মেট্রোরেলের বগির ভেতর থেকে তাকিয়ে দেখছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে থামার পর একসাথে থাকা পাঁচজন তরুণ প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে উঠতে চাইছেন। চারজন কায়দা-কসরত করে উঠতে পারলেও পঞ্চমজন ওঠার আগেই দরজা বন্ধ হওয়া শুরু হলো। তরুণটি বিচলিত না হয়ে, স্মিত হেসে, চিৎকার করে বলে উঠল, গিয়ে দাঁড়াইস, দশ মিনিটেরই তো ব্যাপার!
দরজা লাগার পর ট্রেনটি চলা শুরু করতেই তরুণের মুখটা আবছা থেকে আবছাতর হতে লাগল আর আমি কেবল ওর বলা কথাটা ভাবছিলাম। যেই নিশ্চিন্তের স্বরে সে বন্ধুদের অপেক্ষা করতে বলল, আপাতভাবে এই কথাটা খুবই সাধারণ শোনালেও, এর মাঝে লুকিয়ে আছে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, নগর হয়ে ওঠা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে জনতার যে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, এর গভীর এক আখ্যান।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর জন্য এক নতুন বিস্ময়। উন্নয়নের অন্য অনেক মেগা প্রজেক্ট নিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন থাকলেও, এই নব আবির্ভাব ঢাকাবাসীর জন্য এক বিপুল স্বস্তি ও আশা হয়ে এসেছে। প্রাক্কলিত সময়ের চেয়ে অনেকটা পরে এবং সরকারি অর্থের হিসাবে পুরোপুরি স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, জনগণ আপাতত এর মোহে মুগ্ধ। প্রায় স্থবির হয়ে পড়া ট্রাফিকের শহরে মাত্র ৪০ মিনিটে শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাওয়ার নিশ্চয়তা শহরবাসীকে নতুন উদ্দীপনা দিচ্ছে। এর চেয়েও জরুরি, সেই তরুণের মতো নিশ্চয়তা দিচ্ছে।
আমাদের দেশে জনগণের আচরণ নিয়ে একটা ঋণাত্নক ধারণা আছে। পাবলিক ডাস্টবিনে ময়লা ফেলে না বলে রাস্তা নোংরা হয়, প্লাস্টিকের প্যাকেট যত্রতত্র ফেলে ফলে জলাবদ্ধতা হয়, আইন মানে না বলে ট্রাফিক জ্যাম হয়।
দীর্ঘদিনের প্রপাগান্ডায় অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠিত হলেও এর ঐতিহাসিক এবং বাস্তবিক কারণ পর্যালোচনা করলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
প্রায় দুইশ বছর ঔপনিবেশিক শাসন এবং এরপর ২৪ বছর স্বদেশেই 'ভিন্ন জাতি'র মানুষ হওয়ায় আমাদের দেশের মানুষ কখনো নাগরিক হিসেবে যে ট্রিটমেন্ট পাওয়ার কথা, তা পাননি। অনেকটা প্রজা হিসেবেই শোষিত হয়েছেন। নাগরিক অধিকারের অভাবে, স্বাভাবিকভাবেই নাগরিক সচেতনতাও গড়ে ওঠেনি। সরকারি সম্পত্তি, যা কিনা আদতে জনগণেরই সম্পদ, তা নিয়ে ব্রিটিশ আমলে আমাদের মানসিকতা ছিল- কোম্পানিকি মাল দরিয়ামে ডাল। কোম্পানির শাসনের পর দেশ স্বাধীন হলেও দরিয়াতে ছুড়ে দেওয়ার বদলে সরকারি সম্পত্তি কিভাবে তছরুপ করে নিজেদের আখের গোছানো যায় এই ছিল ক্ষমতায় থাকাদের অন্যতম লক্ষ্য।
আর প্রজা হয়ে থাকা জনতাকে এই বার্তা দেওয়া হয় যে, তুমি যে সুবিধা পাচ্ছ এইটা তোমার অধিকার না। সার্ভিস শব্দটার বাংলা যে সেবা হলো এই ব্যাপারটাই তো সমস্যাজনক। সেবা শুনলেই মনে হয় মুফতে পাওয়া কিছু, এর সঙ্গে একটা কোমল দানের ভাব, দয়া জড়িত। আদতে সার্ভিস মানে অর্থের বিনিময়ে বাধ্যগত প্রতিদান দেওয়া। কিন্তু, আমরা যারা লোকাল বাসে চাপি, যারা সরকারি সার্ভিস নিতে যাই, বা অন্য বেশির ভাগ সার্ভিসের বেলায় হেল্পার, অফিসারদের আচরণে মনে হয়, ব্যাটা এই যে দাঁড়ায়ে যেতে পারতেসিস এইতো বেশি। আমরা জায়গায় জায়গায় দাঁড়ায়ে পরি, নিয়ম না মানি, লাঞ্চ করতে যাওয়ার নাম করে ফেরত না আসি, কিংবা ফাইল নাড়াই (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘুষ নিয়ে) এতো তোদের কপাল। জনতাকে দয়া করে ‘সেবা’ দেওয়া হয়।
ফিরে আসা যাক নিশ্চয়তার কথায়। ওই যে তরুণটি নিশ্চিতভাবে জানে পরের ট্রেনটা ১০ মিনিট পরেই আসবে। লোকাল বাস হলে সে এইটা ভাবতে পারত? ট্রেন হলে? কিংবা বেশির ভাগ অন্যন্য সরকারি সার্ভিসের বেলায়? ভিআইপি যাবার জন্য যে শহরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা আটকে রাখা হয়, সেখানে সুযোগ পেলে লোকে ট্রাফিক আইন ভেঙে আগে যাওয়ার চেষ্টা করবেই। ক্ষমতাশালীরা যেখানে অবাধে খালবিল দখল করে ফেলে, বন, পাহাড় সাফ করে ফেলে, সেখানে দূরে গিয়ে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলার সংস্কৃতি আশা করা বৃথা। কোটি কোটি টাকা পাচার, ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণ করা যেখানে ক্ষমতার প্রতীক, সেখানে কর ফাঁকি দেওয়াই স্বাভাবিক। জঙ্গলে যেভাবে যেকোনো মূল্যে টিকে থাকাই নিয়ম। টিকতেই না পারলে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধের মতো ব্যাপারের অস্তিত্ব থাকে না।
কিন্তু, মেট্রোরেলে লাইন ধরে সুশৃঙ্খলভাবে টিকেট কাটা, নিয়ম মেনে ট্রেনে ওঠা, এমনকি পুরো রাস্তা দাঁড়িয়ে যাওয়াতেও জনতার সমস্যা হয় না। এই ছবিটাতে স্পষ্ট হয় যে, জনতা আইন মানে না এই আলাপটা সত্যের বিকৃতি। আইন মানার পরিস্থিতি থাকলে, নাগরিক হিসেবে সম্মান, জবাবদিহিতা এবং নিশ্চয়তা দেওয়াটা জনগণকে আইন মানায়। যেখানে সেগুলো ন্যূনতম প্রয়োগ করা হয়, জনগণ সেখানে ঠিকই দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।
দেখার বিষয়, মেট্রোরেলের এই নিয়মনিষ্ঠা, নিশ্চয়তা কদ্দিন টেকে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়, আশঙ্কা হয়, দুর্নীতির করালগ্রাসে যেকোনো ব্যবস্থাই বিষাক্ত হয়ে ওঠে। সেরকমটা হলে, লাইনে দাঁড়ানো সুনাগরিকেরা আবারও জান্তব আচরণে বাধ্য হবে।
কিন্তু, ওই যে তরুণের নিশ্চয়তা, নাগরিক হিসেবে সম্মানবোধ করা, এই ব্যাপারটা মেট্রো ছাপিয়ে আমাদের জানিয়ে দেয় যে, নাগরিককে তার উপযুক্ত সুবিধা দিলে, তার প্রাপ্য অধিকারটা দিলে সে জীবন দিয়ে তা আগলে রাখবে। সুনাগরিক হয়ে দেশকে আরও বেশি নিয়মানুবর্তী করবে।
সুব্যবস্থাই সুনাগরিক তৈরি করবে, উল্টোটার আশা করা কেবল অযৌক্তিক নয়, রাজনৈতিক অসততাও বটে।
