বইমেলার বই অ-বই

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:০৮ এএম

‘মেলার বই’ বলে কিছু বইকে আলাদা করাই যায়। এ কেবল আমাদের দেশেই সম্ভব। এই অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছে গত চার দশক ধরে। এক মেলার বই পরের বছরের মেলায় খুঁজে পাওয়া যায় না। এক মেলার বই আরেক মেলায় পুরনো, বাতিল হয়ে যায়। আমরা নতুন বইয়ের খোঁজ করি। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে প্রকাশিত কটা বই পড়া হয়? পঠিত বইও কি পুরনো হয়ে যায়? বই কি খাদ্য? একবার গ্রাস করা খাবার যেমন দ্বিতীয়বার খাওয়া যায় না, বইও কি তাই? তবু আমি বইমেলার বইকে ‘অবই’ বলতে চাই না। মেলায় প্রকাশিত কিছু বইয়ে তাড়াহুড়োর ছাপ থাকে, অসম্পাদিত থেকে যায়, কোনো কোনো প্রকাশ-অযোগ্য বইও মেলায় চলে আসে। কিন্তু ঢালাওভাবে মেলায় প্রকাশিত সব বইকে বাতিল বাক্সে ফেলে দেওয়া যায় না। বইমেলা না থাকলে অনেক লেখকেরই বই প্রকাশিত হতো না। বইমেলাও মিলনমেলা, উৎসব। উৎসবে শামিল হতে কে না চায়? বই উৎসবে তাই বহু লেখক কবির মন চঞ্চল হয়ে ওঠে, উত্তেজিত হয়ে ওঠে, কারও কারও মনে প্রকাশের বাসনাও তীব্র হয়ে ওঠে। আবার মেলা শেষে সে-সব লেখক-কবি উৎসাহ উত্তেজনা হারিয়ে ফেলেন। নতুন লেখা কলমে আসতে আবারও দশ মাস অপেক্ষা করতে হয়।

সারা বছর লেখার মধ্যে থাকার মতো পেশাদার টেকসই লেখকের অভাব আছে বলেই মেলায় দুতিন হাজার লেখক মিলে যায়। তাদের প্রকাশিত বইয়ের উষ্ণতায় বইমেলায় ধুলো ওড়ে। বইমেলায় সুপ্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত লেখকদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। তারা খুব একটা আনন্দোজ্জ্বল নন, কেউ কেউ ব্যক্তিত্বের ভার লঘু করতে পারেন না বলে সর্বসাধারণের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন না। অপেক্ষাকৃত নতুন লেখক, উৎসবপ্রিয় লেখকদের আড্ডায় চলাফেরায় এবং তাদের উচ্চাকাক্সক্ষার সুউচ্চ ঘোষণায় মেলাপ্রাঙ্গণ প্রাণদীপ্ত হয়ে ওঠে। তাই মেলার বই আর মেলার লেখককে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। মেলা থেকে প্রকাশিত কিছু বই আলাদা করে চোখে পড়ে, পাঠকের দৃষ্টি কাড়ে। মেলার বহুমুখী প্রচারে কোনো কোনো বই আলাদা গুরুত্বও পায়। গণমাধ্যমে কমবেশি নতুন বইয়ের খবর আসে। যে লেখককে সারা বছর খুঁজেও পাওয়া যায় না, তাকেও পাওয়া যায় প্রচারে প্রসারে। পাঠকও কোনো কোনো খবরে প্রভাবিত হন, তারা নতুন লেখককে বরণ করে নিতে দ্বিধায় পড়েন না।

