দ্রুতগতির মেট্রো প্রকল্পের কচ্ছপগতির কাজে ক্ষুব্ধ ও হতাশ রাজধানীবাসী। উদ্বোধনের এক বছর পার হলেও এখনো পুরোদমে চলাচল শুরু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। কবে থেকে সপ্তাহের প্রতিদিন ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করবে তা কর্তৃপক্ষেরও অজানা। উত্তরা থেকে আগারগাঁও সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলাচল করলেও মতিঝিল অংশে বেলা ১১টার পর চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মেট্রোরেলের উদ্বোধনের পর থেকে পুরোদমে চলাচল করে। কিন্তু ঢাকায় মেট্রোরেলের উদ্বোধনের নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। কদিন অন্তর একটি করে মেট্রোস্টেশন চালু করছে। সময়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মেট্রোরেলের কচ্ছপগতির এসব পদক্ষেপে ত্যক্তবিরক্ত যাত্রীরা। সংক্ষুব্ধরা বলছেন, মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতরা অযোগ্য এবং তাদের কারিগরি জ্ঞানের স্বল্পতা রয়েছে। এ জন্য তাদের নেতৃত্বে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের এমন ধীরগতির অবস্থা বিরাজ করছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মেট্রোরেল বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। এই সংস্থার আওতায় ঢাকায় ৬টি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার। মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজগুলো কারিগরি হলেও শুরু থেকে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকারের একজন সাবেক সচিব। এমআরটি-৬ প্রকল্পের পরিচালকও চুক্তি ভিত্তিতে রয়েছেন একজন অতিরিক্ত সচিব। সংস্থার অন্যান্য পদের ক্ষেত্রেও অকারিগরি লোকের আধিক্য লক্ষ করা যায়। অকারিগরি নেতৃত্বের কারণে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পটি যথাসময়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের জাতীয় পর্যায়ের প্রকৌশলীরা এবং তাদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) শুরু থেকে ডিএমটিসিএলের অকারিগরি নেতৃত্বের বিরোধিতা করেছে। তাতে কর্ণপাত করেনি সরকার; যার খেসারত এখন গুনতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেট্রোরেল পরিচালনার নেতৃত্বে রয়েছেন অকারিগরি লোক, অথচ মেট্রোরেল সম্পূর্ণ কারিগরি কাজ। মেট্রোরেল পরিচালনা সংস্থার প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক দুজনই অকারিগরি লোক। অন্যান্য কারিগরি পদেও একই অবস্থা। কোনো প্রকল্পে এমন অবস্থা হলে সেই প্রকল্প ঝুলে যায়। এ ছাড়া অনভিজ্ঞ জনবল দিয়ে মেট্রোরেল পরিচালনা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দুর্বলতার কারণে এমনটা হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশের প্রথম মেট্রোরেলের উদ্বোধন করা হয়। শুরুতে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত দুটো স্টেশনে মেট্রোরেলে যাত্রীরা ওঠানামা করতে পারত। এরপর ধাপে ধাপে ৭টি স্টেশন চালু করতে সময় নেয় ৩ মাস, অর্থাৎ গত বছরের ৩১ মার্চ সবগুলো স্টেশন চালু হয়। একই অবস্থা হয়েছে, আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশেরও। গত ৪ নভেম্বর এই অংশের উদ্বোধন করা হয়। শুরুতে ৩টি স্টেশনে যাত্রী ওঠানামর জন্য চালু করা হয়। বাকি ৪টি স্টেশন চালু করতে সময় লেগেছে ২ মাস; অর্থাৎ গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে মেট্রোরেলের সবগুলো স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা শুরু হয়েছে।
জানতে চাইলে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালেহ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিটিসিএর দায়িত্বে থাকাবস্থায় আমার নেতৃত্বে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) হয়। ওই সময় মেট্রোরেল প্রকল্প গ্রহণ, মেট্রোস্টেশন নির্ধারণসহ সবকিছু নির্ধারণ করা হয়। মেট্রোরেল প্রকল্পের সব ধরনের কাজ আমার নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল। সে কারণে বাস্তবায়নে এত সময় লাগার কথা নয়। মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের ধীরগতি মেনে নেওয়া যায় না, এটাকে কচ্ছপগতিই বলা চলে।
তিনি বলেন, উদ্বোধনের পর এত সময় ধরে অর্ধেক সময় পরিচালনার কোনো মানে হয় না। অকারিগরি লোকের হাতে কারিগরি প্রকল্প থাকলে যা হয়, সেটাই হচ্ছে এখানে। সরকারকে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাক্সিক্ষত সুবিধা জনগণকে দেওয়ার ক্ষেত্রে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নইলে বিপুল অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেট্রোরেল তো শুধু ঢাকায় করা হয়েছে এমন নয়, সারা পৃথিবীতে মেট্রোরেল রয়েছে। কোথাও এত ধাপে একটি লাইন উদ্বোধন করা হয় না। এখানে রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি বলেন, মেট্রোরেলে ঢাকার যানজটের সব সমাধান মিলবে না। ২০৩০ সালের মধ্যে ৬টি মেট্রোরেল লাইন উদ্বোধন করার কথা। এ জন্য মেট্রোর ইতিবাচক দিকগুলো মানুষের মাঝে ফুটিয়ে তোলা দরকার। কিন্তু মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ কাজটিকে এত ধীরগতির করছে যে সমগ্র বিশে^ স্বীকৃত এই দ্রুতগতির যানটির প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা হতে চলেছে। এ দায় কর্তৃপক্ষের। এত সময় নিয়ে সময় বাড়াতে হবে কেন, এসবের কোনো মানে হয় না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্যান্য দেশের মেট্রোর সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার মেট্রোয় অনেক বেশি সময় লাগছে। আগে ছিল নির্মাণকাজের যন্ত্রণা, আর এখন ট্রায়াল যন্ত্রণা। নিজস্ব অনভিজ্ঞ জনবল দিয়ে মেট্রোরেল পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উচিত ছিল, কয়েকটি মেট্রো পরিচালনা করেছেন এমন অভিজ্ঞ জনবল দিয়ে মেট্রোরেল পরিচালনা করা; কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। তাতে যা ঘটার তা-ই ঘটছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সপ্তাহে সব দিন এবং ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচলে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। আর প্রকল্পের কার্যক্রম সর্বোচ্চ দ্রুতগতিতে পরিচালনা করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, গত ৪ নভেম্বর মেট্রোরেলের মতিঝিল অংশের উদ্বোধন করা হয়েছে। আমরা ঘোষণা করেছিলাম তিন মাসের মধ্যে উত্তরা-মতিঝিল পর্যন্ত অংশ একই সময় মেনে চলাচল করব। তবে সেই পর্যন্ত যেতে আমাদের আরও কিছুদিন সময় লাগবে। আমরা মনে করছি, আগামী মার্চের মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশ একই সময় মেনে চলাচল করবে।
উত্তরার বাসিন্দা ডা. ইদাদুল হক। থাকেন উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে। পেশাগত প্রয়োজনে প্রায় প্রতিদিন তাকে শাহবাগ ও পল্টন এলাকায় আসতে হয়। বাসায় ফিরতে রাত ১০টা থেকে ১১টা বাজে। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘মেট্রোরেল চালুর পর ভেবেছিলাম আমার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সিএনজি অটোরিকশার অতিরিক্ত ভাড়া ও যানজটের ধকল থেকে বাঁচতে পারব। কিন্তু মেট্রোরেল চালুর এক বছরেও পূর্ণ সময়ে চলাচল না করায় সেই দুর্ভোগ লাগব হচ্ছে না। সকালে মেট্রোতে আসতে পারলেও রাতে সিএনজিতে অতিরিক্ত ভাড়া গুনে বাসায় ফিরতে হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, ঢাকার যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (এসটিপি) সুপারিশ কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়। এরপর ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর একনেকে এমআরটি-৬ বা প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন করে। মেট্রোরেলের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে ২০১৩ সালের ৩ জুন ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি (ডিএমটিসিএল) গঠন করে সরকার। ঢাকা ও আশপাশের এলাকার পরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ২০০৫ সালের এসটিপি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। সংশোধিত এসটিপি ২০১৫-২০৩৫ মেয়াদের পরিকল্পনায় ৬টি মেট্রোরেল প্রকল্প যুক্ত করা হয়েছে। সবগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক দাঁড়াবে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। উড়ালে ৬৯ কিলোমিটার এবং পাতালে ৬১ কিলোমিটার। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
