এখন পলিটিক্যাল নয়, ‘ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি’র যুগ, সে কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্যের চাহিদাটা খুঁজে বের করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর আমাদের প্রত্যেকটি কূটনৈতিক মিশনে আমরা এ মেসেজটাই দিয়েছি। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার আমরা কী রকম ঘটাব তার ওপরই আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলো কাজ করছে এবং করবে।’
প্রধানমন্ত্রী বৈদেশিক আয় বাড়াতে তৈরি পোশাকের মতো পাট ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য এবং হস্তশিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যে একই গুরুত্ব দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন।
গতকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর উপকণ্ঠে পূর্বাচল নিউ টাউনে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা-২০২৪-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে মাসব্যাপী ২৮তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (ডিআইটিএফ) শুরু হয়েছে গতকাল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন এবং নতুন বাজার খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ‘নতুন নতুন বাজার আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, একটা বা দুটোর ওপর আমাদের নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। কারণ অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়েই আমাদের আসতে হয়। সেটা মাথায় রাখতে হবে।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের নিট এবং ওভেন গার্মেন্টস বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমাদের সুযোগ আরও বাড়াতে হবে। আমরা যে পণ্যটাকে সুযোগ দিচ্ছি তারাই খুব সাফল্য অর্জন করছে। তাহলে আমাদের অন্যান্য পণ্য কেন বাদ যাবে। তাদেরও আমাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে যাতে ভালো ব্যবসা করতে পারে।’
এ সময় পাটের ‘জেনোম সিকোয়েন্সিং’ এবং বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদার উল্লেখ করে তিনি চামড়া সংরক্ষণ ও বহুমুখীকরণ করে চামড়া রপ্তানির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের যেকোনো সরকারের চেয়ে তার সরকার বিশ্বে রপ্তানি অনেকাংশে বাড়াতে পেরেছে, পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও চাহিদা উভয়ই বাড়ছে। ফলে দেশীয় বাজার উন্মুক্ত হচ্ছে এবং দেশের ভেতরেও বড় বাজার সৃষ্টি হয়েছে।
এ সময় তার নির্বাচনী এলাকা টুঙ্গিপাড়ার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের বর্ণনা দিয়ে বলেন, সেখানে এখন গ্রামগঞ্জের বাজারের দোকানেও টিভি, ফ্রিজসহ নানা হোম অ্যাপ্লায়েন্স পাওয়া যাচ্ছে। শপিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। যেখানে আগে কিছুই ছিল না, টিনের ঘরগুলো এখন দালানকোঠা হয়ে উঠছে। এমনকি উন্নত মানের ফাস্টফুডের দোকানও গড়ে উঠেছে। যাদের ঘরে কিছু ছিল না, তাদের ঘরে ফ্রিজ আছে, টেলিভিশন আছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর একটা পণ্যকে বর্ষপণ্য হিসেবে সুনির্দিষ্ট করে দিই। পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, এভাবে প্রতিবছরই বর্ষপণ্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এবার আমি ঠিক করেছি ‘হস্তশিল্প পণ্যকে’ ২০২৪ সালের বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণার।
কেন হস্তশিল্প পণ্যকে বর্ষপণ্য করা হলো তার ব্যাখ্যায় শেখ হাসিনা বলেন, “এবারের যে বর্ষপণ্য অর্থাৎ ‘হস্তশিল্প পণ্য’ সেটা আমাদের নারীদের কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং এর মাধ্যমে নারীরা স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে পারবে।”
অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম।
স্বাগত বক্তব্য দেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান এএইচএম আহসান।
অনুষ্ঠানে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় ও বিনিয়োগ আকর্ষণে গত ১৫ বছরে গৃহীত সরকারি পদক্ষেপের ওপর একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসলে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নেওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজন, সেটা নিতে পারলে যেকোনো অভিঘাত থেকে মুক্ত হওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘যেকোনো দুর্যোগ আসুক সেটা মোকাবিলা করতে জানি এবং করতে পারব। সেই বিশ্বাসটা অন্তত আমার আছে এবং আমি মনে করি আমাদের দেশবাসীরও আছে।’
কভিড-১৯ সংক্রমণ মোকাবিলার সময় তার সরকারের উদ্যোগে বিনামূল্যে টিকা দেওয়া, ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেওয়া, দরিদ্রদের আর্থিক সাহায্য দেওয়াসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সহায়তার কথা উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।
৭ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আজকে সবার সামনে (পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে) উপস্থিত হতে পারায় দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমাদের গ্র্যাজুয়েশন হয়েছে উন্নয়নশীল দেশে, ২০২৬ সাল থেকে তা কার্যকর হবে। কাজেই এ সময়টা আমাদের সরকারে আসাটাও মনে হয় খুব প্রয়োজন ছিল। কারণ এই ’২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে যেসব সুযোগ আমরা পাব সে সুযোগকে আমাদের যেমন যথাযথভাবে ও সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে, তেমনি যে চ্যালেঞ্জ আসবে সেগুলোও আমাদের মোকাবিলা করতে হবে।’
