয়েছেন তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদন চায় মানবাধিকার কমিশন : শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনাকে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভুল চিকিৎসায় কারও মৃত্যু বা ক্ষতি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ঘটনার তদন্তপূর্বক সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তির দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে পাঠাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন কমিশনের চেয়ারম্যান।
বাড্ডা থানায় মামলা : আয়ান মারা যাওয়ার ঘটনায় রাজধানীর বাড্ডা থানায় একটি মামলা করেছেন আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ। গতকাল ওই হাসপাতালের দুজন চিকিৎসকের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা পরিচালক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত কারণ দেখিয়ে এই মামলা করেন।
মামলার এজাহারে শামীম আহমেদ বলেছেন, ডা. তাসনুভা মাহজাবিন, ডা. সাইদ সাব্বির আহম্মেদসহ ওই হাসপাতালের লোকজনের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণেই তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে। তার ছেলেকে কী ধরনের চিকিৎসা বা ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে, তার কোনো কাগজপত্র হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তাদের সরবরাহ করেনি। অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে বেশি লাভবান হওয়ার জন্য তার ছেলেকে ৩১ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারি হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে রাখেন ও রাত ১১টা ২০ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর চিকিৎসা বাবদ ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৫৭ টাকার একটা বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বিষয়টি বাড্ডা থানাকে জানালে পুলিশ গিয়ে তার ছেলের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে আয়ানের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করে। পরে আয়ানকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বরুনা এলাকায় দাফন করা হয়।
বাড্ডা থানার ওসি ইয়াসিন গাজী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘যেহেতু এটা চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়, তাই আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত নেব। তাদের মতামত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি : আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চিকিৎসকদের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখবে কমিটি। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য তিন সদস্য হলেন একই হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, একজন সহকারী পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন সহকারী পরিচালক।
এই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামীকাল (আজ বুধবার) কমিটি হাসপাতাল পরিদর্শন করতে যাবে। সেখানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়লে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে অধিদপ্তর।
এর আগে ১ জানুয়ারি ৭ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি করে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ওই কমিটির ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা।
