গতিহীন মাদক মামলা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৪৫ এএম

চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, ধর্ষণ, অপহরণ, খুন, জখম ইত্যাদি বিষয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে যখন কোনো মামলা দায়ের করা হয়, তখন সেটি হয়ে যায়- ফৌজদারি মামলা। কিন্তু মাদক মামলার বিচার হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে।  মাদকের পরিমাণ এবং ওজন অনুযায়ী মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন সাজাসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থাও রয়েছে। যদিও তার সাজা ২ বছরের বেশি নয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯ ধারা লঙ্ঘনে কী ধরনের সাজার বিধান রয়েছে, সে সম্পর্কে আইনের ৩৬ ধারায় বিশদ বলা হয়েছে। আইনের পঞ্চম অধ্যায়ে বলা হচ্ছে- ‘কোনো ব্যক্তি কোনো মাদকদ্রব্য অপরাধ সংঘটনে কাহাকেও প্ররোচিত করিলে অথবা সাহায্য করিলে অথবা কাহারও সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইলে অথবা এতদুদ্দেশ্যে কোনো উদ্যোগ অথবা প্রচেষ্টা গ্রহণ করিলে, মাদকদ্রব্য অপরাধ সংঘটিত হউক অথবা না হউক, তিনি সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের অনুরূপ দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’ ৩ বছর আগে একটি মাদক মামলার রায়ে ৩০ পিস ইয়াবার মামলায় এক আসামিকে বই পড়া, সিনেমা দেখা ও বৃক্ষরোপণ করার সাজা দিয়েছিলেন ঢাকার একটি আদালত। এরপর তার আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

মামলা হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছে, আসামিকে জেলে পাঠানো হচ্ছে। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করলেও, সাক্ষীর অভাবে আসামিরা অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পাচ্ছে। ফলে বিচারের আগেই সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে মামলা। দেখা যাচ্ছে, ফৌজদারি মামলার ২২% মাদক আইনে করা হচ্ছে। অনেকটা বিনা-বিচারে খালাস পেয়েই আসামিরা ফের সক্রিয় হচ্ছে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শনিবার ‘ফৌজদারি মামলার ২২% মাদকের’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে- গত কয়েক বছরে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে নানা মহল উদ্বিগ্ন। বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষীর গরহাজিরায় মাদক মামলার অর্ধেক বা তার বেশি আসামি খালাস পাওয়ায় হতাশাও আছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত তদন্ত, সাক্ষীর গরহাজিরা প্রভৃতি এড়ানো গেলে মাদক মামলায় গতি আসবে, সাজার হারও বাড়বে।

সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্য (গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) অনুযায়ী, অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন বা অনিষ্পন্ন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ২১ লাখ ৬৪ হাজার। বিচারাধীন মাদক মামলার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৮। বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার ২১ দশমিক ৯২ শতাংশই মাদক-সংক্রান্ত। প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৩-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮১০টি অভিযান চালিয়েছে। মামলা করেছে ২ লাখ ১০ হাজার ৯৫২টি। এসবের আসামি ২ লাখ ২৬ হাজার ২৮ জন। সাক্ষীদের অনীহা, জব্দ তালিকা প্রস্তুতে গরমিল, এজাহার ও তদন্তে ত্রুটিসহ নানা কারণে অধিকাংশ মাদক মামলার আসামিই খালাস পেয়ে যাচ্ছে। তারা আইনি নানা ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এসে আবারও জড়াচ্ছে মাদক কারবারে। প্রশ্ন হচ্ছে, মামলার এজাহার এবং তদন্তে কেন ত্রুটি থাকবে? আবার ত্রুটি না থাকলেও, অপরাধীর যদি শাস্তিও হয় তাহলে তা অনেকটাই তুলনামূলকভাবে কম যন্ত্রণার। একদিকে আসামিদের খালাস অন্যদিকে লঘু শাস্তি এই দুই কারণেই দেশে দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে মাদক। যতই বলি, মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের কথা আইনের এমন অবস্থায় কোনোদিনই তা সম্ভব নয়। যদি সত্যিকার অর্থেই আমরা মাদকমুক্ত সমাজ চাই তাহলে প্রথমেই মাদকের সহজপ্রাপ্যতা বন্ধ করতে হবে। এরপর আইনে শাস্তির বিধান পরিবর্তন করে আরও কঠিন করতে হবে। একইসঙ্গে প্রমাণিত অপরাধীকে জেলজীবনে শাস্তির কঠোরতা বাড়াতে হবে।

সুস্থ ও সক্ষম ব্যক্তির সমস্ত অপরাধই মানসিক। কে, কোন পরিস্থিতিতে, কী ধরনের অপরাধে নিজেকে জড়াবেন তা একান্তই নিজস্ব। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মানসিকতার কেউ যদি বলেন তিনি অসচেতনভাবে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন  তখন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যে কারণে মাদক আসামিদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সহানুভূতি না দেখিয়ে, তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আর এই পরিবর্তন যতদিন না হবে, ততদিন সমাজে মাদকের থাবা ক্রমান্বয়ে বিস্তার লাভ করবে। এই কারণেই অপরাধীকে চিহ্নিত করে, এই চরিত্রের ফৌজদারি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত