৩০০ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে ৫০০ শয্যার ক্যান্সার হাসপাতাল 

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:০৬ পিএম

রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ৫ম তলার ২ নম্বর মহিলা ওয়ার্ডের সামনে চোখ মুখে প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শরীয়তপুরের খায়রুল হুদা। কৌতূহল মেটাতে গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় দিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি জানান, স্ত্রী সালমা আক্তারের গত ৬ মাস ধরে পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। শুরুতে ডাক্তাররা গ্যাসের ব্যথা মনে করে ওষুধ দিতেন। এরপর এই হাসপাতাল ওই হাসপাতাল ঘুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালের চিকিৎসক উজ্জ্বল মল্লিককে দেখান। তিনি ক্যান্সার সন্দেহ করে এখানে আসার পরামর্শ দেন। ৯ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি হলেও এখনও চিকিৎসা শুরু হয়নি। এখানে অধিকাংশ মেশিন নষ্ট থাকায় বাইরে থেকে পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আসতে হয়।

মুখে বিষাদের ছায়া আগলে তিনি বলেন, আজও একটা রিপোর্ট নিয়ে এসেছি। কিন্তু ঘড়িতে ১২টা বেজে যাওয়ায় নার্স জানিয়েছেন আজ আর ডাক্তার রিপোর্ট দেখবেন না। আজ তারা রিপোর্ট জমা নিয়ে রেখেছেন কাল ডাক্তারকে দেখানো হবে। ৯টা দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে কোনো চিকিৎসা করাতে পারলাম না। ডাক্তার পরীক্ষা দেয়, পরীক্ষা করাই কিন্তু ক্যান্সার ধরা পড়েছে কি না তাও জানতে পারলাম না।

কেবল খায়রুল হুদা একাই নন এই হাসপাতালে মরণব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীদের করুণ চিত্র এটি। কারও কারও গল্প আলমগীরের চেয়েও বেদনা, হতাশা আর ক্লান্তির। সরেজমিন রবিবার (২১ জানুয়ারি) ক্যান্সার হাসপাতালে ঘুরে রোগী ও তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এ রকম নানা চিত্র।

একই ওয়ার্ডে কথা হয় দিনাজপুরের ফুলবাড়ি উপজেলার আছিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১ বছর আগে ব্রেস্ট টিউমার ধরা পড়ে। এরপর শ্বশুর বাড়ির লোকজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করায়। যখন জানতে পারলাম ক্যান্সার তার আগেই ছড়িয়ে পড়েছে। এই হাসপাতালে ১৫ দিন হলো চিকিৎসা নিচ্ছি। সকালে রাউণ্ডে ডাক্তার আসেন, মাঝেমধ্যে তাও আসেন না। এরপর সারাদিন যায় আর ডাক্তার কিংবা ইন্টার্নদেরও দেখা মেলে না। কোনো কিছু না বুঝলে নার্সের কাছে গেলে তারাও খারাপ আচরণ করে।

এক বছর আগে বোন মেরুর ক্যান্সার ধরা পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার আলমগীর হুসেনের স্ত্রী সালমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রথমে ইন্ডিয়া নিয়ে যাই। এতে অনেক টাকা পয়সা খরচ হয়। এরপর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাই। এখন পর্যন্ত ১০ লাখ টাকা খরচ করেছি, যা যোগাতে নিজের একমাত্র বাসটি বিক্রি করে দিয়েছি। এখন এই হাসপাতালে কেমোথেরাপি দিতে ভর্তি হয়েছি। হাসপাতালের বাথরুমে বাল্ব নেই ময়লা ও দুর্গন্ধে যাওয়া যায় না। চারপাশে ময়লার স্তুপ জমে আছে। ওয়ার্ড বয়রা টাকা ছাড়া কোনো কাজ করে না, ডাক্তারের দেখা মিলে না সব মিলিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসার উপযোগী নয় এই হাসপাতাল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালে রোগীর যে চাপ সেই তুলনায় ডাক্তার অনেক কম। ডাক্তাররা সকালে রাউন্ড শেষ করে এরপর দুপুর ১২টা থেকে রিপোর্ট দেখতে বসেন। এত পরিমাণ রিপোর্ট জমা হয় তা অনেকসময় একদিনে দেখা সম্ভব হয় না। ফলে দুপুর ১২টার পর আমাদের কোনো রিপোর্ট জমা দিতে নিষেধ করেছেন।

সবশেষ ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে ৩০০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে ২০০ শয্যা বাড়ানোর ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন করে কোনো জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে আগের জনবল দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ৫শ বেডের বিশাল এই হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। জনবলের অভাবে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে যেখানে ২ হাজার ৮৫৮ জন জনবল প্রয়োজন সেখানে আছে মাত্র ১ হাজার ১৭৬ জন। সবমিলিয়ে অর্ধেকের চেয়েও কম জনবল নিয়ে চলছে ক্যান্সার হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। জনবল বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে বারবার জানানো হলেও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্ট্যান্ডার্ড সেটআপ অনুযায়ী, ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতালের জন্য যেখানে ন্যূনতম ৩৭ জন অধ্যাপক প্রয়োজন সেখানে ক্যান্সার হাসপাতালে রয়েছেন মাত্র ৪ জন। একইভাবে ৬১ জন সহযোগী অধ্যাপক ও ১২০ জন সহকারী অধ্যাপকের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও রয়েছেন মাত্র ১৩ জন ও ২৮ জন করে। চিকিৎসক সংকট থাকার কারণে এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর ক্যান্সার (আইএআরসি) বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে দেড় লাখ মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে এক লাখ আট হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। গড়ে প্রতিদিন ২৭০ জনের বেশী মানুষ ক্যান্সারে মারা যান। আক্রান্তের মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। সারা দেশে যেখানে প্রায় ১৮ লাখ ক্যান্সার রোগী আছে সেখানে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ৯টি হাসপাতালে। এই ৯টি হাসপাতালের মধ্যে ক্যান্সার হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই। ফলে এই হাসপাতালের দিকে তাকিয়ে থাকেন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা। আক্রান্তদের মধ্যে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা বেসরকারি হাসপাতাল ও দেশের বাইরে চিকিৎসা করালেও বাকিদের ভরসা কেবল এই ক্যান্সার হাসপাতাল।

অথচ বিপুল সংখ্যাক অসহায় রোগীদের কথা চিন্তা করে সরকার প্রতি বিভাগে স্বতন্ত্র ক্যান্সার হাসপাতাল করার ঘোষণা দিলেও তা কাগজে কলমে ও অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ। যে কারণে দিনে দিনে ক্যান্সার হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছেই। এই হাসপাতালে প্রতিদিন হাজারের বেশী রোগী কেবল আউটডোর থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এখানে প্রতিটি আসনের বিপরীতে ভর্তি হতে যাওয়া রোগীর চাহিদা প্রায় ৭ জন করে। অথচ এই হাসপাতাল যেন নেই নেইয়ের সমাহার।

হাসপাতালে ২৩৬ জন মেডিক্যাল অফিসারের প্রয়োজন থাকলেও কাজ চালাতে হচ্ছে মাত্র ৬৭ জনকে দিয়ে। পাশাপাশি ৬৬ জন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ১৫ জন। কমপক্ষে ৫ জন ফার্মাসিস্টের প্রয়োজন হলেও কাজ করছেন মাত্র ২ জন। লোকবলের সংকটের কারণে ধাপে ধাপে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েও চিকিৎসক, নার্স এর অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় রোগীদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এই হাসপাতালে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দক্ষ টেকনোলজিস্টের। ক্যান্সারের চিকিৎসা কিন্ত অন্য চিকিৎসার মতো নয়। এখানে যন্ত্রের/মেশিনের ব্যবহার করতে হয়। দক্ষ টেকনোলজিস্ট না হলে ভালো রিপোর্ট আসবে না। হাসপাতালে এমন অনেক যন্ত্র আছে যা চালানোর মতো দক্ষতা তাদের নেই।

ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়, তাদের যেকোনো সময় ইনফেকশনের ঝুঁকি থেকেই যায়। কিন্ত এখানে তার বালাই নেই। হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সংকট থাকার কারণে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ৮০- ৯০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীরা টাকা ছাড়া কোনো কাজ করতে রাজি হন না। এ নিয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রায়ই তাদের বাদানুবাদ বাধে। তারা রোগীদের ওয়ার্ডে রাখা ময়লার বল পরিষ্কার করে দিতে হলে টাকা দাবি করে, নিয়মিত ওয়ার্ডের মেঝে ঝাড়ু দেয় না, মুছে দেয় না। সবকটি ওয়ার্ডের বাথরুমের বাইরের মেঝেতে পানিতে জমে আছে। দুর্গন্ধের কারণে নাক চেপেও বাথরুম ব্যবহার করতে পারছেন না রোগীরা। এই আউটসোর্সিং কর্মচারীরা সিট বাণিজ্য, সিরিয়াল বাণিজ্য, ওষুধ বিক্রি চক্রের সঙ্গে জড়িত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আউটসোর্সিং কর্মচারী বলেন, আমরা ভিন্ন কম্পানির মাধ্যমে নিয়োগ পাই। কারও ১ বছর কারও ২ বছরের চুক্তি। আমাদের মাত্র ১৭ হাজার ৬০০ টাকা বেতন দেওয়া হয়। কিন্তু কম্পানি জনপ্রতি আগেই ১-২ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছে। রোগীদের থেকে উপরি যা আদায় করতে পারি তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। বিষয়টা সবাই জানে, তাই কেউ কিছু বলে না।

ওয়াল্ড ক্যান্সার সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ হুমায়ূন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে একটা মাত্র পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার হাসপাতাল, সেখানে যদি ডাক্তার নার্স না থাকেন রোগীরা কই যাবেন। ক্যন্সার রোগীদের প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে। অনেক রোগীই চিকিৎসা না পেয়েই মারা যাচ্ছেন। আমাদের আরও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৈরি করতে হবে, তাদের হাসপাতালে নিয়োগ দিতে হবে।

জনবল ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডাক্তার আবু হেনা মোস্তাফা জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৩০০ বেডের হাসপাতালে যে জনবল ছিল ৫০০ বেড হওয়ার পর তো আর কোনো জনবল বাড়ানো হয়নি ফলে সব ক্ষেত্রেই জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সারা দেশের রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন তাই আমাদের প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। চিকিৎসকরা স্বদিচ্ছা থাকলেও অনেক সময় ভালো সেবা দিতে পারেন না। আমরা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়কে আমাদের চাহিদার কথা জানিয়েছি। আশা করি আমরা দ্রুত কিছু নিয়োগ পাব।

তিনি বলেন, তবে আমরা চেষ্টা করছি সংকট সমাধানের। হাসপাতালের পরিচালক স্যার ও আমরা মিলে মাঝেমধ্যেই রোগীদের সঙ্গে কথা বলছি, তাদের খোঁজ-খবর নিচ্ছি। যেকোনো অভিযোগ থাকলে আমাদের জানাতে বলছি। চিকিৎসকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আমাদের এখানে অপারেশনের সফলতার হার কিন্তু অনেক বেশী। আমাদের ডাক্তারদের চিকিৎসা অবহেলার কোনো অভিযোগ নেই। বিদেশ থেকে ফিরে এসে অনেক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। যদি বিভাগীয় পর্যায়ে হাসপাতাল হয় রোগীর চাপ কমে এবং আমাদের প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে আমরা আরও ঈর্ষণীয় পারফরম্যান্স দেখাতে বদ্ধপরিকর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত