ব্যয় বেড়েছে পণ্য পরিবহনে

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪৪ এএম

দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ৬৩ শতাংশ পণ্যের গন্তব্য ইউরোপ ও আমেরিকায়। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার পশ্চিমের লোহিত সাগরে সংঘাতের কারণ পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বেড়ে গেছে। কারণ লোহিত সাগর এড়িয়ে সাড়ে ৩ হাজার কিলোমিটার পথ ঘুরে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে জাহাজগুলোকে ইউরোপে পৌঁছতে হচ্ছে।

সমুদ্রপথে চলাচলকারী বিভিন্ন শিপিং কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে পণ্যবাহী জাহাজ ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরের তীরে ইউরোপের বন্দরগুলোতে পৌঁছত। ভূমধ্যসাগর থেকে আবার জিব্রাল্টার প্রণালি হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্ব তীরের ইউরোপের বন্দরগুলোতে পণ্য পৌঁছে দিত জাহাজ। কিন্তু এখন গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজে ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের হামলার ঘটনায় পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। এতে করে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কিলোমিটার। পণ্য ইউরোপের দেশগুলোতে পৌঁছতে অতিরিক্ত ১২ থেকে ১৪ দিন সময় লাগছে।

উল্লেখ্য, হুতিদের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি জোট হয়েছে। এ জোট পাল্টা হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এতে করে লোহিত সাগর এলাকা সংঘাতময় হয়ে উঠেছে।

বিদেশি ক্রেতাদের হাতে পণ্য তুলে দেয় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, অতিরিক্ত পাড়ি দিতে হচ্ছে বলে শিপিং কোম্পানিগুলো সারচার্জের নামে ৪০ ফুট একক কনটেইনারের জন্য সর্বনিম্ন ১২০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০০ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত ফি নিচ্ছে। এখন এই ফির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্যরকম এক প্রতিযোগিতা।

কোন ধরনের প্রতিযোগিতা, জানতে চাইলে খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘পণ্য সরবরাহের চেইন ভেঙে পড়েছে। একটি শিপিং লাইনের জাহাজে অন্য শিপিং লাইনের পণ্য নেওয়া যেত। এখন দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় কিছু কিছু শিপিং লাইন কিছু রুটে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দিয়েছে। জাহাজ কমে গেলেও রপ্তানিমুখী কনটেইনার তো কমেনি। ফলে কনটেইনার পাঠানোর জন্য জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত ভাড়ায় কনটেইনার পাঠাতে হচ্ছে।’

কিন্তু ভাড়া বাড়লে সমস্যা কোথায়? ইউরোপ আমেরিকায় রপ্তানি পণ্যের জাহাজ ভাড়া দিয়ে থাকে ক্রেতারা। দেশের প্রধানতম রপ্তানি খাত হলো পোশাক। এ বিষয়ে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাহাজ ভাড়ার টাকা ক্রেতা দেবে, এটা ঠিক। কিন্তু যদি ভাড়া বেশি পড়ে তখন ক্রেতা আমার দেশ থেকে পণ্য না নিয়ে নিকটবর্তী অন্য দেশে অর্ডার দিতে পারে। এ ছাড়া আমার দেশ থেকে পণ্য নিলে এখন অতিরিক্ত ১২ থেকে ১৪ দিন সময় লাগছে। ক্রেতা এ সময় কেন বিনিয়োগ করবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আমাদের শঙ্কার জায়গা হলো পণ্য পাঠানোর জন্য আমাদের ৩০ থেকে ৩২ দিন অতিরিক্ত (লিডটাইম) দিয়ে থাকে। এখন ক্রেতারা চাইছে দ্রুত পণ্য নিয়ে দ্রুত পণ্য বিক্রি করতে।’

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে প্রায় ৮ শতাংশ পণ্য আমদানি হয়। তাই আমদানি পণ্যে সমস্যা না হলেও রপ্তানি পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। লোহিত সাগরের দৈর্ঘ্য ১৯০০ কিলোমিটার ও সুয়েজ খালের দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিলোমিটার। ভারত মহাসাগরের আরব সাগর থেকে ২ হাজার ৯৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই ভূমধ্যসাগরে ইউরোপের বন্দরগুলোতে পৌঁছে যেত জাহাজগুলো। এখন পুরো ভারতবর্ষ ঘুরতে হচ্ছে, আফ্রিকা মহাদেশ ও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আসতে হচ্ছে জাহাজগুলোকে। আন্তর্জাতিক নৌপথের মধ্যে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল সবচেয়ে ব্যস্ত নৌপথ। এ নৌপথে বিশে^র প্রায় ৬২ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচ (এমএসসি, মায়ের্সক, সিএমএ-সিজিএম, কসকো ও হ্যাপাগ লয়েড) শিপিং কোম্পানির ব্যবসা রয়েছে। এ পাঁচটি কোম্পানি বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের প্রায় অর্ধেক কনটেইনারে পরিবহন করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত