নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের নাওড়া গ্রামে রফিক বাহিনীর হামলায় গুলিবিদ্ধ তাজেল ইসলাম মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। গত সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ভয়ংকর রফিক বাহিনীর হামলায় চোখে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। একই হামলায় আহত আরও ১৩ জনের ৫ জন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এদিকে হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগীরা রূপগঞ্জ থানায় মামলা করতে গেলেও গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ মামলা নেয়নি। তবে অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন রূপগঞ্জ থানার ওসি দীপক চন্দ্র সাহা। অভিযোগ তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। জানা গেছে, সোমবার দুপুরে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ও তার ভাই মিজানুর রহমান মিজানের উপস্থিতিতে ৫০ থেকে ৬০ জন সন্ত্রাসী নাওড়া গ্রামের বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় ৮ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয় ১৩ জন। এর মধ্যে পাঁচজন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে তাদের পরিবার। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সন্ত্রাসীদের ভয়ে এলাকাছাড়া বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাজেল ইসলাম নাওড়া গ্রামের মোক্তার হোসেনের ছেলে। সোমবার দুপুরে সন্ত্রাসীরা তার বাড়িতে হামলা করলে আশপাশের লোকজন তাকে রক্ষা করতে আসে। তখন সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তাজেল। তখন রফিক বাহিনীর সদস্য আব্দুর রহমান তাকে চায়নিজ কুড়াল দিয়ে আঘাত করে। এতে তার মুখমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত ও নাক কেটে যায়। পরে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
চিকিৎসকের বরাত দিয়ে বাবা মোক্তার হোসেন বলেন, তাজেলের শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। অবস্থা খুবই গুরুতর। একই হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মুহাম্মদ জাগু প্রধান, আলাদি প্রধান, মোহাম্মদ আল-আমিন ও জয়নাল প্রধানও গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
হামলার শিকার লিপি প্রধান, মাসুদা প্রধান, জেসমিন প্রধানসহ বেশ কয়েকজন নারী চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু নতুন করে হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।
গতকাল দুপুরে নাওড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো গ্রামে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গ্রামটিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
গ্রামের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম জানান, রফিক বাহিনীর ফের হামলার ভয়ে অধিকাংশ বাড়ির পুরুষরা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোতালেব ভূঁইয়া বলেন, ‘সোমবার রফিক ও মিজান বাহিনীর সন্ত্রাসীরা নাওড়া গ্রামের মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করার পর ৮ জনকে গুলিবিদ্ধ করে শিশুসহ ১৩ জনকে আহত করে। সারাজীবন দল করে আমাদের দল ক্ষমতায় থাকাকালে দলের হাইব্রিড ভূমিদস্যু রফিক বাহিনী আমাদের গুলি করছে, বাড়িঘর-ছাড়া করছে। প্রশাসনের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে না।’
এই হামলার ঘটনায় মোস্তাফিজুর রহমান নীরব বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। এতে হামলাকারীদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম ও তার ভাই মিজানসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ থেকে ৪০ জনকে আসামি করা হয়।
অভিযোগে মোস্তাফিজুর রহমান নীরব বলেন, ‘আসামিরা অত্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল, দাঙ্গাবাজ, ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক। তারা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণ করে আসছে। আমাদের বাড়িঘর ও জমিজমা দখল করতে রফিকুল ইসলামের নির্দেশে মিজানুর রহমান ও কালা জসুর নেতৃত্বে ৩০-৪০ জন সন্ত্রাসী আগ্নেয়াস্ত্র, শটগান, দা, রামদা, চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল, সুইচ গিয়ার, চাকু, লোহার রড, এসএস পাইপ, হাতুড়ি নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়।’
মামলার বাদী মোস্তাফিজুর রহমান নীরব বলেন, ‘সোমবার দুপুরে ও বিকেলে দুই দফায় হামলায় আমাদের পরিবার ও আশপাশের ৬ থেকে ৭ বাড়ির ১৩ জন গুরুতর আহত হয়। সন্ত্রাসীরা এখনো হামলার পরিকল্পনা করছে। আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অস্ত্র উদ্ধার অথবা একজন হামলাকারীকেও আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ।’
