সিরাজগঞ্জের তাড়াশে গত সোমবার রাতে নিজ বাড়ি থেকে স্ত্রী-কন্যাসহ ব্যবসায়ী বিকাশ সরকারের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ছাড়া গত এক সপ্তাহে একই ঘরে বাবা-ছেলের ঝুলন্ত লাশ, রান্নাঘরে মা ও গাছে ছেলের ঝুলন্ত মরদেহ এবং মা তিন সন্তানকে বিষ খাইয়ে নিজে বিষপানে আত্মহনন চেষ্টার মতো ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। শুধু এই কয়েকটি ঘটনাই নয়, কয়েক বছর ধরেই পারিবারিক সহিংসতা ও হত্যার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে, যা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিশুরাও। ঘটছে স্বজনের হাতে স্বজন খুনের ঘটনা। কোথাও স্বামী হত্যা করছে স্ত্রীকে, কোথাও আবার স্ত্রীর হাতে খুন হচ্ছে স্বামী। আবার ছেলের হাতে বাবা কিংবা মা, কোথাও আবার বাবা কিংবা মায়ের হাতে সন্তান আর ভাইয়ের হাতে ভাই হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। সব মিলিয়ে যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে পারিবারিক সম্পর্কের বাঁধন।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে পারিবারিক সহিংসতার এসব ঘটনা ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতি আসক্তি, পরকীয়া, সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব, মানসিক বিকৃতি, অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও বিশ্বায়নের মতো নানা ধরনের বিষয় পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করার পেছনের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার ভিনদেশের
সংস্কৃতির বিস্তৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল বার্তা, খেলাধুলা কমে যাওয়া এবং সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন না মানার কারণেও পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
জানা গেছে, বাবার একাধিক বিয়ের বিষয় নিয়ে শাশুড়ির মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে গোপালগঞ্জে গত মঙ্গলবার নিজের তিন কন্যাসন্তানকে বিষ খাওয়ানোর পর নিজেও বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান গৃহবধূ পলি বেগম। যাদের মধ্যে গতকাল সকালে মারা যায় পলি বেগমের ছোট মেয়ে দেড় বছরের মীম। তার আগে গত ২৭ জানুয়ারি কুষ্টিয়া শহরের মঙ্গলবাড়িয়া এলাকার একটি বাসা থেকে বাবা ও তার সাত বছর বয়সী ছেলের পাশাপাশি আলাদা দড়িতে ঝুলতে থাকা লাশ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ছেলেকে হত্যার পর ওই বাবা আত্মহত্যা করেন। তার আগের দিন ২৬ জানুয়ারি পাবনার চাটমোহরে রান্নাঘরে পড়ে ছিল মায়ের লাশ আর তার ছেলের লাশ পাশের একটি গাছে ঝুলছিল। পরে পুলিশ লাশ দুটি উদ্ধার করে। এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটা এসব ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, এসব হত্যা ও মৃত্যুর পেছনের কারণগুলো নিয়ে।
এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের কথা হয় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা নানা কারণে ঘটে থাকে। এটা কেস টু কেস ভেরি করে (একেক ঘটনায় একেক কারণ)। মানুষের মধ্যে হতাশা, পারিবারিক কলহ, ধৈর্যশক্তি কমে যাওয়া, অর্থ প্রাপ্তি বা নিজের সুবিধা নেওয়ার জন্য ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে এ ধরনের হত্যা বা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এগুলো দ্রুত বন্ধ করা মুশকিল। এ ধরনের ঘটনায় কোনো কমন ফ্যাক্টর (একক কারণ) নেই। সমাজে যদি কোনো কমন কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তবে সমাজের বাসিন্দাদের সচেতন করার মাধ্যমে এগুলো রোধ করা যায়।’
পুলিশের সাবেক এ প্রধান আরও বলেন, ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়। অস্থির সমাজে বসবাস করলে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা থাকে। সাংস্কৃতিক বিকৃতির কারণে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়া ও সামাজিক বন্ধন নষ্ট হওয়াও এ ধরনের ঘটনা ঘটার পেছনের একটি বড় কারণ। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। সমাজের সবাই মিলে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা কমানো যাবে।’
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৫৭৪ জন নারী ধর্ষণের শিকার এবং ১২৯ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর ৩৩ জন মারা গেছে এবং ৫ জন আত্মহত্যা করেছে। একই সময়ে স্বামীর নির্যাতনে ২০৭ জন নারী মারা গেছে এবং নির্যাতন সইতে না পেরে ১৪২ জন আত্মহত্যা করেছে। এ সময়ে ১৪২ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১২ জন আত্মহত্যা করেছে। আর গত বছর ৪৮৫ শিশুকে বিভিন্নভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আসকের নির্বাহী পরিচালক ফারুখ ফয়সল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের সমাজে একটা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মানুষ মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এই সামাজিক অস্থিরতা যদি দূর করা না যায়, তাহলে মানুষ মানসিকভাবে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমরা যদি সমাজকে সৎ ও সহনশীল সমাজে পরিণত করতে না পারি তাহলে এ অস্থিরতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে।’
এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের কথা হয় মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায় সামাজিক শিথিলতা ও পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়া অন্যতম কারণ। আর এটা দুর্বল হওয়ার পেছনের কারণ হচ্ছে, পারিবারিক পরিবেশে কোনো শৃঙ্খলা নেই, যেমন পরকীয়া ও সম্পত্তিগত বিষয়। এ ছাড়া পারিবারিক পরিবেশে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা থাকলেও অর্থনৈতিক কষ্টে সেটা বজায় থাকছে না। যার কারণে নিজেদের মধ্যে বন্ডিংটা (সম্পর্কের বাঁধন) নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মতো ঘটনা ঘটছে।’
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের চেয়ে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব বেশি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বিশৃঙ্খলতা আছে। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাবোধ বজায় রেখে চললে এটা অনেক পরিমাণে কমানো সম্ভব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পরিবারকে সংযত হতে হবে এবং ব্যক্তিত্ববোধের জায়গা থেকে সবাইকে অন্যের ও নিজের বিষয়গুলো বিবেচনাবোধ থেকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে এ ধরনের সহিংসতা অনেক কমে আসবে।’
একই ধরনের মত দেন মানবাধিকারকর্মী এবং বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান। তিনি বলেন, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হচ্ছে তার পরিবার। কিন্তু সেই পরিবারে এখন সম্পর্কের দুর্বলতা, ভালোবাসার অভাব, লোভ ও মানবিক মূল্যবোধের অভাব ঢুকে গেছে। এর পেছনের কারণ হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয় ও পারস্পরিক বন্ধন কমে যাওয়া। এজন্য রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শাস্তি নিশ্চিত করা এবং আত্মহত্যা রোধে কাউন্সেলিং জরুরি। সবাই মিলে এ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিতভাবে কাজ করলে এ ধরনের ঘটনা কমবে।’
