হরিণ শিকারে গিয়ে বাঘ নিহত

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:১৫ পিএম

কট্কায় খট্কা। হরিণ মরে পড়ে আছে, বাঘের পায়ের ছাপ! কেমন যেন ফেলুদা, লালমোহন গাঙ্গুলি আর তোপসের গল্প মনে হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাঘটা গেল কোথায়? সে কি হরিণের আক্রমণে নিহত হয়েছে? কারণ পায়ের ছাপ দেখা গেলেও বাঘটাকে আশপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন বাঘটা গেল কোথায়? তবে একটা বাঘের লাশকে সাগরে ভাসতে দেখা গেছে। সাগরটা আবার দক্ষিণে।  

হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা মার্কেন্টাইল জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত। হরিণ শিকারে গিয়ে বাঘ মহাশয় তাহলে অক্কা পেতেই পারেন। বাস্তব বা পরাবাস্তব ঘটনাবলি এ দুনিয়াতেই ঘটে এবং মাঝেমাঝেই ঘটে। হয়তো তা সুন্দরবনের কট্কায় নয়, তবে সাগরপাড়েই এবং তা ইয়েমেনের সাগরপাড়ে ঘটে এডেন উপসাগরীয় এলাকায়। গত ১৫ জানুয়ারি এডেন উপকূলের দক্ষিণে এ ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার দায় স্বীকারও করেছে হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। অতএব কট্কায় খট্কা নামে লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু একটা রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাস লিখতেই পারেন।

এ হামলায় যদিও কোনো হতাহতের ঘটনা বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জিব্রাল্টার ঈগল নামের জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। তবে আরোহীদের কেউ আহত হননি যে সে খবরেই বা বিশ্বাস কী! পরে জানা যাবে। হতাহত হলেও, বড় ক্ষতি হলেও ইজ্জতের সওয়াল যেখানে আছে সেখানে সে কথা ঢেকে রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্মানজনক।

The General Staff (Russian) and Defense Ministry are keeping public silence on the Anglo-American operations in the Red Sea as they were monitored in preparation; tracked on launch; and their results recorded on the ground. Instead, the Russian military bloggers led by Boris Rozhin of Colonel Cassad, the Militarist, and Rybar run by Mikhail Zvinchuk were reporting the aircraft and missile raids from 0130 Moscow time, several hours before the Associated Press, Reuters, and other western news agencies began their coverage. The milbloggers then followed the operations through the pre-dawn hours while the Anglo-American media remained silent. ...Within 90 minutes, Militarist reported according to an “official representative of the Houthis : ‘An American F-22 fighter jet was shot down over Sanaa.’” (Min 03:27). These aircraft are based at the US Air Force base at Al-Dhafra in the UAE.

[Kremlin Tries to Sit on the Fence in the Middle of the Red Sea; JOHN HELMER, JANUARY 15, 2024; https://www.unz.com]

উদ্ধৃত ইংরেজি ভাষ্যের সার কথা হলো, ১২ জানুয়ারি ইঙ্গ-মার্কিন যে হামলা হুতিদের বিভিন্ন স্থাপনায় করা হলো তা মূলত আকাশপথে করা হয়েছে, সমুদ্র থেকে নয়। মার্কিন বিমানগুলো সৌদি আরবের এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ঘাঁটিগুলো থেকে উড়েছে। আর ব্রিটিশ বিমানগুলো তাদের সাইপ্রাসের ঘাঁটি থেকে উড়েছে। যে মার্কিন বিমানটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে সেটি উড়ে গিয়ে ইয়েমেনের পশ্চিমে লোহিত সাগরে পড়েছে। পড়ার কারণেই মার্কিন নৌবাহিনীর (যেহেতু হামলায় ব্যবহৃত বিমানগুলো ইউএস নেভির) দুই পাইলট হুতি কমান্ডোদের হাতে ধরা পড়ে। ওই দুই পাইলটকে নেভাল কমান্ডো বা নেভি সিলস উল্লেখ করা হয়েছে যদিও। নেভির সঙ্গে তো তাদের সম্পর্ক অস্বীকার করা যায় না। পরে আরেক গল্পে বলা হয়েছে, ওই দুজন সোমালিয়ার উপকূলে হুতিদের জন্য সমরাস্ত্রের চালান নিয়ে যাওয়া একটি ইরানি জাহাজ আটক করেছিল ১১ জানুয়ারিতে।

সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিরীক্ষণে নিয়োজিত ব্রিটিশ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স বলেছে, ইয়েমেনে হুতিদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের হামলার জবাবে মার্কিন-মালিকানাধীন এ জাহাজে হামলা হয়েছে। এর একদিন আগে লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজে জাহাজ-বিধ্বংসী ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল হুতিরা। যাই হোক, ইঙ্গ-মার্কিন হামলা যে ব্যর্থ তা উল্লিখিত নিবন্ধেই রুশ বিশেষজ্ঞের বয়ানে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, হামলার লক্ষ্যবস্তুর একটিও সঠিক ছিল না। এগুলো অনেক আগে থেকেই অকার্যকর লক্ষ্যবস্তু।

কাজেই হামলার বিষয়টি একটি অষ্টরম্ভা বটে। মাঝখান দিয়ে একটি এফ ২২ র‌্যাপ্টরের বিনাশ ঘটল লোহিত সাগরের জলে। সঙ্গে দুজন পাইলটও উধাও। ইনভিনসিবিলিটি মিথের মহাপ্রয়াণ ঘটল। কিন্তু বিষয়টি যেহেতু ইজ্জতকা সওয়াল সে কারণে পাশ্চাত্যের কোনো মূলধারা গণমাধ্যমে (মেইনস্ট্রিম মিডিয়া) তা প্রকাশিত হলো না। আর রুশ তথ্যে আপনার বিশ্বাস না-ই থাকতে পারে। যদিও রুশ বৈদ্যুতিন এবং বৈদ্যুতিক যুদ্ধসরঞ্জামাদি বিশ্বে প্রথম, তাদের বৈদ্যুতিন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের চেয়ে অগ্রসর। এসবের যাচাই ক্ষেত্র হচ্ছে ইউক্রেনের রণাঙ্গন।

ইউক্রেনের হতদ্দশায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তথা ন্যাটোর লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছে। সেখানে তাদের নিষ্ক্রান্তির একটা পথের দরকার ছিল। ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলায় বাহ্যত সে পথ তৈরি হলোও। ন্যাটোকে ইউক্রেনের রণাঙ্গনে একলা ফেলে নিষ্ক্রমণের পথে হাঁটতে শুরু করল শ্যাম চাচা। এবার তার সঙ্গী ইসরায়েল। হামাসের হামলায় তার অদম্য, অপরাজেয় (ইনভিনসিবল) ভাবমূর্তি ভেঙে খান খান হয়ে গেল। ভেঙেচুরে যাওয়া ভাবমূর্তি নিয়ে দুজনেই একে অপরের সখা অথবা সখী হলো। এটা জন্মজন্মান্তরের সখ্যতা ফ্রম দ্য ডেজ অব ওল্ড টেস্টামেন্ট। ওল্ড টেস্টামেন্টের রূপকতার একটা মজা আছে ইসরায়েলের সঙ্গীকে বা অপকর্মের জুড়িকে সবসময় লাস্যময়ী শ্যামাঙ্গী কাকি হতে হবে এমন নয়। তার গৌরাঙ্গী কাকি বা দিদি হলেও সমস্যা নেই, ইসরায়েলকে কুইন আশেরা হলেই চলবে; মোট কথা ইসরায়েলকে ইসরায়েল হিসেবে থাকতে হবে। পাশের জনকে যদু-মধু-শ্যাম বা স্যাম যে কেউ হলেই হবে। যুক্তরাষ্ট্র এখন আঙ্কল স্যাম তথা শ্যাম চাচার ভূমিকায় আছে। ইউক্রেন থেকে নিষ্ক্রমণের পথকে সে উত্তরণের পথ করতে চাইছে এবং তার ধারণা ডি-লায়লার হাত ধরে সে স্যামসন হয়ে উঠেছে। উঠুক, চাচায় যতদূর খুশি উঠুক। আর লোহিত সাগরের ঠিক মাঝখানে গড়ে তোলা বেড়ার ওপর বসে আছে বিবলিক্যাল মিথিক্যাল পুউউউউউতিন। বসে বসে সে পা নাচাচ্ছে, দেখে তারে মনে হয় খুবই কনফিডেন্ট, প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী এইমাত্র শ্যাম চাচার একটা এফ ২২ পাখি পড়ল এবং মরল। খবরটা ইজ্জতের সওয়াল বলে পাঁচ কান করা যাচ্ছে না। তবে পাখিটির দুই সহিস নিখোঁজ।

No western media report of the first-ever Houthi success against a US warplane has subsequently appeared until the US Central Command (CENTCOM) issued a press statement, almost a day late, that two U.S. Navy Sailors [are] missing off the coast of Somalia…

ভ্লাদিমির পুতিন, পশ্চিমের মাথাব্যথা পুউউউতিন, পশ্চিম এশিয়ার এ গোলযোগে নাক না গলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার সব সামরিক আয়োজনও ইউক্রেনের বাইরে নিয়োজিত না করার নির্দেশ দিয়েছেন; তার কূটনৈতিক বহরকে বলেছেন, বসে থাকো আর পারলে সুমনের গান গাও ‘বসে আঁকো’, আর দেখ শ্যাম চাচা ‘সাপলুডু খেলছে বিধাতার সঙ্গে’, সঙ্গে তার অ্যান্টনিনা ফিরিঙ্গিনা।

পুতিন হয়তো একটা চালাকি করছেন মাত্রিওশকা পুতুলের  ভেতর কট্কা থেকে হারিয়ে যাওয়া অথবা উধাও হয়ে যাওয়া বাঘটিকে ভ্যানিশ করে রেখেছেন। বর্তমান ম্যাটাস্টেসাইজড (ছড়িয়ে পড়া, বিস্তৃত) রণাঙ্গনে তার কৌশল বিস্তারণের কাজ দেখে এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। ভূমধ্যসাগরে তার একটা নেভাল স্কোয়াড্রন (এস্কুয়ার্দা) আছে। সিরিয়াযুদ্ধের সময় থেকেই আছে। এটা মূলত কৃষ্ণসাগর নৌবহরের অংশ, তবে কাজ করে আন্তঃনৌবহর শক্তি হিসেবে। উত্তর সাগর, বাল্টিক সাগর, প্রশান্ত মহাসাগীয় নৌবহরের ডিঙ্গিগুলোও এই এস্কুয়ার্দায় যুক্ত হতে পারে। তবে ইউক্রেনযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এর নড়াচড়া কেউ দেখেনি। তবে জলের তলায় তার নড়নচড়ন থাকলেও থাকতে পারে। কিলো ক্লাসের ডুবো নৌকার নড়াচড়া সহজে বোঝা যাওয়ার কথা নয়। হয়তো তা ভূমধ্যসাগরে নাক ভাসিয়ে আবার ডুব দিয়ে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ উপকূলের কাছে গিয়ে ভাসল; আবার ডুবে ভারতের কাছে কোথাও ভারত মহাসাগরেই ভাসল। হতে পারে কত কিছুই! 

সার কথা হলো, যুদ্ধটা পশ্চিম এশিয়ার আরও পশ্চিমে নিয়ে গিয়ে, আফ্রিকার উপকূলে নিয়ে গিয়ে খুব একটা ভালো কাজ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েল যে তার প্রাণসখা এ কথা কেন ঢাকঢোল পিটিয়ে চাউর করতে হবে? অথবা ব্রিটিশের বেলফুর নাটিকার অংশ তাকে কেন হতে হবে? মার্কিন সমরবিশারদরাই সতর্কবাণী উচ্চারণ করছিলেন হুতিদের সঙ্গে গ্যাঞ্জাম বাঁধিয়ো না। সৌদি আরবের দোসর হয়ে এর আগে কী অবস্থা হয়েছে সেটা মনে রাখা দরকার ছিল। এত এত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েও ইয়েমেনকে শিক্ষা দেওয়া যায়নি। ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়েছে। এবার কি পারা যাবে! পুতিনের রাশিয়া পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে কোনো পক্ষে সরব না হলেও তার চোখ কিন্তু খোলা আছে, তার সাবমেরিনগুলো দম ফেলার জন্য মাঝে মাঝে নাক ভাসাতেও পারে। আর তার আছে, ইস্কান্দার, কিনজাল এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যালিবার ক্ষেপণাস্ত্র; আভাঁগার্দ হাইপারসনিক গ্লাইডারের কথা আপাতত বাদ থাক।

হামাস এবং ফিলিস্তিন অনেক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে, যার বেশিরভাগ নারী ও শিশু, হত্যা করেছে ইসরায়েল। তিন মাস পেরিয়ে গেছে, এখনো তারা হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি। পারছে না যে, পারবে না যে সে কথাও মার্কিন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এবং বলছেন। শুধু বলছে না মার্কিন নিওকন গান্ডুরা। আর তাদের শলা-পরামর্শেই চলে শ্যাম চাচার রণতরী, বাণিজ্যতরী। আর সাইকেলগাড়ি। ইসরায়েলের বিজয়ের সন্ধানে আঙ্কল স্যাম কিনা হুতি-মারীতে নামলেন! নামলেন বটে, উঠে দাঁড়াতে পারবেন তো! নাকি হরিণ শিকারে গিয়ে বাঘ মামাই উধাও হয়ে যাবেন। তাই কট্কায় দারুণ খট্কা।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত