গাজার প্রাণবন্ত রাইমাল আজ ধ্বংসস্তূপ

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০ এএম

গাজা শহরের একটি প্রাণচঞ্চল পাড়া ছিল রাইমাল। আজ সেটি ধ্বংসস্তূপ। নিজের পাড়ায় ফিরে এসে বেদনাদায়ক অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন এক ব্যক্তি। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস হামলার তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত ৭ অক্টোবর থেকে চলমান ধ্বংসযজ্ঞের ফলে উপত্যকাটি এখন ‘বসবাসের অযোগ্য’ হয়ে পড়েছে। সংঘাতের শুরু থেকে এ পর্যন্ত গাজায় প্রায় ২৩ হাজার জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৫৮ হাজার ১৬৬ জন। নিখোঁজ আরও ৭ হাজার। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।

হামলায় একের পর এক পাড়া-মহল্লা ধ্বংস হয়েছে। এক সময়ে মসজিদ, স্কুল, কলেজ, শপিংমল সব মিশে গেছে মাটির সঙ্গে। যে জায়গাটি ছিল কোলাহলপূর্ণ, সেটি এখন মৃত।

রাস্তায় বড় বড় গর্ত। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে গাজাবাসীর। সেখানকার তেমনই এক বাসিন্দা মোহাম্মদ আল-হাজ্জার। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। গাজায় অব্যাহত ইসরায়েলি হামলার বিরতিতে নিজ শহর দেখতে আসেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন মিডল ইস্ট আই ডটকমে।

তিনি যে এলাকায় থাকতেন তার নাম রাইমাল। এটি গাজা শহরের মধ্যবিত্তদের একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। যা এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপ। যার অর্থ হলো হাজার হাজার ফিলিস্তিনির অবস্থা এমন, তাদের ঘর বলে ডাকার মতো জায়গা নেই।

পাড়ার নাম রাইমাল

গাজার উপকূলে অবস্থিত রাইমাল গাজা শহরের একটি প্রাণবন্ত পাড়া ছিল। যেখানে আইসক্রিম পার্লার, ক্যাফে এবং ঝলমলে বুটিক কাপড়ের দোকান ছিল। আজ সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে। গাজার কোনো অংশ ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ থেকে এখন আর মোটেও নিরাপদ নয়। গত বছরের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা দক্ষিণ ইসরায়েলে আক্রমণ করলে ইসরায়েল গাজায় হামলা চালায়। এরপর থেকে রাইমাল ইসরায়েলি বিমান হামলা মোকাবিলা করছে।

মোহাম্মদ আল-হাজ্জার লেখেন, আমি আল-গালা স্ট্রিটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে থাকতাম। যা গাজা শহরের একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা ছিল। আজ যখন আমি আমার পুরনো পাড়ায় হাঁটতে বের হই, তখন দেখি কিছু আর আগের মতো নেই। ভবন, দোকানপাট এবং খেলার মাঠ সবকিছু মিশে গেছে। আমি যে জায়গাগুলোকে চিনতাম এবং ভালোবাসতাম, সেগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আমি বা আমার স্ত্রী যে পোশাকের দোকানে প্রায়ই সন্তানদের জন্য পোশাক কিনতে আসতাম, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। টুকরো টুকরো কংক্রিট এবং গলে যাওয়া ধাতুর নিচে কেবল কাপড়ের টুকরো দেখতে পাচ্ছিলাম।

ছিল কোলাহলমুখর

মোহাম্মদ আল-হাজ্জার লেখেন, ওমর আল-মুখতার স্ট্রিট ছিল কোলাহলমুখর। এখানে ব্যাংক ছিল, মুদ্রা বিনিময়ের দোকান ছিল। যা এখন একেবারে অচেনা লাগছিল। প্রথমে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এ এলাকার ব্যাংক ও মুদ্রা বিনিময়ের স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা হয়, তারপর লুটপাট করা হয়। তবে কার দ্বারা সেটা স্পষ্ট নয়। ইসরায়েল কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করে যে, ন্যাশনাল ইসলামিক ব্যাংক থেকে তাদের বিরুদ্ধে হামলার জন্য তহবিল স্থানান্তর করা হচ্ছিল। সেই ব্যাংক মাটিতে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।

