দেশে হঠাৎ করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীসহ সাধারণ মানুষকে করোনা টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ২ বছর আড়াই কোটি মানুষকে এই টিকা দেওয়া হবে। এর মধ্যে এ-বছর পাবে এক কোটি ২৫ লাখ মানুষ ও বাকি এক কোটি পঁচিশ লাখ মানুষ পাবে আগামী বছর। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন এই তথ্য জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ-সময় আরও নানা বিষয়ে কথা বলেন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে খতনা করাতে গিয়ে মারা যাওয়া শিশু আয়ানের বাবা-মা মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। মন্ত্রী তাদের কথা শুনে, ওই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আশ্বাস দেন।
গতকাল করোনার টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কভিড কিন্তু একেবারে যায়নি। শুধু আমাদের দেশে না, অনেক দেশেই আছে। সুতরাং যারা বয়স্ক বা যাদের অন্যান্য রোগ আছে (উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা ইত্যাদি), তারা দয়া করে জনসমাগম এড়িয়ে চলবেন ও মাস্ক পরবেন।
করোনা টিকার ব্যাপারে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে এপ্রিল মাসে। ষাটোর্ধ্ব, শিশু ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সম্মুখ যোদ্ধারা এই টিকা পাবেন। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন-গ্যাভির কাছে টিকার চাহিদা দেওয়া হয়েছে। তারা টিকা সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে। সচিব বলেন, আড়াই কোটি মানুষ এই টিকা পাবে। বর্তমানে কিছু টিকা মজুদ আছে। এছাড়া গ্যাভি জানিয়েছে, তারা এ-বছর এক কোটি টিকা দেবে। বাকি টিকা আগামী বছর দেবে।
সভায় এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে এখনো করোনাভাইরাসের কিছু টিকা আছে। ফাইজারের এই টিকা করোনার নতুন ধরন ‘জেএন১’ এর বিরুদ্ধেও কার্যকর। কাজেই ফ্রন্টলাইনার যারা, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি যাদের প্রতিনিয়ত জনসমাগমে যেতে হয়, তারা চাইলেই করোনাভাইরাসের টিকার চতুর্থ ডোজ নিতে পারেন। এই টিকার মেয়াদ আগামী বছর পর্যন্ত আছে।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানের শুরুতেই ফোরামের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন ফোরাম সভাপতি রাশেদ রাব্বি ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল। এ-সময় ফোরাম সদস্যরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানান এবং স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
আমি সেই সামন্তদাই থাকব : ৫ শয্যার ইউনিট থেকে ৫০০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউট গড়ার পেছনে অনেক ধৈর্য ধরেছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেছেন, আমি ঢাকা মেডিকেলের মতো জায়গা থেকে উঠে এসেছি। সেখানে রোগীর চাপ, শয্যা নেই, বার্ন ও সাধারণ রোগী একসঙ্গে রাখা হতো। দুর্গন্ধ-নোংরার মধ্যে কাজ করেছি। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, চিকিৎসা না পাওয়ার কষ্ট, সব চোখের সামনে দেখেছি। সুতরাং আমি কখনোই সেই অতীত ভুলব না। আমি যে রকম ছিলাম, তেমনই থাকব।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পেছনে স্বাস্থ্য খাতের সাংবাদিকদের অবদান অনেক বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আপনারা সহযোগিতা করেছেন বলেই আজ এত বড় একটি ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে পেরেছি। আমি আপনাদের সেই সামন্তদাই থাকব। কোনো পরিবর্তন হবে না।
লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ করতে হবে : মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছেন, লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক বন্ধ করে দিতে হবে। মালিকরা নিজেরা যদি বন্ধ না করে, তাহলে মন্ত্রণালয় কঠিন পদক্ষেপ নেবে।
এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমি নিজেও লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালের ভুক্তভোগী। সুতরাং আমি কখনোই এ বিষয়ে ছাড় দেব না। আপনারা জানেন, এরই মধ্যে আমি বলেছি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমার অবস্থান কঠোর থাকবে। তেমনি অনুমোদনবিহীন হাসপাতালের ব্যাপারেও ছাড় দেওয়া হবে না।
আয়ানের মৃতুতে দোষীরা শাস্তি পাবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, খতনা করাতে গিয়ে শিশু আয়ানের মৃত্যু দুঃখজনক। এ-রকম কার্যক্রম সমর্থনযোগ্য না। আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যতটুকু জানি, আগামীকাল (আজ) তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেবে। চিকিৎসায় যদি কোনো অবহেলা থাকে তাহলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এর আগে এই অনুষ্ঠানেই আয়ান হত্যার সুষ্ঠু বিচারসহ চার দফা দাবি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ ও তার পরিবার। এ-সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আয়ানের বাবা আয়ানের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা দেন। আয়ানের পরিবার শিশু আয়ান হত্যায় অভিযুক্ত ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. সাইয়্যেদ সাব্বির ও ডা. তাসনুভা মাহজাবীনকে গ্রেপ্তার, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে আয়ানের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী মাহবুবা আঁখি ও তার নবজাতকসহ ভুল চিকিৎসা ও অবহেলাজনিত সব মৃত্যুর তদন্ত ও দোষীদের বিচার এবং অবৈধভাবে পরিচালিত হওয়ায় ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিচালককে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