দুই. মাসব্যাপী বইমেলা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও হয় কি না আমি জানি না। বড়জোর সাতদিনের বইমেলা হয় ফ্রান্সে। প্যারিসের বইমেলায় টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। বইমেলায় প্রবেশ অবাধ নয়। প্যারিস ছাড়াও ফ্রান্সের কোনায় কোনায়, প্রায় প্রতিটি ছোট-বড় শহর এবং গ্রামেও বইমেলা হয়। একেকটি জেলার লেখকদের বই নিয়েও এ দেশে মেলা হয়। মেলায় কফিপানের সুযোগ থাকে। সভা-সেমিনারও হয়। স্কুলের শিশুদের শিক্ষকরা মেলায় নিয়ে আসেন। নতুন প্রজন্মের শিশুরা মেলা এবং লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হয়। আমাদের দেশেও আয়োজনের ত্রুটি একটু-আধটু থাকলেও উদ্দেশ্য কিন্তু অভিন্ন। বাঙালির মতো ফরাসিরাও বইয়ের প্রচার প্রসার এবং নতুন পাঠক বাড়াতে চান। কিন্তু পদ্ধতিগত অমিল বা ফারাক খুব চোখে পড়ে। আমাদের বইমেলায় সবাই বই কিনতে যান না, কেউ কেউ কেবল ঘুরতেই যান। তাছাড়া যাওয়ার মতো ঘুরে ঘুরে দেখার মতো, আনন্দভ্রমণের মতো আমাদের তেমন একটা গন্তব্যও তো নেই। বইমেলায় তাই পথ হেঁটে ধুলো ওড়ানোর মানুষ খুব পাওয়া যায়। মেলা থেকে বই না কিনে খালি হাতে ফেরেন অসংখ্য মানুষ। মানুষের ভিড়ে পাঠক খুঁজে পাওয়া যায় না।

লেখক-প্রকাশকরা বই প্রকাশ করেন। কিন্তু পাঠক বাড়ানোর জন্য, বই পাঠকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ কিছুই করেন না। মেলায় আসা মানুষও তাই সঠিক নির্দেশনার অভাবে, ক্রয়যোগ্য ভালো বইয়ের খোঁজ না পাওয়ার কারণে আমাদের পাঠক বাড়ে না।

তিন. লেখকের দায় কি শুধু লেখার? শুধু লিখে সমাজ বদলায় না, পাঠক তৈরি হয় না। লেখক সামাজিক দায় এড়াতে পারেন না। লেখককে সভা-সেমিনারে এবং পাড়ার ছোট ছোট অনুষ্ঠানে গিয়েও কথা বলা উচিত। লেখকও মূলত একজন সাহিত্যকর্মী। সাহিত্যকর্মীর কাজ কেবল সৃষ্টি নয়, সৃষ্টিকে বৃষ্টির মতো বর্ষণ করাও তার কাজ। লেখক কবিরা যখন ফেসবুকে তাদের নিজের লেখা তুলে ধরেন, নিজের বইয়ের কথা বলেন তখন কেউ কেউ নাক উঁচু করেন। তারা ভাবেন, লেখক কেন ফালতু কাজ করছেন। লেখককেও কেন প্রচারের আলোয় আসতে হবে? লেখক ঘরে থাকবেন মাশরুমের মতো, তাকে কেন সহজ সস্তা হতে হবে?

রবীন্দ্রনাথের সময়ে বইমেলা ছিল না। কিন্তু পাঠকের কাছে পৌঁছানোর আকুতি তারও ছিল। প্রকাশনার মান নিয়ে তিনি খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন। পুরনো ছাপার অক্ষর বা টাইপ তার কাছে ভালো না লাগলে নতুন তৈরি সীসার টাইপে তার বই কম্পোজ করা হতো। প্রচ্ছদ এবং বইয়ের ভেতরের ছবিও তিনি দেখে দিতেন। এখন অনেক লেখককে প্রেসে যেতে দেখা যায় না। লেখক ঘরে বসে সবকিছু দেখতে চান, নিয়ন্ত্রণ করতে চান। কিন্তু পঞ্চাশ ষাট বছর আগেও প্রেসের সঙ্গে লেখকের একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এখনকার বেশিরভাগ লেখক বইয়ের প্রচ্ছদ দেখেন, ছাপার কাগজ দেখেন কিন্তু বাদবাকি প্রিন্টিং বিউটি নিয়ে তারা ভাবতে চান না। প্রকাশনার সঙ্গে লেখক জড়িত থাকবেন এবং লেখার মানের পাশাপাশি বইয়ের প্রকাশনা-মানও তিনি জানবেন-বুঝবেন তার রুচি ও জ্ঞান দিয়ে এটাই স্বাভাবিক।

চার. ফরাসি লেখক ভিক্তর উগোর মতে বই বিশ্বাসের অঙ্গ, বই মানবসমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য জ্ঞান দান করে। অতএব বই হলো সভ্যতার রক্ষাকবচ। সময় নিয়ে লিখে সম্পাদনা করে বারবার নিজের লেখা পাঠ করে প্রকাশনায় আসা বইগুলো হয়তো ত্রুটিমুক্ত বই হতে পারে, গভীর ভালোবাসার সঙ্গে যে বই প্রকাশিত হয় সে বই হয়তো বিশ্বাসের অঙ্গ হয়ে ওঠে কিন্তু লেখক যদি নিজেকে প্রস্তুত করার সময় না পান, নিজেকে যদি আর সব কাজে ক্ষয় করে, নিজেকে বিক্ষিপ্ত করে তারপরে লিখতে আসেন তাহলে সুচিন্তিত লেখা আসবে কীভাবে? লেখককে নিশ্চয়ই একটু ধ্যানী হতে হয়, ভাবকে ভাবনার স্তরে নিয়ে যেতে হয় কিন্তু বইমেলার তাগাদা থাকলে লেখক ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তার চঞ্চলতা-উত্তেজনা লেখাকে প্রভাবিত করে। ফলে সুলেখা হয়ে ওঠে না হয়তো, বাক্য অসংলগ্ন থেকে যায়, ক্রিয়ার কাল ঠিক থাকে না, কোনো সদিচ্ছা ঘন হয় না, লেখার মধ্যে কাঁচা কাঁচা গন্ধ থেকে যায়। লেখকের জীবন তো ত্যাগের জীবন, জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখের বিচলন ত্যাগ না করে কি মহৎ লেখক হওয়া যায়? লেখকেরও আলস্য থাকে, সেই আলস্য যাপনেও লেখক পরের লেখার জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। কিন্তু আমরা তো আলস্য যাপন করি কেবলই ঘুমিয়ে বা আধশোয়া হয়ে।

লেখার ধার বাড়ে যদি আড্ডায় থাকা যায়। সমমনা মানুষের সঙ্গে আড্ডা হলে লেখক তার চিন্তা পাল্টাতে পারেন। কেবলই নিজের মধ্যে হাপুর হুপুর ডুব পাড়লে কূপম-ূক হওয়া যায়, উদার লেখক হওয়া যায় না। গঠনমূলক সমালোচনায় লেখক নিজেকে শুধরে নিতে পারেন, বদলে নিতে পারেন। কিন্তু আমরা অনেকেই সমালোচনা সহ্য করতে পারি না, তাছাড়া গঠনমূলক সমালোচনার পরিবর্তে কেবল আক্রমণাত্মক নিন্দা লেখককে ক্রোধী করে তুলতে পারে। প্রজ্ঞাদীপ্ত বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা না থাকলে সমালোচনা লেখকও হয়ে যান নেতিমনস্ক নিন্দুক। 

পাঁচ. তবে বইমেলার সুফলও কম নয়। বইমেলার জন্য আমরা অপেক্ষা করি। উৎসবমুখরিত পরিবেশে বিক্রি হওয়া বইয়ের পরিমাণ কম নয়। প্রেরণার জন্য মেলার প্রয়োজন। সাপ্লাই ছাড়া আমাদের দেশে সারা বছর যত বই বিক্রি হয় একমেলায় তার চেয়ে বেশি বই পাঠকের হাতে পৌঁছে যায়। বইমেলা লেখক পাঠকের প্রাণের মেলা, এই কল্পিত সত্য পরম সত্য হয়ে উঠুক।

লেখক: কবি, আবৃত্তিকার আলেস, ফ্রান্স

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত