জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই বেজে উঠেছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন (মসিক) নির্বাচনের ঘণ্টা। আগামী ৯ মার্চ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরাও নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিয়ে শুরু করেছে প্রচার প্রচারণা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে নগরীর সর্বত্রই বইছে ভোটের হাওয়া।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মনোনয়ন দাখিলের শেষ সময় ১৩ ফেব্রুয়ারি। আপিল ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি, আপিল নিস্পত্তি ১৯ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি, প্রত্যাহার ২২ ফেব্রুয়ারি। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রতীক বরাদ্ধ এবং ৯ মার্চ ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
২০১৮ সালে প্রথম ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন গঠিত হয়। ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন। নির্বাচিত হবেন সিটি মেয়রসহ ১১ জন নারী কাউন্সিলর এবং ৩৩টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর। চলতি নির্বাচনে তিন লাখ ৩৬ হাজার ৪৯০ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে বলে জানিয়েছে জেলা নির্বাচন অফিস।
এদিকে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সরব হয়ে উঠেছেন সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। তারা নিজেদের জানান দিচ্ছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো সিটি নির্বাচনেও বিএনপি অংশগ্রহণ করবে না বলে জানিয়েছে দলটির স্থানীয় শীর্ষ নেতারা।
মেয়র পদে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক একাধিক আওয়ামী লীগ নেতার পোস্টার চোখে পড়েছে নগরী জুড়ে। ওইসব পোস্টারে নগরীর বিভিন্ন নাগরিক দুর্ভোগ লাঘবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
মেয়র প্রার্থীদের বড় চ্যালেঞ্জ দলীয় সমর্থন। সরকার দলীয় সমর্থন পেতে কেন্দ্রে লবিং শুরু করছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। এখন পর্যন্ত মেয়র পদে নিজেদের মনোনয়ন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের চার জন।
আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু, শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান মিল্কী টজু, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফেরদৌস জিলু এবং প্রয়াত পৌর মেয়র মাহমুদ আল নূর তারেকের ছেলে অ্যাডভোকেট ফারমার্জ আল নূর রাজীব।
বর্তমান সিটি মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কাজ শুরু করি। কিন্তু বৈশ্বিক সংকট আর করোনা মহামারির কারণে উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অনেকাংশে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন, যার ফলে বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরীর অনেক উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছি। নগরের বিভিন্ন রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ এখনও চলমান রয়েছে। আমি আশাবাদী, দল আমাকে আবারও দলীয় সমর্থন দিয়ে ময়মনসিংহবাসীর সেবা করার সুযোগ দেবে। নির্বাচিত হতে পারলে নগর উন্নয়নের অসমাপ্ত যে কাজগুলো রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করে একটি স্মার্ট, সমৃদ্ধ এবং আধুনিক ময়মনসিংহ গড়ে তুলব।’
এ ছাড়াও জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে স্বপন মন্ডলও মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও নারী কাউন্সিলররাও পোস্টার-ফেস্টুন দিয়ে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, ‘নগরের উন্নয়নের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হওয়া জরুরি। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন হওয়ার পর থেকে এখনও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। মানুষ চায় উন্নয়ন এবং সব ধরনের নাগরিক সুবিধাপূর্ণ নগর। এ জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হওয়া উচিত।’
নারী উদ্যোক্তা ইশরাত দৌলা ইমা বলেন, ‘নতুন সিটি হিসেবে ইতিমধ্যে উন্নয়ন শুরু হয়েছে। আমরা চাই আগামী দিনে এমন নেতৃত্ব আসুক যাতে এই ধারা অব্যহত থাকে। সেই সাথে যারা নারী অধিকার আদায়ে ও ময়মনসিংহ সিটিকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, সন্ত্রাস-মাদক, নারীবান্ধব আধুনিক নগরী উপহার দিতে পারবে এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি।’
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী সাদেক খান মিল্কি টজু নগরীকে অপরিচ্ছন্ন ও অপরিকল্পিত শহর উল্লেখ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরজুড়ে অপরিকল্পিতভাবে শত শত আকাশছোঁয়া ভবন হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। যানজটে নাকাল ময়মনসিংহ শহর এখন বিশ্বের ৯ নম্বর ধীরগতির শহরে স্থান পেয়েছে। আমি সুযোগ পেলে এই শহরকে পরিকল্পিত ধুলাবালিমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়তে চাই।’
মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফেরদৌস জিলু বলেন, ‘জলাবদ্ধতা, যানজট ও অপরিচ্ছন্নতাসহ নানা সমস্যা রয়েছে নগরীতে। আমি নির্বাচিত হতে পারলে এসকল সমস্যা সমাধানে নগরবাসীকে নিয়ে কাজ করে যাব।
অ্যাডভোকেট ফারমার্জ আল নূর রাজীব মনোনয়ন প্রত্যাশায় প্রচার চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে নগরের বিভিন্ন দেয়ালে শুভেচ্ছা জানিয়ে রঙিন পোস্টার লাগিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবা এই পৌরসভার দুবার চেয়ারম্যান ও মেয়র ছিলেন। তিনি মেয়র থাকা অবস্থায় মারা যান। এই শহরকে নিয়ে বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন। সে স্বপ্ন পূরণে এই শহরের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। ময়মনসিংহকে আধুনিক এবং স্মার্ট নগর গড়তে চাই।’
অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক এ কে এম শফিকুল ইসলাম। তবে দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে নগরীর উন্নয়নে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মাঠে লড়বেন তিনি।
আসন্ন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে নগরবাসীর প্রত্যাশা এবং ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত করবেন।
ভাগের ১০ আসন আওয়ামী লীগকে দিলেন স্বতন্ত্ররা