উৎফুল্ল থাকলেই চোখের সমস্যা থেকে সেরে উঠবেন সাকিব আল হাসান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পাঠানো সাকিবের চিকিৎসা বিষয়ক বক্তব্য দেখে এমনটাই মত বাংলাদেশের চক্ষু বিশেষজ্ঞদের। ভারতে ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার সময় চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন সাকিব। চোখ দেখাতে ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ঘুরে ফিরেছেন দেশে।
তার চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো জানিয়ে বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগ থেকে যে বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে, সেটা বিশ্লেষণ করে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. এম এম এইচ মনিরের অভিমত, কোন চিকিৎসার প্রয়োজন এই মুহূর্তে নেই সাকিব আল হাসানের। বরং মানসিকভাবে প্রফুল্ল থাকলেই ক্রমশ কেটে যাবে সাকিবের চোখের সমস্যা।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গ্লুকোমা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং চক্ষু সার্জন ডাঃ মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, 'যে বিবৃতিটি পাঠানো হয়েছে এবং ডাক্তারের রিপোর্টের ব্যাপারে যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে সেসব দেখলাম, কনজারভেটিভ ট্রিটমেন্ট এর কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ এখানে কোন কিছু সরাসরি প্রয়োগ না করা। যেমন ইনজেকশন লাগবে না, লেজার লাগবে না, শুধু ট্যাবলেট দিবে বা রোগীকে বলবে বা নিশ্চিত করতে হবে যে চিন্তামুক্ত থাকতে। যেসব কারণে চোখের এই সমস্যাটা সৃষ্টি হয় সেসব থেকে দূরে থাকতে। এখন কারণগুলো হতে পারে স্টেরয়েড যদি নিয়ে থাকে, অনেক সময় ব্যথা নাশক ওষুধে অনুমোদিত ও স্বল্পমাত্রার স্টেরয়েড থাকে। অ্যাজমা রোগীর শ্বাসকষ্টে ইনহেলার নিলে তাতে স্টেরয়েড থাকে। সাকিব হাতে একটা ব্যথা পেয়েছিলেন, তখন হয়ত ব্যাথানাশক নিয়ে থাকতে পারেন। ধূমপান করা যাবে না, অতিরিক্ত মানসিক চাপ পরিহার করতে হবে।' সাকিব নিজেও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মানসিক চাপ থেকেই চোখে সমস্যা হচ্ছিল।
সাকিবের চোখে ঠিক কি ধরণের সমস্যা হয়েছে এবং কাদের এই সমস্যা হয় এই ব্যাপারে ডাঃ মনির জানান, 'বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা কারণ ছাড়াই হয় তবে সাধারণত খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষের এই সমস্যাটা হয়, বিশেষ করে ৩০-৫০ বছর বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি হয়। আমাদের চোখের রেটিনায় কয়েকটা স্তর থাকে। এরমধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ হচ্ছে রেটিনার করয়েড ভাসকুলার স্তর, ওখান থেকে জলীয় তরল নিঃসরণ হয়। আরো দুটো স্তর হচ্ছে পিগমেন্ট এপিফিলিয়াম স্তর, আরেকটা হচ্ছে নিউরো সেনসেটিভ স্তর। পিগমেন্ট এপিফিলিয়াম স্তরের কাজই হচ্ছে পাম্প করে পানিটা সরিয়ে দেয়া। কিন্তু এই রোগীদের বেলায় কোন একটা কারণে পাম্পিং অ্যাকশনটা কাজ করে না। এর ফলে দুই স্তরের মাঝখানে পানি জমে একটা ফাঁক তৈরি হয়। এই সমস্যাটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনা আপনি সেরে যায়।'
এই সমস্যায় অসুবিধা কি হয় এই প্রসঙ্গে ডা. মনির বলেন, 'রোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে যা জানা যায়, সেন্ট্রাল ভিশনের সামনে কালো একটা দাগ থাকতে পারে। অথবা সাদা একটা দাগ থাকতে পারে। অথবা সবকিছু দেখছে তবে সবই একটি অস্বাভাবিক বা বিকৃত অবস্থায়, স্বাভাবিকভাবে যেমন দেখা যায় তেমন না। বলটা একটু বাঁকা দেখতে পারে। কুয়াশায় যেমন ঘোলা দেখা যায় সেরকম ঘোলা দেখতে পারে। এই সমস্যা নিয়ে মানুষ স্বাভাবিক কাজ সবকিছুই করতে পারে।'
তবে ব্যাটসম্যানদের জন্য হয়তো এই সমস্যাটা জটিলই। কারণ ব্যাটিং করার সময়, বিশেষ করে পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে খেলার সময় একজন ব্যাটসম্যানকে বল দেখে কোন শট খেলবেন সেটা নির্ধারণ করে প্রয়োগ করতে মিলি সেকেন্ডের মত সময় পান। দৃষ্টিবিভ্রম এই ক্ষেত্রে পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটাই প্রভাবিত করতে পারে।
কেন এই ধরণের সমস্যা হয় এই প্রসঙ্গে চক্ষু বিশেষজ্ঞের বক্তব্য, 'কোভিড মহামারীর সময়ে আমরা দেখেছি যে চাকরি নাই, ব্যবসা নাই, ঋণ করে রেখেছে, শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, পারিবারিক অশান্তি এরকম মানুষেরা যারা প্রচন্ড দুশ্চিন্তা করে; অনিশ্চয়তার ভেতর আছে বা স্নায়বিক চাপে আছে তাদের এই সমস্যাগুলো হয়। সাকিব আল হাসানেরটা আমার কাছে বেশ অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তাকে দেখে মনে হয় সে একটা সুখী মানুষ। বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। সুখী পরিবার, জীবনে সে প্রায় সবই পেয়েছে।'
একটা গল্পে রাজার চিকিৎসায় ওষুধ হিসেবে সুখী মানুষের জামা গায়ে দেবার কথা বলেছিলেন এক চিকিৎসক। গল্পের সুখী মানুষের অবশ্য কোন জামা ছিল না, তবে রূপকার্থে ধরে নেয়া যায় চিকিৎসক আসলে রাজাকে সুখী মানুষের মতই নির্ভার আর চিন্তামুক্ত হতে বলেছিলেন। ডাঃ মনিরও মত দিলেন সাকিবের চোখের সমস্যার চিকিৎসা আসলে মন প্রফুল্ল রাখা, 'সাকিবকে উৎফুল্ল থাকতে হবে। টেনশন কম করতে হবে। মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকতে হবে। এধরণের সমস্যায় অনেক খারাপ অবস্থায় গেলে হয়তো কোন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হতে পারে, কিন্তু সাকিবের সমস্যাটা যে পর্যায়ে তা আপনাতেই সেরে যাবার কথা।' এই চিকিৎসক আরো বলেন যে 'আমি মেডিক্যাল বোর্ডের ডাক্তারদের সঙ্গেও কথা বলেছি। সাকিব ভিআইপি মানুষ। তাই বিদেশে গেছেন ডাক্তার দেখাতে। কর্নিয়া, রেটিনা এসব শব্দ শুনে ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই; এটা খুবই সাধারণ একটা সমস্যা।'
সাকিব ডাক্তার দেখিয়ে ফিরেছেন বাংলাদেশে। বৃহস্পতিবারই রংপুর রাইডার্স দলের সঙ্গে তার যোগ দেবার কথা রয়েছে সিলেটে। যেখানে শুক্রবার থেকে ফের শুরু হবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের খেলা।
