আলু উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০ এএম

উৎপাদনের ভরা মৌসুমেও ১০ টাকা কেজির আলু বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে। এতে অসুবিধায় পড়েছে অল্প আয়ের মানুষ। বেশি দিনের কথা নয়; গত বছর এ সময়ে নতুন আলু প্রতি কেজি  ১৫ থেকে ২০ টাকা আর পুরনো আলু ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। কম দাম, সহজ রন্ধন পদ্ধতি ও সুস্বাদের জন্য সবজি হিসেবে বাংলাদেশে বেশি আলু ব্যবহৃত হয়। আলু ভর্তা ও ডিম হলো গরিব মানুষের প্রিয় খাদ্য। গার্মেন্টস শ্রমিক, হোস্টেলের ছাত্রদের কাছেও আলু ভর্তা একটি আকর্ষণীয় খাবার। আলু থেকে চিপস, ফ্রেন্স ফ্রাই,  প্রভৃতি মুখরোচক খাবারও তৈরি করা হয়।

পুষ্টিগুণের বিচারে আলু ভাতের চেয়েও অধিক পুষ্টিকর।  পৃথিবীতে মানুষের প্রধান খাদ্য হিসেবে ভুট্টা, গম ও চালের পরই আলুর অবস্থান। বিশ্বের অনেক দেশেই প্রধান খাদ্য হিসেবে আলু খাওয়ার প্রচলন আছে। তবে আমাদের দেশে আলু এখনো সহায়ক খাবার। আলু নানা ধরনের ভিটামিন ও খনিজ লবণের চাহিদা মেটায়। অন্যদিকে খাদ্য আঁশ থাকায় আলু হজমে সহায়ক এবং রক্তে শর্করার হার ঠিক রাখে।  ভিটামিন-সি থাকায় আলু শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

বহু বছর ধরেই আলুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে কৃষিপণ্যটির মাথাপিছু ভোগ। ব্যবহার বেড়েছে খাদ্য ও ফিড শিল্পেও। তবে পণ্যটির চাহিদা যে গতিতে বেড়েছে, উৎপাদন বা সরবরাহ সে গতিতে বাড়েনি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকেই দেশে উদ্বৃত্ত আলুর পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আলুতে নিট উদ্বৃত্ত অচিরেই নিট ঘাটতিতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোয় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় আলুতেও বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিএআরসির গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছরই আলুর নিট চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও কমে আসছে নিট উদ্বৃত্তের পরিমাণ। ২০১৭ সালেও দেশে আলুর নিট চাহিদা ছিল ৬২ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২০ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ লাখ ১৭ হাজার টনে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে দেশে  আলুর উদ্বৃত্ত ছিল ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টন। ২০২০ সালের মধ্যে তা নেমে আসে ৩ লাখ ৪০ হাজার টনে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে বিএআরসি। ২০২০ সালে আলু, পেঁয়াজ ও চালের বাজার অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে গবেষণাটি করা হয়। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই সময়ের তুলনায় দেশে  আলুর চাহিদা এখন আরও অনেক বেশি। আবার  উদ্বৃত্তের পরিমাণও অনেকটাই কমে যাওয়ার  পথে। এ কারণেই ২০২৩ সালে আলু আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। সদ্যবিদায়ী বছরে দেশে সবচেয়ে বেশি মূল্য অস্থিতিশীল পণ্যগুলোর অন্যতম ছিল আলু। নানা পদক্ষেপেও বাজার নিয়ন্ত্রণে না আসায় একপর্যায়ে আলু আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। এরপরও বাজারে পণ্যটির দাম এখনো গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি।

বিএআরসির গবেষণাটির সমন্বয় করেছিলেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি বলেন, ‘দেশে আলু উৎপাদন হয় চাহিদার চেয়ে একটু বেশি। প্রতিনিয়ত খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়ছে আলুর চাহিদা। দেশে প্রচুর আলু উৎপাদনের যে তথ্য পাওয়া যায়, অনেকেই মনে করেন এটি সঠিক নয়। কারণ সরবরাহ প্রচুর হলে সিন্ডিকেশন করে দাম বাড়ানোর  সুযোগ থাকে না। সম্ভাব্য ঘাটতি এড়াতে হলে আলুর উৎপাদন বাড়াতে হবে বছরে অন্তত দুই লাখ টন করে। অনেক নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এগুলো  দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। কৃষক পর্যায়ে আলুর দাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারিভাবেও প্রচুর আলুর মজুদ রাখতে হবে।’

দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭৫-৮০ লাখ টন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, দেশে উৎপাদিত আলুর প্রায় ২৫ শতাংশ বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত অর্থবছরে দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার টন। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ কোটি ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩৫ টন এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯৮ লাখ ৮৭ হাজার ২৪২ টন আলু উৎপাদন হয়। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি বিবেচনায় নিলে প্রতি বছর দেশে প্রায় ২৬-২৭ লাখ টন আলু নষ্ট হয়ে যায়। সে হিসাবে দেশে আলুর চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবহারযোগ্য অংশ প্রায় কাছাকাছি। দেশে আলুর মাথাপিছু ভোগ প্রতি বছরই বাড়ছে। বিএআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে দেশে দৈনিক মাথাপিছু আলু খাওয়ার হার ছিল ৫৮ গ্রাম। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ দশমিক ৩০ গ্রামে। এরপর ২০২০ সালের মধ্যে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬ দশমিক ৩০ গ্রামে। তবে বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২-এর হিসাব অনুযায়ী, দেশে আলুর মাথাপিছু দৈনিক ভোগ ৬৯ দশমিক ৭০ গ্রাম। উৎপাদনের দিক থেকে চালের পরই আলুর অবস্থান। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর প্রোটিনের অন্যতম উৎস হলো আলু। এ ছাড়া বীজ, প্রাণিখাদ্য, রপ্তানি ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্পেও প্রচুর আলু ব্যবহার হয়। জনসাধারণের খাদ্য হিসেবে ২০১৬ সালে আলুর ব্যবহার হয়েছে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার টন, যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ লাখ ১৪ হাজার টনে। এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় প্রাণিখাদ্য হিসেবে।

বাজারে গত কয়েক মাসে আলুর দাম বাড়লেও এর কোনো সুফল পাননি কৃষক। বিএআরসির আরেক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালেও মৌসুমের শুরুতে অর্থাৎ মার্চে কৃষকরা প্রতি কেজি আলু বিক্রি করেন ১০-১২ টাকায়। জুলাইয়ে বাজার অস্থির হওয়া শুরু করে ক্রমাগত দাম বাড়ার পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর আলুর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩৫-৩৬ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপরও দাম বাড়তে থাকায় অক্টোবরের শেষ নাগাদ আলু আমদানির  অনুমতি দেয় সরকার।

বাজার মনিটরিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, প্রতি বছর আলুর দাম নিয়ে কারসাজি হয় মূলত হিমাগার পর্যায়ে। এতে ফড়িয়া, হিমাগার মালিক ও আড়তদারদের বড় ভূমিকা থাকে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করে হিমাগার মালিকরা দায়ী করছেন আলুর উৎপাদন নিয়ে ভুল তথ্য প্রকাশকে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা এ প্রসঙ্গে বলেন, এ বছর আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে, এমন ভুল তথ্যের কারণেই হয়তো পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। প্রথম থেকেই সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বলা হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। তখনই তাদের সংগঠন থেকে জানানো হয় যে, আলুর উৎপাদন এ বছর কম হয়েছে। তাই পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে বলে তাদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে। তাদের প্রস্তাব ছিল যৌথ জরিপ করার। কারণ কিছু হলে তাদেরই দোষারোপ করা হয়। এ ছাড়া সরকারিভাবে আলু মজুদ রাখার প্রস্তাবও দিয়েছিল তারা।  আলুর উৎপাদন কেমন হচ্ছে তা হিমাগার পর্যায়ে কতটা জমা হচ্ছে, তা দেখেই বোঝা যায়। এবার আলুর আবাদ বেশি জমিতে হয়েছে। এখন আবহাওয়া বা বীজের মানের কারণে উৎপাদন কেমন হয় তা মৌসুম শেষে বলা যাবে। গত বছর আলু রপ্তানির জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। যদিও শেষ পর্যন্ত রপ্তানি কমানোর পাশাপাশি আমদানি করতে হয়েছে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরেও প্রায় ৭৯ হাজার টন আলু রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ৩২ হাজার ৩৯২ টনে দাঁড়ায়।

সামনের দিনগুলোয় আলুর বাজার দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বছর সবজি বা অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বেশি থাকায় মৌসুমের শুরুতেই আলুর ওপর চাপ বেশি ছিল। সে কারণে শুরুর দিকে আলুর ভোগ বেশি হয়েছে। এ বছর আরেকটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো, আলুর দাম বেশি থাকায় কৃষকরা অনেকেই ছোট ছোট আলু তুলে ফেলছেন। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ৯০ দিনের আলু কৃষকরা ৬০-৬৫ দিনে উত্তোলন করে ফেলছেন। একদিকে আলুর ভোগ বাড়ছে আবার উৎপাদন কমে গেলে সামনে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে আলুর উচ্চফলনশীল কিছু জাত এসেছে। কিন্তু এগুলোর সম্প্রসারণ এখনো সেভাবে হয়নি। এটা সম্প্রসারণ করতে হবে।’

আলুর উৎপাদন বাড়াতে হলে ১. কৃষক পর্যায়ে আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। ২. গুণগতমানের বিশুদ্ধ বীজ ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ৩. আলু প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপন ও রপ্তানি বাড়িয়ে আলু উৎপাদনে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে হবে। ৪. গবেষণাগারে উদ্ভাবিত নতুন জাতের উচ্চফলনশীল আলু চাষ দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। ৫. আখের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে আলু চাষ বাড়াতে  হবে। ৬. আমন ধান কাটার পর সহজে কৃষক যাতে আলু রোপণ করতে পারেন এমনকি একই জমিতে কৃষক বছরে দুবার আলু উৎপাদন করতে পারেন সে ধরনের স্বল্পমেয়াদি আমন ধান ও আলুর জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং ৭. আধুনিক পদ্ধতিতে আলু চাষের ওপর কৃষক ও মাঠকর্মী প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে।

লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত