শিশুসাহিত্যে হাসনাত আমজাদ এক উজ্জ্বল নাম। প্রায় পাঁচ দশক ধরে শিশুদের জন্য লিখে চলেছেন ছড়া এবং শিশুতোষ গল্প। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি পুরস্কার ২০১৩’, ‘অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৩’, ‘দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ লেখক পুরস্কার ২০১৮’, ‘শিশুসাহিত্য সম্মাননা ২০২২’, ‘মীর মশাররফ হোসেন সাহিত্য পদক ২০২২’। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘চর্যাপদ সম্মাননা ২০১৭’, ‘আলোর ফুলকি সম্মাননা ২০২৩’, সোনারপুর কাব্যমঞ্চ, কলকাতা প্রদত্ত ‘শিউলি স্মৃতি স্মারক সম্মাননা ২০১৭’ ইত্যাদি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। শিশুসাহিত্য ও তার বর্তমান সাহিত্যচর্চা নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন মিঠাইয়ের।
প্রথম বই
আমার লেখালেখির শুরু সত্তর দশকের শেষার্ধে। শুরু অনেক আগে হলেও আমার প্রথম বই বের হয় অনেক বছর পর। এর কোনো সদুত্তর আমি কাউকেই এখনো দিতে পারি না। ২০১৩ সালের একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হয় আমার প্রথম ছড়া-কবিতাগ্রন্থ ‘মাঠের ছবি ঘাটের ছবি’। একুশের বইমেলাকে সামনে রেখেই আমার সেই বইটি প্রকাশিত হয়। ‘মাঠের ছবি ঘাটের ছবি’ প্রকাশের ব্যাপারে পাঁচজন মানুষের কাছে আমার অনেক ঋণ। সেই পাঁচজন হচ্ছেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক আবু হাসান শাহরিয়ার, শিশুসাহিত্যিক আশরাফুল আলম পিনটু, শিশুসাহিত্যিক ও প্রকাশক হুমায়ূন কবীর ঢালী, চিত্রশিল্পী ধ্রুব এষ আর চিত্রশিল্পী এমএ কাইউম। ছাত্রজীবনের বন্ধু আবু হাসান শাহরিয়ার আমার এই বইটির সব ছড়া-কবিতা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়ে লেখাগুলো সংশোধন করে দিয়েছিল, প্রুফ কারেকশন করেছিল। সেই সঙ্গে আমার ‘মাঠের ছবি ঘাটের ছবি’ বইটির নামকরণও তার দেওয়া। অনুজ লেখকবন্ধু আশরাফুল পিনটু বইটি প্রকাশে ভীষণ রকম সহযোগিতা করেছিল। প্রকাশনা সংস্থা বাংলাপ্রকাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ূন কবীর ঢালীর সঙ্গে যোগসাধন করে বইটি প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, চিত্রশিল্পী ধ্রুব এষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার বইটির প্রচ্ছদ আঁকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। আমার মনে আছে ধ্রুব এষ এই বইটির প্রচ্ছদের জন্য আমার কাছ থেকে কোনো সম্মানী নিয়েছিলেন না। রাজশাহীর প্রবীণ চিত্রশিল্পী এমএ কাইউম খুব স্বল্প খরচে অসুস্থ শরীর নিয়ে আমার বইটির চমৎকার ইলাস্ট্রেশন করে দিয়েছিলেন। প্রথম বই প্রকাশের আনন্দ আমি ২০১৩ সালের সেই বইমেলায় সব লেখকবন্ধুর সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। বন্ধুদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম আমার প্রথম বইয়ের সৌজন্য কপি। মূল্য দিতে চেয়েছিল অনেকেই, নিইনি। বইটির মোড়ক উন্মোচন হয়েছিল মেলাপ্রাঙ্গণে নজরুল মঞ্চে। মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন প্রবীণ শিশুসাহিত্যিক মাহমুদউল্লাহ। মাঠের ছবি ঘাটের ছবি আমাকে এনে দিয়েছিল দু-দুটি উল্লেখযোগ্য শিশুসাহিত্য পুরস্কার। একটি হচ্ছে অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি পুরস্কার আর অন্যটি হচ্ছে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার।
লেখালেখির শুরু
শুরুটা হয়েছিল স্কুলজীবনে। স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল আমার প্রথম গল্প। এরপর দীর্ঘদিন বিরতির পর আবার যখন নতুন করে সূত্রপাত হয় তখন ১৯৭৮ সাল। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমার নিজের শহর রাজশাহী। সে সময় রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হতো সরকারি জাতীয় পত্রিকা দৈনিক বার্তা। সেখানে প্রতি শুক্রবার বের হতো ছোটদের সাহিত্য পাতা ‘কিশোরকুঁড়ির মেলা’। তখন জমজমাট পত্রিকা দৈনিক বার্তা আর জমজমাট পাতা কিশোরকুঁড়ির মেলা। জমজমাট শিশুকিশোর সংগঠনও ছিল কিশোরকুঁড়ির মেলা, যার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। কিশোরকুঁড়ির মেলার সাধারণ সম্পাদক ছিল সে সময়ের অন্যতম ছড়াকার সৈয়দ নাজাত হোসেন। সারা দেশের শিশুসাহিত্যের অঙ্গনে তখন তার ব্যাপক পরিচিতি, যা আমাকে খুব আকর্ষণ করে। মূলত সৈয়দ নাজাত হোসেনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির কারণেই আমার ছড়া তথা শিশুসাহিত্য চর্চার প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। সে আমাকে এ ব্যাপারে বিভিন্নরকম সহযোগিতা করে। কিশোরকুঁড়ির মেলা পাতায় ছাপা হয় আমার প্রথম ছড়া শীতবুড়ি। এরপর নিয়মিত লেখা শুরু করি কিশোর বাংলা, মাসিক শিশু, সাত ভাই চম্পা, খেলাঘর, কচি কাঁচার আসরসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও জাতীয় দৈনিকের শিশুদের পাতায়।
আপনার কাছে শিশুসাহিত্য
শিশু কারা? প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ভূমিষ্ঠকালীন ব্যক্তির প্রাথমিক রূপ হচ্ছে শিশু, যে এখনো যৌবনপ্রাপ্ত হয়নি। যে ছেলে বা মেয়ের বয়স ১৮ বছরের নিচে তাকেই শিশু বলা হচ্ছে। তাহলে কিশোর কারা? এখানে স্পষ্ট করে উল্লেখ না থাকলেও আমরা স্বাভাবিক চিন্তা থেকে বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত অনুযায়ী ধরে নিতে পারি, ১০ বছরের নিচে যে ছেলে বা মেয়ে সে শিশু। তাহলে শিশুদের জন্য উপযোগী যে সাহিত্য তা-ই হচ্ছে শিশুসাহিত্য, যার প্রধান উপাদান হচ্ছে ছড়া, রূপকথা, তাদের ভালোলাগা বিভিন্ন গল্প ইত্যাদি। ছড়া কী? এটি সাহিত্যের একটি প্রাচীন শাখা। ছড় অর্থ বেহালা, এসরাজ ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজাবার জন্য ব্যবহৃত লম্বা সরু তারযুক্ত দ-বিশেষ। বাজনার তাল, লয় বা ছন্দ সৃষ্টির এই ছড়া থেকে ছড়া নামটির উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন। ছড়া সাধারণত স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত হয়ে থাকে। তবে মাত্রাবৃত্তেও ছড়া রচনা করেছেন অনেকে। ছড়া মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত ঝংকারময় পদ্য। ছড়ায় ছন্দের বিশেষ এক রকম দুলুনি আছে, বক্তব্যের স্পষ্টতা আছে। লাইনগুলো ছোট ছোট। নিজস্ব বাকভঙ্গি আছে। ছড়া হলো মিউজিক বা কার্টুনের মতো। সুরের দ্যোতনা আছে। পড়লে মজা লাগে। এতে হালকা বা চটুল চাল থাকবে।
