চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি তা সমর্থন করছে না। এজন্য সরকারের লক্ষ্যমাত্রা থেকেও ১ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে শিগগিরই রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
বর্তমান যে নীতি সুদহার, বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি, রেপো রেট ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এমনিতেই চাপের মুখে। এ ছাড়া নীতি সুদহার বাড়িয়ে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে নতুন মুদ্রানীতিতে।
গতকাল বুধবার চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।
এমন এক সময়ে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলো যখন মূল্যস্ফীতি ও বিদেশি মুদ্রা সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে আছে। এর সঙ্গে নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লোহিত সাগরের সংকট।
প্রথমার্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের মধ্যে রাখা। কিন্তু ডিসেম্বর শেষে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪১ শতাংশে ঠেকেছে। মূল্যস্ফীতি না কমলেও গভর্নর বলছেন, মূল্যস্ফীতি তেমন একটা বাড়েনি।
গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, আগের চেয়ে মূল্যস্ফীতি না বাড়লেও গত নভেম্বর থেকে ক্রমাগত কমছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অগ্রাধিকারে রেখে এবারও মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এবারের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমন, বিনিময় হার চাপ নিয়ন্ত্রণ, সরকারের কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অর্থের সরবরাহ নিশ্চিত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে ঋণ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ থেকে রেহাই মিলছে না ছাড়া নতুন মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করেছে। উল্লেখ্য, এ সুদের হারকে ‘রেপো রেট’ বলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদের হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিয়ে থাকে তাকে পলিসি রেট বা রেপো রেট বলা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবারের মুদ্রানীতিতে বিশেষ রেপো সুদহারে (স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি-এসএলএফ) নীতি সুদহার করিডরের ঊর্ধ্বসীমা ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। বর্তমানে এটি ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ৪ শতাংশের ব্যাংক রেটে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
গভর্নর আব্দুর রউফ বলেন, আসছে জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ লক্ষ্যে নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন সিদ্ধান্তমতে, নীতি সুদহার ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশ করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অন্যান্য ব্যাংক যে টাকা ধার করবে, তার সুদহার বাড়বে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক আরও সংকোচনমূলক মুদ্রা সরবরাহের দিকে হাঁটছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক বছরে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আইএমএফের ঋণের শর্তানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহারের করিডর প্রথা চালু, সুদহারের সীমা প্রত্যাহার, ডলারের একক দাম, রিজার্ভের প্রকৃত হিসাবায়নসহ নানা উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি রোধে মুদ্রা সরবরাহনির্ভর নীতি থেকে সরে এসে সুদহার লক্ষ্য করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন শুরুর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল জিডিপি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা। কিন্তু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
আইএমএফ চলতি অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পর এ পরিবর্তন আনা হলো। বিশ্বব্যাংকও চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ করেছে।
অর্থবছরের প্রথমার্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, কিন্তু গত বছর মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ইতিবাচক থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার ও অন্যান্য অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ঘোষিত মুদ্রানীতিতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ। একই সময়ের জন্য সরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ; সরকারি খাতে ছিল ১৮ শতাংশ।
নতুন মুদ্রানীতিতে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। তবে এ পদ্ধতিতে ডলারের বিনিময় হার কত হবে, তা বলা হয়নি। পরে তা জানানো হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়।
মুদ্রানীতির খসড়া পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন আকারে উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাবিবুর রহমান। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, মূল্যস্ফীতি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নামিয়ে আনা, উচ্চহারের খেলাপিতে লাগাম টানা এবং ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার তিন চ্যালেঞ্জ অগ্রাধিকার পাচ্ছে নতুন মুদ্রানীতিতে।
