হারানো মোবাইল উদ্ধারে তৎপর হচ্ছে পুলিশ

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪৫ এএম

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ও মাগুরা-১ আসন থেকে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি গত বছর ২৬ নভেম্বর গণভবনের আশপাশের এলাকা থেকে হারিয়ে যায়। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। তবে তার ফোনটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

শুধু সাকিব নন, তার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বা সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন হারানো বা ছিনতাইয়ের ঘটনার পর তাদের মোবাইলে থাকা বিভিন্ন নম্বর, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ছবি বেহাত হওয়ার এবং এর মাধ্যমে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। আর নারীরা সাইবার বুলিংসহ হয়রানির শিকার হতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তারে বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। তবে আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি) পরিবর্তন করা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কোনো অপরাধ হলে তাৎক্ষণিক সেই অপরাধীর পরিচয় জানা সম্ভব হয় না। ফলে হারানো বা ছিনিয়ে নেওয়া মোবাইল ফোন অপরাধীদের হাতে চলে গেলে তথ্য বেহাত এবং হয়রানিসহ আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সাকিব আল হাসানের মোবাইল ফোন উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মো. আহাদ আলী জানান, সাকিবের মোবাইল ফোনটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে তারা এ বিষয়ে কাজ করছেন।

গত ৫ ডিসেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. আতিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধারে তৎপরতা বাড়ানোর জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই সভায় মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপাররা অংশ নেন। অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ওই সভায় হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধারের পাশাপাশি চোরাই মোবাইল ফোন বিক্রির স্থানে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। তিনি মোবাইল ফোন ছিনতাই বা চুরি রোধে টহল জোরদারেরও নির্দেশ দেন।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হারানো বা চোরাই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনৈতিক কাজ বা অপরাধে জড়িত হওয়ার সুযোগ থাকে বা হতে পারে। দেখা গেছে, কোনো অপরাধের তদন্তে তদন্তকারী বা গোয়েন্দারা যখন মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে কাজ করেন তখন মোবাইলের মালিককে পায়। ওই সময় ওই ব্যক্তি বলে থাকেন যে, তার মোবাইলটি তো চুরি হয়েছিল। তখন জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া মানুষের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেহাত হতে পারে এবং এর মাধ্যমে হয়রানি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের সবার সতর্ক থাকতে হবে।’

২০২১ সালের ১ জুন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সাংবাদিকদের রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকায় তার হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা জানান। তিনি বলেন, ৩০ মে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় তার গাড়ির জানালা খোলা ছিল। এমন সময় এক ছিনতাইকারী মোবাইল ফোনটি টান দিয়ে নিয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরকম একজন ব্যক্তির ফোনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নম্বর থাকে। যেগুলো ব্যবহার করে অপরাধীরা অপরাধের সুযোগ নিতে পারে। ওই ঘটনার প্রায় ৫০ দিন পর ১৮ জুলাই পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারসহ মন্ত্রীর ফোনটি উদ্ধার করে। পুলিশ সে সময় জানিয়েছিল, ফোনটি ছিনতাইয়ের পর কয়েক দফা হাতবদল হয়ে হাতিরপুলের একটি দোকানে গিয়েছিল।

বিভিন্ন সময়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও গোয়েন্দা বিভাগ হারানো, চোরাই ও ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধারসহ অনেককে গ্রেপ্তার করেছে। ডিএমপির প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘চুরি বা ছিনতাই করা মোবাইল ফোনের আইএমইআই পরির্বতন করে অনেক সময় অপরাধ কাজে ব্যবহার করা হয়। আবার অনেক সময় দেশের বাইরেও পাচার হয়ে যায়।’

মানবাধিকারকর্মী এবং বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ফোনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা অনেক কাজের তথ্য থাকে। ওই ফোন চুরি বা ছিনতাই হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে তিনি আর্থিক বা সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এ ছাড়া চোরাই মোবাইল ফোন দিয়ে অপরাধ হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে চোরাই মোবাইল ফোন উদ্ধারে আরও তৎপর হতে হবে।’

আগে মোবাইল ফোন উদ্ধারে তৎপরতা তেমন দেখা না গেলেও এখন পুলিশ মোবাইল ফোন উদ্ধারে বেশ তৎপর। গত ১২ ডিসেম্বর চাঁদপুর জেলা পুলিশ ৩১টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে তার মালিকদের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর ১৫ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ১ নম্বর গেটের সামনে অভিযান চালিয়ে ২০টি চোরাই মোবাইল ফোনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার আগে ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পরীবাগ ও হাতিরপুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে চোরাই ৪৫টি আইফোন ও ১টি ভিভো ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন উদ্ধার করে পুলিশ। পরে এগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য ডিএমপির অনলাইন পোর্টালে আইএমইআই নম্বর মিলিয়ে যার যার ফোন সংগ্রহের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।

মোবাইল ফোন চুরি বা ছিনতাইয়ের আলাদা পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আগস্টে ১ হাজার ৯টি মোবাইল ফোন চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়। র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, তারা গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৯৭ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) ইনামুল হক সাগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হারানো মোবাইল ফোন বা চোরাই মোবাইল ফোন অপরাধীরা সহজ টুল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। আর সেই কারণে পুলিশ সারা বছরই হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধারে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে থাকে। এ ব্যাপারে প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া আছে যেন এ বিষয়টি সবাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখে।’

সবাইকে পুরনো মোবাইল ফোন কেনার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলেন, এসব ফোনের সঙ্গে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বা হত্যার মতো অপরাধের যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা থাকে। তাই কারও ফোন হারিয়ে বা চুরি, ছিনতাই হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট বা জেলা গোয়েন্দা শাখায় যোগাযোগ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত