প্রতিশ্রুতি-প্রাপ্তি-পরিশোধ সবই বেড়েছে

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:১৪ এএম

বিদেশি মুদ্রার সংকটে দুই বছর ধরেই তীব্র চাপের মুখে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। উচ্চ আমদানি ও ঋণ পরিশোধ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নেমেছে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও ঋণের প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তি কমে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি ঋণে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণের প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অর্থছাড়ও। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঋণ পরিশোধ ব্যয় বাড়ায় শঙ্কাও রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাসিক হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে প্রায় চার গুণ। একই সময়ে অর্থছাড় বেড়েছে ২৮ কোটি ডলার। নতুন প্রকল্পগুলোতে বেশি বেশি বিদেশি ঋণ দিয়ে পাশে রয়েছে এডিবি, জাইকা ও বিশ্বব্যাংক। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের আগে বেশি প্রকল্প অনুমোদন হওয়ায় বেশি প্রতিশ্রুতি এসেছে বলে মনে করছেন ইআরডির কর্মকর্তারা। গত ডিসেম্বরে বিদেশি ঋণের প্রকল্পগুলো বেশি গতি পেয়েছে।

ইআরডির প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বৈদেশিক ঋণ ছাড় হয়েছে ৪০৬ কোটি ৩৮ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরে একই সময়ে ছিল ৩৭৮ কোটি ৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণছাড় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ৬৯৮ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল মাত্র ১৭৬ কোটি ডলার। বেড়েছে ৫২২ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরে চার গুণ বেশি বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে। যদিও গত অর্থবছর শেষে প্রতিশ্রুতি এসেছিল ৮৭৯ কোটি ডলার ঋণের।

ইআরডির তথ্যে দেখা যায়, আলোচিত সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি ৬ মাসে ২৪৬ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। সংস্থাটি ২০২ কোটি ৬ লাখ ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর বিশ্বব্যাংক দিয়েছে ১৪১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের প্রতিশ্রুতি। এর বাইরে কয়েকটি দেশ থেকে ১০৯ কোটি ৯ লাখ ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে।

শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, গত ছয় মাসে বেশি ঋণও ছাড় করেছে এডিবি। সংস্থাটি ১১১ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে। এ সময়ে বিশ্বব্যাংক ৮৯ কোটি ডলার ও জাইকা ৮১ কোটি ডলার ছাড় করেছে। রাশিয়া ছাড় করেছে ৫৪ কোটি ডলার। পাশের দেশ ভারত ১৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, চীন ৩৬ কোটি ১৭ লাখ ডলার ছাড়াও অন্য উন্নয়ন সহযোগীরা ১৫ কোটি ৩২ লাখ ডলার ছাড় করেছে।

সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ

ইআরডির তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরের তুলনায় এবার ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে ১০৫ কোটি ডলার ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ। তবে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সুদ-আসল পরিশোধ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৬ কোটি ডলার। বেড়েছে ৫১ কোটি ডলার। তবে ঋণের আসলের চেয়ে সুদ পরিশোধ ব্যয় ১৩৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ঋণের সুদ বাবদ ২৭ কোটি ডলার পরিশোধ করে বাংলাদেশ। আর চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৬৪ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।

ইআরডির প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ৩৫৮ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করতে হবে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৭৪ কোটি ডলার।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এখন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প না নিয়ে যেসব প্রকল্পে রিটার্ন আসবে, সেগুলো হাতে নেওয়া উচিত। আগে বিশ্বব্যাংক-এডিবি থেকে আমরা ফিক্সড রেটে ঋণ পেতাম। এখন সেটা কমছে। যার কারণে আমাদের বাজারভিত্তিক সুদহারে ঋণ নিতে হচ্ছে। এই ঋণের কারণে শুধু সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে না; একই সঙ্গে আসল পরিশোধেও চাপ বাড়বে। কারণ বাজারভিত্তিক সুদহারের ঋণ পরিশোধের সময় কম থাকে। এ অবস্থায় বাজারভিত্তিক সুদহারে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্ক হতে হবে। তবে এই সংকটের সময়ে বৈদেশিক ঋণছাড় বেশি হওয়া সরকারের জন্য ইতিবাচক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত