রোজার খেজুরে শুল্কের অজুহাত

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৪৪ এএম

রমজানের ইফতারে খেঁজুর ছাড়া রোজা প্রায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এখন সেই খেজুর নিয়ে চক্রান্তে নেমেছেন ব্যবসায়ীরা। আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় আসন্ন রোজায় দেশে খেজুরের সংকট সৃষ্টির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত বছর রোজার আগ মুহূর্তে (অক্টোবর ’২২ থেকে জানুয়ারি ’২৩) ২৪ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন খেজুর আমদানি করা হলেও একই সময়ে এবার আমদানি করা হয়েছে ১০ হাজার ৭৯ টন। এতে রমজানে খেজুরের সংকট দেখা দিতে পারে বলে ব্যবসায়ীদের শঙ্কা।

এই শঙ্কার কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলম গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাস্টমসের শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকরা এবার আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। আগে পাঁচ কেজির প্রতি প্যাকেটে যেখানে শুল্ক ছিল ৮০ সেন্ট এখন সেখানে শুল্ক দিতে হচ্ছে চার মার্কিন ডলার। চারগুণের বেশি বেড়ে গেছে শুল্ক।’

চট্টগ্রামের শুকনো ফলের পাইকারি আড়ত বিআরটিসি ফলম-িতে গিয়ে দেখা যায়, খেজুরের দোকানগুলোতে আগের মতো খেজুর নেই। দোকানদারদের মজুদও নেই তেমন। এ বিষয়ে বিআরটিসি ফলম-ির আর এন জেনারেল ট্রেডিংয়ের মালিক রহমত আলী বলেন, ‘আগে প্রতিদিন আমার বিক্রি ছিল ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার খেজুর। এখন বিক্রি কমে নেমে এসেছে এক থেকে দুই লাখ টাকায়। এখন দোকানগুলোতে যে মজুদ আছে তা আগামী ৭/৮ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে।’

 খেজুর সংকটের কারণ সম্পর্কে রহমত আলী বলেন, ‘আমদানিকারকরা মাল আমদানি করছেন না। তারা বলছেন এখন কাস্টমসের শুল্ক বেশি পড়ছে। আগে যেখানে এক কনটেইনার (২৫ মেট্রিক টন) খেজুর আনতে শুল্ক দিতে হতো ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এখন এ গ্রেডে ৬৪ লাখ, বি গ্রেডে ৪৪ লাখ ও সি গ্রেডে ৩৪ লাখ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। গত বছরও খেজুরের ক্ষেত্রে কোনো গ্রেডিং ছিল না।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এতদিন ব্যবসায়ীরা কম দামি বা বেশি দামি সব খেজুরের ক্ষেত্রে একই হারে শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু গত বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে কাস্টমস থেকে খেজুরের গ্রেড অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সবচেয়ে ভালো মানের খেজুর এ গ্রেডের এবং পর্যায়ক্রমে বি ও সি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়।

ফলম-ির মেসার্স তুহিন এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, ‘বাজারে তো খেজুর প্রায় নেই বললেই চলে। এখন আমদানিকারকরা আমদানি না করলে আমরা পাইকারি ব্যবসায়ীরা খেজুর পাব না এবং খুচরা বাজারেও যাবে না। তবে সব কিছুর মূলে হলো কাস্টমসের শুল্ক।’

কিন্তু আমদানিকারকদের কাছে কাস্টমস জিম্মি হবে না বলে জানান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের উপ-কমিশনার ও মুখপাত্র ব্যারিস্টার বদিউজ্জামান মুন্সী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরের শুল্কও দিত এক ডলার আবার ২০০ টাকা খেজুরের শুল্কও দিত এক ডলার। কিন্তু বাজারে তো ঠিকই বেশি দামে খেজুর বিক্রি করে ভোক্তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাহলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে কেন?’

তিনি আরও বলেন, আমরা দেশে আমদানিকৃত খেজুরের মানভেদে তিনটি গ্রেডে ভাগ করেছি। সেই গ্রেড অনুযায়ী এ গ্রেড (প্রিমিয়াম মান) খেজুরের জন্য পাঁচ কেজির প্রতি প্যাকেটের জন্য ৪ ডলার, বি গ্রেডের (মধ্যম মান) জন্য ২ ডলার ও সি গ্রেডের (সাধারণ মান) জন্য ১ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করেছি।

এখন আমদানিকারকরা খেজুর আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় আপনারা (কাস্টমস) কি শুল্ক কমিয়ে দেবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার বদিউজ্জামান মুন্সী বলেন, মোটেও না। আমদানিকারকদের কাছে আমরা জিম্মি হয়ে তাদের অনৈতিক সুবিধা দেব না। প্রয়োজনে নতুন আমদানিকারক সৃষ্টি হবে। সরকারের বিধি অনুযায়ী শুল্ক দিতে হবে।

এদিকে এবার গত বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম খেজুর আমদানি হলেও এবার কিন্তু রাজস্ব বেশি পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রমজানকে সামনে রেখে গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১০ হাজার ৮০ মেট্রিক টন খেজুর আমদানি হয়েছে। আমদানি করা খেজুরের বাজার মূল্য ২২৭ কোটি টাকা হিসাবে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১০৩ কোটি টাকা। কিন্তু গত বছরের এ সময়ে খেজুর আমদানি হয়েছিল ২৪ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন। শুল্কহার তেমন না থাকায় রাজস্ব পেয়েছিল মাত্র ১৪ লাখ টাকা।

উল্লেখ্য, দেশে প্রতি বছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এরমধ্যে শুধু রমজান মাসেই চাহিদা রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন। সাধারণত ইরাক, সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া ও জর্ডান থেকে মেজদুল (প্রিমিয়াম), মাশরুক (প্রিমিয়াম), মেজদুল (সাধারণ), মরিয়ম, আজোয়া, সুগাই, মাব্রুম, জাহেদি (সাধারণ), নাগাল, দাবাম, লুলু, আম্বার, কালসি, ডাল, ফরিদাসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির খেজুর দেশে এসে থাকে। তবে সাধারণ মানের ইরাকের জাহেদি খেজুর গ্রামেগঞ্জে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়ে থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত