গাভীর হাম্বা রব যদি ভাষা হয়

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:০৬ এএম

প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প পরেই পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে পূর্ব বাংলায় সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধারার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে সময় থেকেই যদি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মীরা এবং কবি-সাহিত্যিকদের গোষ্ঠী নিশ্চিত প্রচ- বিরোধিতার মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে না আসতেন, তবে হয়তো ত্রিশ বছর পর আজকের বাংলাদেশে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে একটি অধোগতিসম্পন্ন বিজাতীয় চরিত্রের উপস্থিতি দেখা যেত। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিদেশমুখিতার বিরুদ্ধে যারা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বলীয়ান শক্তিধরদের তুলনায় তারা ছিলেন মুষ্টিমেয়।

ঢাকাতে প্রগতিশীল লেখক-শিল্পীরা ছিলেন বিচ্ছিন্ন। কিন্তু প্রদেশের দু-একটি স্থানে, যেমন চট্টগ্রাম বা কুমিল্লার সাহিত্যকর্মী ও সংস্কৃতিসেবীরা সে তুলনায় অনেকটা বেশি সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কয়েকটি কলেজের তরুণ এবং প্রগতিশীল ছাত্র-সাহিত্যিক সে সময় থেকেই প্রগতি লেখক সংঘের শূন্যস্থান পূরণ করার উদ্দেশ্যে একটি প্রগতিশীল সাহিত্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা চিন্তা করতে থাকেন। একই সময় ঢাকার কয়েকজন অধ্যাপক ও সাহিত্যিকের উদ্যোগে ওয়ারীর র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটস্থ ইঞ্জিনিয়ার দাসের বাড়ি ও হেয়ার স্ট্রিটে অধ্যাপক অমিয় চক্রবর্তীর বাসায় ছোট ছোট সাহিত্য আলোচনা সভা বসত। এসব সাহিত্যিক ও নতুন লেখকদের সমন্বয়ে তখনো কোনো প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠান ঢাকায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি (বর্তমানে আমাদের দেশে ভাষা, সংস্কৃতি ও দর্শনের যে বিকৃতি সাধনের চেষ্টা চলছে, তা লক্ষণীয়)।

কিন্তু সরকারের পরোক্ষ বিরোধিতার মধ্যেও এই অঞ্চলে সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে। একান্ন সালের ষোলো মার্চ থেকে উনিশে মার্চ পর্যন্ত হরিখোলার মাঠে এই ‘পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলনে’ সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট পন্ডিত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি কবি সুফিয়া কামাল এবং শিল্পকলা শাখার সভাপতিত্ব করেছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন। কলকাতা থেকে এসেছিলেন সত্যযুগ পত্রিকার সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, দেবব্রত বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, সুচিত্রা মিত্র, হেনা বর্মণ প্রমুখ এবং আইপিটিএর একটি গ্রুপ। চট্টগ্রামের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘প্রান্তিক’ গণসংগীত পরিবেশন করেছিল এবং ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ, হামিদুর রহমান, আমিনুল ইসলাম ও আরও কয়েকজন শিল্পীর চিত্রকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। সাফল্যম-িত এই সাংস্কৃতিক সম্মেলন স্বাভাবিকভাবেই প্রদেশের অন্যান্য অঞ্চলে উৎসাহের সঞ্চার করতে সমর্থ হয়। প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে এ ছিল সংগঠিত প্রথম কণ্ঠ।

সমসাময়িককালে ঢাকার সাহিত্যিকগণ প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ নামে একটি ক্ষুদ্র সাহিত্য সংস্থা গঠন করেন; তা ছিল সে সময় একান্তই ঘরোয়া বৈঠকের প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি সাহিত্য সভা হয়েছিল র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে ইঞ্জিনিয়ার দাস বাবুর বাড়িতে। এরপরই অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন কুমিল্লায়। বাহান্ন সালের বাইশ, তেইশ ও চব্বিশে আগস্ট পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের মূল সভাপতি ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। মূল সম্মেলনের পরবর্তী চারটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মাহবুব-উল আলম, বেগম সুফিয়া কামাল, অবনী মোহন নন্দী ও কাজী মোতাহার হোসেন। চট্টগ্রাম থেকে প্রান্তিক ও রেলওয়ে শিল্পী সংসদ, সিলেট থেকে মুসলিম সাহিত্য সংসদ এবং ঢাকা থেকে আর্ট গ্রুপ, অগ্রণী শিল্পী সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদ এবং বগুড়া, রাজশাহীর কর্মীরা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা থেকে আমাদের একটি বিরাট সাহিত্যিক ও শিল্পী দল সম্মেলনে অংশ নেয়। কুমিল্লা সাংস্কৃতিক সম্মেলন প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত তরুণ ও প্রগতিশীল সাহিত্যিক কর্মীদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে। অপরদিকে গণমুখী ও প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের এই সম্মেলন প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে এই সম্মেলন ছিল সমগ্র প্রদেশের গণচেতনাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আরম্ভ করার মঞ্চ। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের শাসকদের প্রতিক্রিয়াশীল নীতির সমর্থক সাহিত্যিকদের প্রতাপের মুখোমুখি প্রগতিশীল সাহিত্যকর্মীরা সে সময় রাজধানী ঢাকার দূরবর্তী সংস্কৃতি কেন্দ্র চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার প্রগতিশীল সাহিত্যকর্মীদের অপেক্ষা ঐক্যের দিক থেকে বহুলাংশে দুর্বল ছিলেন। সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে এবং শান্তির পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল। তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে বহুসংখ্যক প্রবন্ধ ও কবিতা পাঠ হয়। হাসান হাফিজুর রহমান স্বরচিত কবিতা  ‘হে আমার দেশ’ ও তাসিকুল আলম খাঁ ‘ভালোবাসি এই দেশকে’ পাঠ করেন। সৈয়দ নুরুদ্দিনের ‘পাকিস্তানের জাতীয় মুখচ্ছবি’ প্রবন্ধটি পঠিত হয় এবং মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম বক্তৃতা করেন ‘আমাদের সাম্প্রতিক সাহিত্য’ সম্পর্কে। রাজনৈতিক নেতা কামিনী কুমার দত্ত ও আশরাফউদ্দিন চৌধুরী সম্মেলনে ভাষণদান করেছিলেন। নেয়ামল বসির ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তৃতীয় দিনের অধিবেশনে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন যথাক্রমে ‘তোমরা ও আমরা’ এবং ‘একুশের কবিতা’। ‘পূর্ব বাংলার শিশু সাহিত্য’ সম্পর্কে প্রবন্ধ পাঠের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর।

এই সম্মেলনের পরেই ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ গঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। সমস্ত শ্রেণির প্রগতিশীল সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক-কর্মীরা এই প্রতিষ্ঠানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাহিত্য জগতে প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের সংহত করেন। সাহিত্য সংসদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব পালন করতে হলেও প্রকৃতপক্ষে হাসান হাফিজুর রহমানই ছিলেন এর প্রধান সংগঠক। পরবর্তীকালে চুয়ান্ন সালে কার্জন হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে ব্যাপকভিত্তিক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তার মূল উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করে সাহিত্য সংসদ। আজকে বাংলাদেশে যারা সুপ্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক, তাদের অনেকেই এই সংসদের সঙ্গে পঞ্চাশের যুগে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পঞ্চাশ দশকের গোড়ার দিকে শক্তিহীন প্রগতিশীল ও শক্তিধর প্রতিক্রিয়াশীল এ দুই সাংস্কৃতিক ধারার মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব চলছিল, সে সময় পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ এবং প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদী প্রতিষ্ঠানটিই প্রথম সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। সে সময় একগুচ্ছ যুবক ও প্রৌঢ় ব্যক্তিত্ব যেন একাত্ম হয়ে ঢাকায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। সে প্রকাশ ছিল প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে একদল সাহিত্য- সংস্কৃতিকর্মীর বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের সহযাত্রী ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অজিত গুহ, মুনীর চৌধুরী, সারওয়ার মুরশিদ, সৈয়দ নুরুদ্দিন, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী, আতাউর রহমান (রাজশাহী), আলাউদ্দিন আল-আজাদ, আনিসুজ্জামান, সরদার জয়েন উদ্দিন, আবদুল গনি হাজারী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল্লাহ আল-মুতী, কামরুল হাসান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আমিনুল ইসলাম, তাসিকুল আলম খান, ফজলে লোহানী, মুর্তজা বশীর, লায়লা সামাদ, আতোয়ার রহমান, খালেদ চৌধুরী, আনিস চৌধুরী, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ। এরা সে সময় সুস্থ ও বাস্তবধর্মী চিন্তা বিকাশের পরিমন্ডল গড়ে তুলেছিলেন।

আমাদের এই সাহিত্যিক গোষ্ঠীর মধ্যে নানা ধরনের তরুণ সাহিত্যিক ভিড় করেছিলেন। এদের অনেকেই তখনো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। মধুর স্টল থেকে শুরু করে পত্রিকার অফিস এবং শেষ পর্যন্ত সওগাত অফিসে পৌঁছেও তাদের যে আলোচনার বিষয়টি দুদিন পূর্বে শুরু হয়েছিল, তা অনেক সময় শেষ হতো না। কারও কারও জীবন সম্পর্কে ধারণাও ছিল বিচিত্র। কেউ কেউ কিছুই লিখতেন না, অলিখিত সমালোচনাই শিল্পকর্ম। সাহিত্যসভাগুলোতে প্রায়ই সভাপতিত্ব করতেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন, আমাদের সভাপতি। সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের জন্যে তার পাশে বসে সেবকের ভূমিকা পালন করতাম আমি। সওগাত অফিসের ‘বেগম ক্লাবের’ তখনকার চালার নিচে এমনি এক সভায় আমরা গুরুতর সাহিত্য আলোচনায় ব্যস্ত। সে মুহূর্তে আলোচনা চলছিল আমাদের এক বন্ধু সাহিত্যিকের একটি সদ্য রচিত গল্পের ওপর। সওগাত সম্পাদক নাসিরুদ্দিনের ব্যক্তিগত উৎসাহে অন্যান্য দিনের মতো আজও সভায় কালাচাঁদের মিষ্টি আসতে শুরু করেছে। গল্পটি আলোচনার শেষ পর্যায়ে সভার পেছন দিক থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসল, একটু গভীর। বক্ষের নিম্নতল বেস থেকে শব্দ টেনে এনে যতদূর সম্ভব ভারী কণ্ঠে বন্ধু খালেদ কটি কথা প্রকাশ করলেন সভাপতি সাহেব, আমি কিছু বলতে ইচ্ছুক। (তার বন্ধুরা জানেন, শব্দ প্রয়োগে ও উচ্চারণের ব্যাপারে তিনি কতটা নিজস্ব ভঙ্গিতে চলেন।)

সভাপতির অনুমতির অপেক্ষা না করেই আমাদের প্রিয় বন্ধুটি অধৌত তাম্বুল রঞ্জিত পাঞ্জাবির ঝুলন্ত পকেট দুলিয়ে সভার মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে সভাপতির দিকে অগ্রসর হলেন। জানতাম একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে অবশ্য বক্তব্যে। তিনি সভাপতির পাশে দাঁড়িয়ে বললেন : সভাপতি সাহেব, গাভীর হাম্বা রব যদি ভাষা হয়, তবে এটি একটি গল্প। শোকেসের পুতুলের মতো সভাপতি ও আমি হতবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। স্তম্ভিত নির্বাক শ্রোতাদের মধ্য দিয়ে বন্ধু খালেদ পানের ঠোঙা হাতে করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন। আলোচ্য গল্পের লেখক বন্ধু সাহিত্যিককে সভায় আর দেখা গেল না। (সংক্ষেপিত)

লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত