পোশাক খাতে বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স পরিপালন করার পরও এখনো ন্যায্যমূল্যের জন্য ক্রেতাদের সঙ্গে নানা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে পোশাক ব্যবসায়ীদের। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের উৎপাদন সত্ত্বেও বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো ব্র্যান্ড নেই। সেজন্য নিজেদের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করে বিটুবি (বিজনেস টু বিজনেস) ও বিটুসি (বিজনেস টু কনজিউমার) প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চায় তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এর মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা দুই ধরনের ক্রেতাদের কাছে কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি পৌঁছতে চায় তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘স্টাবলিশিং আ ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য অ্যাপারেল সেক্টর’ শীর্ষক গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিজিএমইএ। প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসব তথ্য জানান সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাকে বাংলাদেশ প্রচলিত ক্রেতাদের কাছে যেমন প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, গত কয়েক বছর ধরে অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। নতুন বাজারে মাঝারি আকারের ক্রেতাদের জন্য একটি ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস (বিটুবি) তৈরি করতে চায় বিজিএমইএ। এর মাধ্যমে নতুন বাজারগুলোতে বাংলাদেশের পোশাকের প্রভাব তৈরি হবে। খুচরা ক্রেতাদের জন্য ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস তৈরি হলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের মাধ্যমে দেশের পোশাক সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো যাবে। এতে নিজস্ব ব্র্যান্ডের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ফারুক হাসান বলেন, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন বিক্রয়ের ১৮ শতাংশ ভার্চুয়ালি হয়েছিল, যা ২০২৫ সালের মধ্যে ২৩ শতাংশে পৌঁছবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে ক্রেতারা ভার্চুয়াল মার্কেটের প্রতি বেশি অনুপ্রাণিত হচ্ছেন, পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কেনাকাটার বিকল্প হিসেবেও ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস সমাদৃত।
তিনি বলেন, গত ৪৫ বছরে আমরা বিশ্ব ফ্যাশন বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছি। কিন্তু আমরা এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের কোনো ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারিনি।
পোশাক খাতের এ ব্যবসায়ী নেতার মতে, সব গ্লোবাল ব্র্যান্ড এবং খুচরা বিক্রেতাদের জন্য উৎপাদন সত্ত্বেও এটি নিজস্ব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এটি পরিবর্তন করতে চান তারা। নিজেদের ওবিএম (অরিজিনাল ব্র্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত এন্ট্রি-পয়েন্ট।
ফারুক হাসান বলেন, শুরু থেকেই আমরা বিজিএমইএর বর্তমান বোর্ড বহুমুখীকরণকে গুরুত্ব দিয়ে আসছি। অপ্রচলিত বাজারে আমাদের শেয়ার ১৮ শতাংশ অতিক্রম করেছে। বর্তমানে আমরা ১০০ ডলার ফ্রেইট অন বোর্ড মূল্যের পোশাকও তৈরি করছি। আমরা আমাদের শিল্পকে রি-ডিফাইন করার প্রত্যয় নিয়েছি।
ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেসের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, যদি আগামী দিনে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাই, তাহলে আমাদের একটি সামগ্রিক ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে হবে। সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় খাতের জন্য নীতিগত সহায়তার প্রয়োজন হবে। আর এ কারণেই, আমরা এই বিশেষ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিবেদনটি একদিকে যেমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার ঘটাবে, পাশাপাশি ব্যবসা প্রসারের ক্ষেত্রে আগামী দিনে আমাদের জন্য একটি গাইডলাইন হয়ে থাকবে।
আরও দুটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের হাতে আরও দুটি গবেষণা রয়েছে যার মধ্যে একটি হলো ‘ফাইবার ডাইভারসিফিকেশন’, যা আমরা ওয়াজির অ্যাডভাইজারের সঙ্গে কাজ করছি, এ গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হবে আগামী মাসে। এ ছাড়া আমরা পিডব্লিউসির পোশাক খাতের রোডম্যাপ নিয়ে একটি গবেষণা করছি, যা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী মার্চ মাস নাগাদ এ রিপোর্টটি প্রকাশ করতে পারব।
প্রতিবেদনে বিটুবি প্ল্যাটফর্মের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলা হয়, বিটুবি প্ল্যাটফর্মে লেনদেন করার মতো দেশে কোনো আইন নেই। এখন পর্যন্ত শুধু ঋণপত্রের (এলসি) ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এ ধরনের প্ল্যাটফর্মের জন্য দেশে বৈশি^ক কোনো ওয়্যারহাউজ এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউজ নেই। ছোট ও মাঝারি মানের ক্রেতাদের জন্য অন্যায্য মূল্য প্রতিযোগিতার ঝুঁকি এ মাধ্যমে আছে। ডেটা প্রাইভেসি নিয়েও রয়েছে ঝুঁকি।
বিটুসি (ব্যবসা থেকে ভোক্তা) প্ল্যাটফর্মের ঝুঁকি হিসেবে বলা হয়, বিটুসি প্ল্যাটফর্মের জন্য প্রধান ঝুঁকি হলো দেশে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত পেমেন্ট গেটওয়ে ও ডিজিটাল ওয়ালেটগুলো নেই। এ ধরনের ই-কমার্সের জন্য মূলধন ঝুঁকি ও বিনিয়োগের অভাব তো রয়েছেই। তবে দেশীয় বাজারের জন্য ২০১৮ সালের জাতীয় ডিজিটাল বাণিজ্য নীতির বিপরীতে, আন্তর্জাতিক ই-কমার্সে প্রবেশ করার জন্য কোনো সুস্পষ্ট নীতি কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে, একটি শক্তিশালী ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গ্লোবাল পেমেন্ট গেটওয়ের অনুপস্থিতি, ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অর্থায়ন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ, ছোট অর্ডারের জন্য জটিল রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এবং অবাস্তব রিটার্ন নীতি (যেখানে রিটার্নকে আমদানি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়) প্রভৃতি বিষয়গুলো যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।
প্রতিবেদনে একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। নীতিগত জায়গায় কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে, তা-সহ টেকসই বিজনেস মডেলের প্রস্তাবনা দিয়েছে এবং ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল সমন্বিত উপযুক্ত কর্মপরিকল্পনার বিষয়েও সুপারিশ করেছে।
প্রতিবেদনে পোশাক খাতের টেকসই সাফল্যের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো উদীয়মান বাজারে বিরাজমান ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা (বিটুবি) কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশি প্রস্তুতকারক ও চূড়ান্ত ভোক্তাদের মধ্যে (বিটুসি) সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্য তৈরি করা; যার ফলে মুনাফা মার্জিন বাড়বে এবং ব্যবসার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম, পরিচালক আবদুল্লাহ হিল রাকিব, পরিচালক নাভিদুল হক ও পরিচালক মো. ইমরানুর রহমান, বিজিএমইএ স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রেস, পাবলিকেশন অ্যান্ড পাবলিসিটির চেয়ারম্যান শোভন ইসলাম, বিজিএমইএ স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ট্রেড ফেয়ারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন এবং বিজিএমইএ স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ইউডি-ওভেন অ্যান্ড নিটের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম, আইএফসি-প্যাক্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নিশাত শহীদ চৌধুরী এবং লাইটক্যাসল পার্টনারস থেকে জাহেদুল আমিন। এ গবেষণাটি আইএফসির পার্টনারশিপ ফর ক্লিনার টেক্সটাইল (প্যাক্ট টু) প্রোগ্রামের অর্থায়নে করা হয়েছে।
