গাজার গণকবরের লাশ নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছেন ফিলিস্তিনিরা। গণকবরের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের হাত বাঁধা ও মুখ ঢাকা লাশ পাওয়া গেছে, যা নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, এসব ব্যক্তিকে বন্দি করেছিল ইসরায়েল। এদিকে গাজা যুদ্ধে মৃত্যুসংখ্যা গতকাল বৃহস্পতিবার ২৭ হাজার ছাড়িয়েছে। আবার ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলাও চলছে।
গণকবর নিয়ে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তর গাজার হামাদ স্কুলের কাছে কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে প্রায় ৩০টির মতো লাশ পাওয়া গেছে। বেসামরিক মানুষদের ইসরায়েল মৃত্যুদ- কার্যকরের মতো করে হত্যা করছে।
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বুধবার আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলে, ইসরায়েলের এ কর্মকা- ‘নৃশংসতা’ এবং ‘আমাদের মানুষের বিরুদ্ধে ইসরায়েল যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছে, সেই সত্য ও পরিস্থিতিটুকু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজায় এসে দেখুক। যেসব মানুষকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছে’।
ইসরায়েলি নৃশংসতার একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য আমরা স্কুলের আঙিনায় একটি ধ্বংসস্তূপের কাছ দিয়ে যাই। এখানে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কয়েক ডজন মৃতদেহ দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। আমরা যখন প্লাস্টিকের ব্যাগগুলো খুলি, আমরা মরদেহ দেখতে পাই, যা এরই মধ্যে পচে গেছে। এসব লাশের হাত-পা বাঁধা এবং মুখ ঢাকা।’
গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাস বলেছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উচিত উপত্যকার এই গণকবরের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা।
সংগঠনটি গাজার মৃত্যুসংখ্যা নিয়ে জানায়, গতকাল ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানির সংখ্যা ২৭ হাজার অতিক্রম করেছে। গত ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ২৭ হাজার ১৯ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে ৬৬ হাজার ১৩৯ জন।
গণকবরের ঘটনায় প্রকাশিত বিবৃতিতে হামাস বলেছে, ‘ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে নব্য-নাৎসিরা এ জঘন্য অপরাধ ও দুষ্কর্মগুলো করেছে, যা একটি অভিশাপ হয়ে থাকবে এবং তাদের (ইসরায়েলিদের) তাড়িয়ে বেড়াবে। আধুনিক যুগে মানবিকতার সীমা ভয়ংকরভাবে লঙ্ঘন করেছে এবং এমন একদিন আসবে, যেদিন এর জন্য জবাব চাওয়া হবে।’
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজম বলেন, ‘লাশগুলোর অবস্থা পচনের শেষপর্যায়ে গিয়ে কঙ্কালে পরিণত হয়েছে; যে কারণে এগুলো শনাক্ত করার উপায়ও নেই।’
ফিলিস্তিনের মানবাধিকার আইনজীবী দিয়ানা বুট্টু গতকাল বলেন, ‘এ ঘটনা দেখিয়েছে কেন ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) নেওয়া হয়েছিল। এ গণকবরের সন্ধান পাওয়ার মধ্য দিয়ে পরিষ্কারভাবে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ উন্মোচিত হয়েছে।’
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, গত শুক্রবার আইসিজের ঘোষণায় বলা হয়, ইসরায়েল যেন গাজায় গণহত্যা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ বলছে, এই গণকবরের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে দখলদার ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা সংঘটিত করেছে।
গণকবরের আলোচনার মধ্যেই সবার নজর ফ্রান্সের আলোচনার দিকে। ফ্রান্সের প্যারিসে গাজা যুদ্ধবিরতি একটি আলোচনায় অংশ নেওয়া হামাস নেতারা বলেছেন, তারা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন। এ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত কথা নেই। একটি সূত্র জানিয়েছে, হামাস চায়, ইসরায়েল গাজা থেকে পরিপূর্ণভাবে সরে আসুক।
এদিকে লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। জাহাজটির নাম কেওআই। ইয়েমেনে হুতিদের ওপর ইঙ্গ-মার্কিন হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে হামলার সর্বশেষ ঘটনা এটি। আবার যুক্তরাষ্ট্রও গতকাল দাবি করে, তারা হুতি আস্তানায় হামলা চালিয়েছে।
এর আগে হুতিরা দাবি করে, তারা লোহিত সাগরে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজেও হামলা করেছে। ‘ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস গ্রেভলি’তে কয়েকটি নৌ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার দাবি তাদের। তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
গতকাল ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, হুতিদের ১০টি সামরিক ড্রোন, একটি জাহাজ ধ্বংসে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি ড্রোন নিয়ন্ত্রণ স্টেশন ধ্বংস করেছে মার্কিন বাহিনী।
গত ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাসের অতর্কিত হামলার জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। তার প্রায় এক মাস পর নভেম্বরে ইয়েমেনের ভূখণ্ডের অর্ধেক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালানোর ঘোষণা দেয়। গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে বলা হয়, গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এ কর্মসূচি নিয়েছে তারা। তারপর নভেম্বর-ডিসেম্বর দুই মাসে এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরে ৬০ বারেরও বেশি হামলা চালানোর পর গত জানুয়ারিতে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা দেয় মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনী।