কিশোর বয়স বলতে আমরা ধরি, ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সের ছেলে বা মেয়ে একজন কিশোর। তাহলে কিশোর বয়সের উপযোগী করে যে সাহিত্য রচনা করা হয় সেটাকেই কিশোরসাহিত্য বলে মেনে নিতে হবে। বয়সজনিত কারণেই ঠিক শিশুতোষ ছড়া বা গল্প এরা পছন্দ করে না। তাদের পছন্দ একটু ওপরে। সায়েন্স ফিকশন, রহস্যগল্প এবং ছোটদের ছড়া ও বড়দের কবিতার মাঝামাঝি কিছু একটা এদের চাওয়া। কিশোরকবিতার নামকরণ প্রধানত সত্তর দশকের মাঝামাঝি। এর আগে এই জাতীয় কবিতা লেখা হয়েছে, তবে তাকে বলা হতো ছোটদের কবিতা। বাংলা কবিতার আদিরূপ চর্যাপদের অনুসারী হয়ে ছন্দ ও অন্ত্যমিলকে ধারণ করে চলেছে কিশোরকবিতা। কিশোরকবিতা এমন যাকে ঠিক ছড়া বলা যাবে না। এখানে কিছুটা কাব্যময়তা আছে। রচনারীতি ও প্রকাশভঙ্গিতে আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। গতি ঠিক ছড়ার মতো দ্রুত নয়, কিছুটা ধীর। কিশোরকবিতায় শিল্পিত সরলতা থাকবে, একেবারে তরল নয়। বেশিরভাগ কিশোরকবিতা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা। তবে স্বরবৃত্তেও প্রচুর কিশোরকবিতা আছে।
শিশুসাহিত্য একজন অভিভাবকের নিজে পড়া এবং শিশুদের পড়ে শোনানো দুটোর জন্যই বলে আমার বিশ্বাস। শেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। শিশুসাহিত্যে এমন অনেক শিক্ষণীয় মেসেজ থাকে, যা থেকে একজন অভিভাবক অনেক কিছু নিজেও শিখতে পারে; পাশাপাশি তার শিশুকেও শেখাতে পারে। এ জন্যই বলা হয়ে থাকে- শিশুসাহিত্য শিশু ও বড় সবার জন্য, কিন্তু বড়দের সাহিত্য শুধু বড়দের জন্য, শিশুদের জন্য নয়।
নিজের স্বাচ্ছন্দ্য নাকি পাঠকের (শিশুদের) চাওয়া
মূলত ছড়া-কবিতাতেই আমি খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মাথার মধ্যে গল্পের চেয়ে ছড়া-কবিতার প্লটই বেশি ঘুরপাক খায়। গল্পের তুলনায় ছড়া-কবিতাই লিখেছি বেশি। লেখার ক্ষেত্রে আমি এমন কিছু বিষয় সবসময় বেছে নিই, যা পাঠকদের ভালো লাগবে এবং সেখান থেকে তারা কিছু মেসেজ পাবে। নিছক বিনোদনের জন্য আমার খুব কম লেখাই রয়েছে। আর তাই তো পাঠকের পছন্দ-অপছন্দকে আমি বরাবরই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
এবারের বইমেলা
বই প্রকাশের বিষয়ে আমার একটু ভিন্নতর কিছু চিন্তাভাবনা রয়েছে, যা সবার সঙ্গে নাও মিলতে পারে। সারা বছর আমি যা লিখি তার সবই আমি বইয়ে গ্রন্থিত করার পক্ষপাতী নই। বাছাই করা লেখাগুলোই আমি সবসময় গ্রন্থিত করার চেষ্টা করি। এ জন্য আমার প্রচুর অগ্রন্থিত লেখা রয়ে গেছে, যা হয়তোবা কখনো গ্রন্থভুক্ত হবে না। আমার গ্রন্থসংখ্যা খুব বেশি নয়। মাত্র ১৩টি। তন্মধ্যে ১২টি ছড়া-কবিতাগ্রন্থ আর একটি কিশোর গল্পগ্রন্থ। ২০২৪-এর বইমেলায় আসছে আমার ছড়া-কবিতার বই ‘একখানা বই রঙিন মলাট’। পাঁচ ফর্মার চাররঙা এই বইটি প্রকাশ করছে জিনিয়াস পাবলিকেশন্স। বইমেলায় তাদের প্যাভিলিয়ন নং-৩। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন শিল্পী রজত। মেলার প্রথম সপ্তাহে না হলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে পাঠকদের হাতে বইটি তুলে দিতে পারব আশা করছি।
