অনিশ্চয়তায় ফু-ওয়াং ফুডের ব্যবসা সম্প্রসারণ

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:৫৭ পিএম

রুগ্ণ ও বন্ধ কোম্পানিগুলোকে পুনরায় ব্যবসায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ফু-ওয়াং ফুড লিমিটেড অধিগ্রহণের অনুমতি পায় মিনোরি বাংলাদেশ। কিন্তু দুই বছরেও ফু-ওয়াং ফুডের ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে কোম্পানিটির ব্যবসা সম্প্রসারণে মিনোরি বাংলাদেশ চেষ্টা চালালেও ডলার সংকটের কারণে তা আটকে গেছে। ফলে লোকসানের বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছে না কোম্পানিটি।

ফু-ওয়াং ফুড অধিগ্রহণের শর্ত হিসেবে মিনোরিকে অন্তত ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে মিনোরি এর চেয়ে বেশি বিনিয়োগের উদ্যোগ নিলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করতে পারছে না। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ বন্ধ রয়েছে। পুরনো যন্ত্রপাতিতে কোনোরকম অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছে কোম্পানিটি। ডলারের কারণে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানির উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। তবে এর সঙ্গে সমন্বয় করে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়াতে না পারায় লোকসান থেকে বেরোতে পারছে না কোম্পানিটি।

এদিকে লোকসানি কোম্পানিটি ঘিরে এক জুয়াড়ি চক্র গত কয়েক মাস ধরেই কারসাজি চালাচ্ছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, দীর্ঘদিন কোম্পানির শেয়ার দর ২৩ টাকা ৫০ পয়সায় আটকে ছিল। কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের কোনো তথ্য না থাকার পরও গত বছর ৩ জুলাই থেকে শেয়ারটি নিয়ে কারসাজি শুরু হয়। বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে মাত্র ৯ কার্যদিবসে শেয়ারটির দর ৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই শেয়ারটির দর কমে ২৫ টাকা ৯০ পয়সায় নেমে আসে। আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে ফের কারসাজি শুরু হলে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফের ৪২ টাকা ৯০ পয়সায় উন্নীত করা হয়। এভাবেই দর ওঠানামার মাধ্যমে কারসাজিকারকরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুটে নিচ্ছে। চলতি বছর ৩ জানুয়ারি শেয়ারটির দর ২৫ টাকায় নেমে এলে আবারও কারসাজির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে দর বাড়ানো হচ্ছে।

জানা গেছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ব্যাংকে এক বছর ঘুরেও ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছে না ফু-ওয়াং ফুডস। আগামী কয়েক মাসে এলসি খোলা যাবে এমন আশ্বাসও দিতে পারছে না নির্ধারিত ব্যাংক। এমন পরিস্থিতিতে ফু-ওয়াং ফুডের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নেওয়া ঋণের সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছে মিনোরি বাংলাদেশ। এ ছাড়া ডলারের এমন উচ্চমূল্যের সময়ে কোম্পানিটিও অতিরিক্ত ব্যয়ে যন্ত্রপাতি আমদানিতে অনীহা দেখাচ্ছে বলে জানা গেছে। 
গত ২৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডকে দেওয়া এক চিঠিতে মিনোরি জানিয়েছে, দেশ জুড়ে চলমান ডলার সংকটের কারণে ব্যাংক এলসি স্থাপনে অপারগতা প্রকাশ করছে। যে কারণে কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে উল্লেখযোগ্যভাবে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে ডলারের মূল্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানির আর্থিক স্বাস্থ্যেও তা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অপ্রত্যাশিত এমন পরিস্থিতির কারণে আমাদের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে গেছে।

বর্তমানের চ্যালেঞ্জিং সময় বিবেচনায় অনুমোদনপ্রাপ্ত ঋণ ব্যবহারের সময়সীমা ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে মিনোরি। জাপানি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে, আগামী কয়েক মাসে বিদেশি মুদ্রা বিনিময় হারে অস্থিরতা কমে আসবে।
২০২২ সালে অধিগ্রহণের প্রথম বছরেই নতুন মালিকানায় ব্যাপক লোকসান দেয় ফু-ওয়াং ফুড। এ বছরে কোম্পানিটির নিট লোকসান দাঁড়ায় ২৫ কোটি টাকারও বেশি। পরের বছর ২০২২-২৩ হিসাববছরে ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নিট লোকসান হয় কোম্পানিটির। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও ২ কোটি টাকার বেশি লোকসানে পড়েছে, যার ধারাবাহিকতা পরের প্রান্তিকেও রয়েছে বলে কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে। শুধু লোকসান নয়, আগের মালিকদের সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকির সমস্যা রয়েছে। তবে সরবরাহকারীদের পুরনো বকেয়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে এনেছে বর্তমান কর্তৃপক্ষ।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) অনুমোদন সাপেক্ষে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মিনোরি বাংলাদেশের কাছে ফু-ওয়াং ফুডসের তৎকালীন তিন পরিচালক তাদের ৮৪ লাখ ৪২ হাজার ৭৬২টি শেয়ার ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে বিক্রি করেন। মিনোরি বাংলাদেশ ফু-ওয়াং ফুডসের শেয়ার অধিগ্রহণে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এর বাইরে কোম্পানিতে আরও অন্তত ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগের শর্ত দেয় এসইসি, যা শেয়ার মানি ডিপোজিট অথবা ‘পরিচালক ঋণ’ হিসেবে দেখানোর কথা রয়েছে। পরবর্তীকালে শেয়ার মানি ডিপোজিট মিনোরির নামে শেয়ারে রূপান্তর করা হবে, যা দিয়ে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের শর্ত পূরণ করা হবে। 

শেয়ার হস্তান্তরে এসইসি যেসব শর্ত দিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শেয়ার মানি ডিপোজিটের অর্থ কোম্পানিটির নামে একটি পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখতে হবে এবং শুধু ব্যাংকের দায়বদ্ধতা নিয়মিতকরণ, জমি অধিগ্রহণ, কার্যকরী মূলধন ও উৎপাদন সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এ অর্থ ব্যবহার করা যাবে। আর ফু-ওয়াং ফুডসের পরিচালনা পর্ষদের দ্বারা ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের শর্ত পূরণে শেয়ার মানি ডিপোজিটের শেয়ারের অর্থের বিপরীতে মূলধন বাড়ানোর জন্য কমিশনের সম্মতি নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত