পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে রাজধানীর সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এমনকি গত বুধবার পর্যন্ত এ হাসপাতালের নামে কোনো আবেদনও চোখে পড়েনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরি রেগুলেশন (অর্ডিন্যান্স)’ ১৯৮২ অনুযায়ী প্রত্যেক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংককে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। অথচ ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সম্পর্কে অধিদপ্তর কিছুই জানে না। তারা এখনো চিকিৎসা কার্যক্রম চালুর জন্য কোনো আবেদন না করেই হাসপাতাল চালু করেছে। তারা বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। হাসপাতাল চালুর আগে অবশ্যই লাইসেন্স লাগবে। লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনা করার কোনো সুযোগ নেই।
অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শিশু আয়ান মারা যাওয়ার পর আমরা এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছি। হাসপাতালটি চার-পাঁচ মাস ধরে চালু করেছে। গতকাল (বুধবার) পর্যন্ত ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো আবেদন জমা পড়েনি।’
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ইউনাইটেড কর্র্তৃপক্ষ ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের নামে ওই হাসপাতাল পরিচালনা করছে। এমনকি ধানম-িতে “মেডিক্স” নামে তাদের আরেকটি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান আছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা কোনো লাইসেন্স নেই। ধানম-িতে আমরা লাইসেন্স দিয়েছি ইউনাইটেড হেলথ কেয়ারের নামে। কিন্তু সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে মেডিক্স নামে তাদের আরেক প্রতিষ্ঠানের।’
রাজধানীর সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খতনা করাতে এসে মারা যায় ৫ বছরের শিশু আয়ান। গত ৩১ ডিসেম্বর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে খতনা হয় শিশুটির। কিন্তু তার জ্ঞান ফিরে না আসায় তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে টানা সাত দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গত রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আয়ানকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
শিশু আয়ানের মৃত্যুর পর গতকালই প্রথম ওই হাসপাতালের ব্যাপারে মুখ খোলে অধিদপ্তর। দুপুরে শিশুর মৃত্যুর বিচার, হাসপাতালের দুই চিকিৎসককে গ্রেপ্তারসহ ছয় দফা দাবি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে মানববন্ধন করেন আয়ানের স্বজনরা। এরপরই ওই হাসপাতাল নিয়ে কথা বলেন অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. আবু হোসেন মো. মইনুল আহসান।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ নিবন্ধনের আবেদন করেছিল। কিন্তু সেই আবেদন ত্রুটিযুক্ত হওয়ায় তাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় তাদের আবারও যথাযথভাবে আবেদন করতে হবে। কিন্তু এখন যেহেতু নিবন্ধন নেই, তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর কোনো সুযোগ নেই।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি তদন্ত কমিটি করেছে। ১৮ জানুয়ারির মধ্যে কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই আমরা এ মুহূর্তে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তবে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলে অবশ্যই আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
অবশ্য লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে ইউনাইটেড হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফুল হক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড এই নামে বেশ আগেই আবেদন করেছি। এখন অধিদপ্তর বলছে আমাদের আবেদন ত্রুটিযুক্ত। অধিদপ্তর আমাদের অভিভাবক ও রেগুলেটরি বডি, আবেদনে কোনো ত্রুটি থাকলে অবশ্যই আমরা সেটি সংশোধন করে নেব। তবে ত্রুটিবিষয়ক কোনো চিঠি আমাদের কাছে আসেনি।’
অবশ্য হাসপাতালের নামে আলাদা আবেদন করা হয়নি বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড আমাদের মাদার কোম্পানি। ওটার নামে করলেই যেকোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যাবে। কারণ আবেদনের সঙ্গে আমরা সাঁতারকুলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছি। এই কলেজ ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু হাসপাতালের জন্য আমরা বেশ কিছুদিন আগেই আবেদন করেছি।’
আরিফুল হক আরও বলেন, ধানম-িতে মেডিক্স নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান আছে। ওটা ওপিডি। বহির্বিভাগের ডাক্তাররা বসেন। রোগী দেখেন। ওটা হাসপাতাল না।
শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে গাফিলতি ধরা পড়লে অবশ্যই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দেশ রূপান্তরকে জানান অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমুহ) ডা. আবু হোসেন মো. মইনুল আহসান। তিনি বলেন, তারা যেকোনো সময় আবেদন করতে পারে। আজ যদি আবেদন করে তাহলে আজ থেকেই গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু আয়ান যখন মারা গেছে, তখন তো অবৈধ ছিল। এই আবেদন দিয়ে ওই সময় কাভার করবে না। সুতরাং অনিয়ম হলে একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই সময়ের শাস্তি তো তাদের পেতে হবে।