আমি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি, কর্মচারী এবং গ্রাহকদের ভিড়ে এর প্রবেশদ্বার সবসময় জমজমাট ছিল। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে সিগারেট খাবে আবার কেউ তাদের প্রাপ্য বেতন পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াবে সেটাই ছিল নিত্য দৃশ্য। এখন এই ব্যাংক অন্য অনেক কিছুর মতো সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত।

যতদূর দৃষ্টি যায়, সেখানে ধ্বংসস্তূপ আর ময়লা জমা গর্ত ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়ছিল না। এমনকি কংক্রিটের কারণে রাস্তায় প্রবেশ করা কঠিন ছিল। ৪৮ দিন টানা হামলার পর যুদ্ধে সাময়িক বিরতি ফিলিস্তিনিদের জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। এ সুযোগে শত শত বাসিন্দা তাদের আগের জীবনের যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা দেখতে নিজের পাড়ায় ফিরে আসার চেষ্টা করেছে।

মৃত্যুর গন্ধ বাতাসে

মোহাম্মদ আল-হাজ্জার লেখেন, সাত সপ্তাহের যুদ্ধে মৃত্যুর গন্ধ বাতাসে মিশে আছে। এ গন্ধ এত তীব্র যে তা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয় আর পেটে পাক তোলে। এখানকার জীবন চিরতরে পাল্টে গেছে।

এখনো কিছু কিছু ফিলিস্তিনি আছে, যারা রাস্তায় হাঁটার মতো সাহসী। আর জায়গাটাকে মনে হবে ভূতের এলাকা।

গাজায় খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে সন্তুষ্ট হয়নি ইসরায়েল। তারা ফোন এবং ইন্টারনেট পরিষেবাও ধ্বংস করে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছে। মোহাম্মদ আল-হাজ্জার আরো লেখেন, বোমা হামলার প্রথম দিনেই, আমার বাড়ির কাছের একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির অফিসের বিপরীতে থাকা ওয়াতান টাওয়ারটি ধ্বংস করা হয়।

তিনি জানান, কাছাকাছি বেশ কয়েকটি মসজিদ ছিল, অন্তত ১৪টি। এখন শুধু একটি দাঁড়িয়ে আছে। বাকিগুলো বিমান হামলা বা গোলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি শহরের এসব মসজিদে নামাজ পড়তাম এবং কোরআনের তেলাওয়াত শুনতাম। এখন অবশিষ্ট মসজিদে মুষ্টিমেয় মুসল্লিরা তাদের নামাজ আদায় করতে পারে।

ইসরায়েলি বোমা হামলা শপিংমলগুলোকেও রেহাই দেয়নি। যে জায়গাগুলো এই অবরুদ্ধ এবং দরিদ্র শহরের প্রাণ ছিল। আল-মুখতার স্ট্রিটের ভিড়ের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা ক্যাপিটাল মল ছিল ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু। গোলায় ধ্বংস হওয়ার পরও এর কিছু অংশ দাঁড়িয়ে আছে, তবে ভেতরের দোকান লুট হয়েছে। কারা করেছে তা স্পষ্ট নয়।

তারপর আছে পান্ডা মল। মুদি এবং গৃহস্থালির জিনিসপত্রের জন্য আমার যাওয়া-আসা ছিল এখানে। এখানেও ইসরায়েলি বাহিনী গোলাবর্ষণ করেছে। এই জায়গাটিতে খাবার এবং প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য আমি নিয়মিত আসতাম।

আশপাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ছিল আতাল্লাহ সুপার মার্কেট, যার মালিক আতাল্লাহ পরিবার। বোমা বিস্ফোরণে আতাল্লাহর ব্যবসা এবং তার আশপাশে থাকা বেশিরভাগ পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।

হামলায় আতাল্লাহ পরিবারের অন্তত ৩৫ জন শিশু ও তরুণ সদস্য নিহত হয়। তাদের মধ্যে একজন প্রাণবন্ত রসবোধসম্পন্ন যুবক ছিলেন, যিনি দোকানে ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি সবসময় রসিকতা করতেন এবং গ্রাহকদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দিতেন।

স্কুলও রেহাই পায়নি

মোহাম্মদ আল-হাজ্জার লেখেন, আমার শহরের নিয়মিত দৃশ্যগুলোর একটি ছিল রুটি কেনার জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি। আমাদের সংস্কৃতির একটি প্রতীক এটি। আমিও আল-শারক বেকারি থেকে ঘরে তৈরি রুটি, পেস্ট্রি, পাই এবং কেক কিনতাম। বেকারি আরব বিশ্বজুড়ে জীবনের চিহ্ন। যেখানে রুটি মানে জীবন। যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে ক্ষুধা নিবারণে রুটি একটি চমৎকার উপায়।

আল-শারক বেকারির আর পেস্ট্রি বিক্রি করা হবে না। কাছাকাছি আল-ওয়াহদা স্ট্রিটে আল-শিফা হাসপাতালের দিকে যাওয়ার রাস্তায় বিশাল গর্ত দেখতে পাই। কাপড়ের দোকান, বিয়ের দোকান সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এমনকি সহিংসতা থেকে স্কুলগুলোও রেহাই পায়নি।

আমার সাত বছর বয়সী ছেলে মাজদ আল-নাসর স্ট্রিটে অবস্থিত নিউ গাজা প্রাইমারি স্কুল ফর বয়েজে পড়ে। আজ সেটি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দখল করে রেখেছে। তারা স্কুলটিকে বন্দিদের রাখার জন্য ব্যবহার করছে।

মোহাম্মদ আল-হাজ্জার জানান, আমি চারপাশে হেঁটে যাওয়ার সময়, আল-শিফার দৃশ্যগুলো মনে পড়ে গেল। যেগুলো আমার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক এবং অমানবিক।

যখন এটি ইসরায়েলি বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল, তখন এ এলাকার সাত হাজার মানুষ খাবার, পানি বা বিদ্যুৎ ছাড়া হাসপাতালের ভেতরে আটকা ছিল।

নতুন প্রসূতি ভবনে বোমা হামলার দৃশ্য দেখা বিশেষভাবে কঠিন ছিল। ভবনটি যখন টার্গেট করা হয়েছিল তখনো সংস্কারের কাজ চলছিল।

সবকিছু ধ্বংসের মুখে

৭ অক্টোবরের হামলার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলের পরিকল্পনা যদি এমন হয় যে, দায়ী হামাস এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী এবং দলকে নির্মূল করবে; তাহলেও তাদের প্রতিটি ভবন সমতল করার দরকার ছিল না। তাদের হাসপাতাল, স্কুল, মল, মসজিদ, গির্জা, পানির পাম্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সৌর প্যানেল এবং যোগাযোগ সুবিধাগুলো লক্ষ্য করার দরকার ছিল না।

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে আমি সাত বছর পড়াশোনা করেছি, সেখানেও বোমা হামলা হয়েছিল। এর আশপাশের রাস্তায় বোমা হামলা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে থাকা ভবনও ধ্বংস করা হয়।

মোহাম্মদ আল-হাজ্জার লেখেন, গাজার ভূমিরূপ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ১৭ বছরের দীর্ঘ অবরোধের কারণে বিচ্ছিন্ন এবং শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় থাকার পরও, ফিলিস্তিনি জনগণ অদম্য প্রতিকূলতা এবং ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এখন গাজা এবং আমার প্রিয় রাইমাল মৃত্যু, ধ্বংস এবং কষ্টের স্থান। এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি হতাশাজনক সময়। আমরা অজানার জন্য অপেক্ষা করছি। আমাদের যা আছে তা হলো স্মৃতি, অন্য সবকিছু ধ্বংসের মুখে।

সর্বশেষ

আলজাজিরা জানায়, ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ৭ অক্টোবর থেকে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ৪,২৯৬ শিক্ষার্থী নিহত এবং ৮,০৫৯ জন আহত হয়েছে।

এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, গাজা উপত্যকায় ৪,২৫৭ জন এবং পশ্চিম তীরে ৩৯ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। গাজায়, ২৮১টি সরকারি স্কুল এবং জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থার সঙ্গে যুক্ত ৬৫টি স্কুলে বোমা হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। যার ফলে ৮৩টি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাতটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্স-এ হামলার একটি গ্রাফিক ফুটেজ শেয়ার করে, একে ‘ভয়াবহ নথিভুক্ত নৃশংসতা’ বলে অভিহিত করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত