হিজড়ারা কেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:২৩ এএম

ট্রাফিক সিগন্যালে হিজড়াদের হাত পাতার দৃশ্য আমাদের চেনা। বাসে উঠে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে তারা টাকা চায়। অনেকে তাদের ভয় পায়। আবার কোনো বাড়িতে সদ্যোজাত শিশু থাকলে সেখানে হিজড়ারা দল বেঁধে অতর্কিত হাজির হয়ে নাচ-গান করে টাকা আদায়ের খবরও প্রায়ই শোনা যায়। বিষয়গুলো অনেক সময়ই বিরক্তির উদ্বেগ করে। তাদের বিশেষ ভঙ্গিতে চলা, কথা বলা মানতে চান না অনেকে। কিন্তু আমরা কী ভাবতে পারি, একজন হিজড়া হতে পারেন এই সমাজের বিত্তশালী পরিবারের সন্তান? সব কিছু ঠিক থাকলে তার হয়তো পরিবার থাকত। উচ্চশিক্ষার অধিকারী হতে পারত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সে হিজড়া বলে পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারেনি, সমাজ তাকে আলাদা করে ফেলেছে। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের ট্র্যাফিক সিগন্যালে দাঁড়াতে হয়েছে কিংবা জোরপূর্বক টাকা তুলতে হচ্ছে। হয়তো সিগন্যালে বাবা, মা, ভাই কিংবা বোনের কাছেই হাত পাতছে ওই হিজড়া ব্যক্তিটি। কিন্তু কেউ কাউকে চেনেন না, কারণ শিশুকালে বাড়ি ছেড়ে আসা ব্যক্তিটি আজ পরিণত হিজড়া, তাকে চিনবে কীভাবে! এমনও হয়, পরিণত হিজড়া তার মা কিংবা বাবাকে চিনতে পেরে শাড়ির আঁচলে চোখের জলে মুছে। অথবা বাবা-মা তাকে চিনতে পেরেও না চেনার ভান করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। 

পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রতিটি হিজড়ার ছোটবেলার গল্প প্রায় এক ও অভিন্ন। পরিবার বা সমাজ তার পরিচয় দিতে চায় না বলে অবহেলা সইতে না পেরে আশ্রয় নেয় গুরুমার কাছে, তারই সমগোত্রীদের মাঝে। প্রায় একই ভোগান্তির ভেতর দিয়ে আসা সমগোত্রীরাও তাকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়। একটি শিশু যখন জন্মায় সে মানুষ হিসেবেই জন্ম নেয়। প্রথম পরিচয় সে একজন মানুষ, তারপর সে ছেলে বা মেয়ে। পরিবার তাকে সাদরে গ্রহণ করে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বাইরে অন্য কিছু বা ভিন্ন হতে পারে। শিশুটির বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার এই ভিন্নতা মা-বাবার দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু শিশুটি তখনো জানে না যে, সে নারী বা পুরুষের মতো না। বয়স বাড়তে থাকে। পরিবার, সমাজ, বন্ধুবান্ধব তাকে অন্য চোখে দেখতে থাকে। সে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারে না। স্কুলে যেতে পারে না। এভাবে পরিবার সমাজ থেকে নিগৃহীত হতে হতে বয়স বাড়ে। এক সময় সে তার অতি আপন পরিবার ও সমাজ থেকে পালিয়ে বেড়াতে চায়। পরিচয় সংকট ও ভোগান্তির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে সে একসময় জানতে পারে যে, মানুষ হিসেবে তার লৈঙ্গিক পরিচয় হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ।

ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুসারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ জন, নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী ১২ হাজার ৬২৯ জন। বেসরকারি হিসাবে প্রায় ১৫ হাজার হিজড়া জনগোষ্ঠী রয়েছে দেশে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করারলক্ষ্যে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে

তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তাতে হিজড়াদের জীবনমানের খুব একটা উন্নতি হয়নি, সেই আগের মতোই  অবহেলিত জীবনযাপন করছে। সম্প্রতি সপ্তম শ্রেণির বইয়ে শরীফ থেকে শরীফার গল্প নিয়ে একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের খ-কালীন শিক্ষকের প্রতিবাদ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়াদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে নানা মত এখন চাউর হচ্ছে। ওই চাউরে যেতে চাই না। তবে একটি কাজ কিন্তু হয়েছে, সেটা হলো সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাদের চাওয়া-পাওয়া, সুখ, দুঃখ এবং অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একটি শিশুর জন্ম নেওয়ার ক্ষেত্রে তার কোনো হাত থাকে না। আর দশজন মানুষের মতোই সে পৃথিবীতে আসে। তবে শিশুটির শারীরিক গঠন নারী-পুরুষের ব্যতিক্রম হলেই সে হয়ে যাবে উচ্ছিষ্ট, তা খুবই অযৌক্তিক। লোকলজ্জার কারণে জন্মদাতা মাতা-পিতার কাছে সন্তানের স্বীকৃতি না পাওয়ার চেয়ে অমানবিকতা আর কী হতে পারে! তাদের যে অবহেলার শিকার হতে হয়, তা অনেকাংশেই তাদের পরিচয়ের সামাজিক স্বীকৃতি থাকলে হতে হতো না। পরিবারের সঙ্গে থেকেই তারা এই সমাজে আর দশজন সাধারণ বা নারী-পুরুষের মতো অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু সমাজে অংশগ্রহণের আগে তাদের লড়তে হয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। এটা সামাজিক অসংবেদনশীলতারও বহিঃপ্রকাশ। একটা সংবেদনশীল সমাজ বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষের স্বীকৃতি দিয়ে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যায়। আমাদের সমাজে এক সময় মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধীদেরও অবহেলার চোখে বিচার করত, যার প্রভাব পড়ত পরিবারে। ফলে পরিবারেও তারা নিগৃহীত হতো। কিন্তু সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আজ তারা পরিবারের সঙ্গে থাকার কারণে এবং নানা ধরনের সামাজিক উদ্যোগের কারণে প্রতিবন্ধীরা অনেক প্রতিবন্ধকতা জয় করেছে।

এ ক্ষেত্রে হিজড়াদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা থাকার পরও কেবল লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে তাদের কেন বাড়ি ছাড়তে হবে? পারিবারিক বা সমাজিক অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হতে হবে? যেখানে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এবং তারা লিঙ্গ পরিচয়ের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষের বাইরে নিজেদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বা ‘হিজড়া’ লেখার সুযোগ পেয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে হিজড়াদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নাগরিকত্বের সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট করার বাধা দূর হয়েছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে সংবিধান স্বীকৃত কিছু আইনি অধিকার পেলেও এখনো সম্পত্তিতে হিজড়াদের উত্তরাধিকারের বিধান নেই। ১৯৬১ সালের মুসলিম উত্তরাধিকার আইন বাংলাদেশে কার্যকর রয়েছে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে সন্তানদের কথা বলা হয়েছে। সন্তান মানে পুত্র এবং কন্যারা সম্পত্তির ভাগ পাবেন। বাংলাদেশে বিদ্যমান এই আইনে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের ব্যাপারে সুস্পষ্ট করে বলা  নেই। তবে বিভিন্ন দেশে ইসলামী আইনবিশারদরা হিজড়া সন্তানদের সম্পত্তির ভাগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং অনেক দেশে তা অনুসরণও করা হয়। যেমন, পাকিস্তানের একটা প্রদেশে ইসলামী আইনবিশারদরা গবেষণা করে একটা ফতোয়া দিয়েছেন, যে হিজড়া সন্তানদের মধ্যে যাদের পুরুষ ভাবটা প্রবল, তাদের পুরুষ সন্তান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর যাদের মাঝে নারীর স্বভাব বেশি, তাদের কন্যাসন্তান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এমন লক্ষণ বিবেচনা করে উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তির ভাগ যেন হয় সেখানে।

হিন্দু ধর্মাবলম্বী, খ্রিস্টান এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে কিছু বিধি বাংলাদেশে কার্যকর রয়েছে। কিন্তু সেসব ধর্মেও হিজড়াদের সম্পত্তির অধিকারের ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলা নেই।

হিজড়াদের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের পাশাপাশি সামাজিক ও চিকিৎসার জন্য একটি হিজড়া কল্যাণ বোর্ড গঠন করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। হিজড়াদের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে সিলেটের বাসিন্দা ও জাতীয় মানবকল্যাণ পদকপ্রাপ্ত মো. আবদুল জব্বার জলিল গত বছর মার্চে রিটটি করেন। রিটকারী যুক্তি দেখিয়েছেন, হিজড়া সম্প্রদায়ের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত হলে তারা সমাজে নাজুক হিসেবে গণ্য হবে না, এমনকি দেশের যে কোনো জনসমাগমস্থলে তারা উপদ্রবে জড়িয়ে পড়বে না। 

সম্পত্তির অধিকার ছাড়াও যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনায় আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও নেই হিজড়াদের। কারণ নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ এবং ধর্ষণ চেষ্টার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে বিচারের ব্যবস্থা থাকলেও হিজড়াদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিচারের ব্যবস্থা নেই। অথচ এই হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনে শিকার হতে হয়। যেহেতু সমাজে তাদের অন্যভাবে দেখে, তাই তাদের ওপর কোনো নির্যাতনে সহায়তা তারা পায় না। সমাজে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট নয় বলে কেউ তাদের কাজে নিতে চায় না। তাই বাধ্য হয়েই তারা ভিক্ষাবৃত্তিতে নামে।

২০২০ সালের শেষ দিকে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন। এরই আলোকে তাদের জন্য ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে হিজড়া ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও পরিচয়পত্র প্রদান, ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের দুস্থ ও অসচ্ছল হিজড়া ব্যক্তিকে মাসিক ৬০০ টাকা হারে বিশেষ ভাতা প্রদান, হিজড়া শিক্ষার্থীদের মাসিক হারে প্রাথমিক স্তরে ৭০০ টাকা, মাধ্যমিক স্তরে ৮০০ টাকা, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ১০০০ টাকা এবং উচ্চতর স্তরে ১ হাজার ২০০ টাকা হারে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান, কর্মক্ষম হিজড়া ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ প্রদান, আর্থিক অনুদান প্রদান ও আয়বর্ধক কাজে নিয়োজিতকরণ এবং  প্রশিক্ষণোত্তর এককালীন নগদ সহায়তা হিসেবে ১০ হাজার টাকা প্রদান। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে এ কর্মসূচির আওতায় ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তির নগদ সহায়তায় জিটুপি পদ্ধতিতে উপকার ভোগীর মোবাইল হিসেবে প্রেরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বেসরকারি উদ্যোগেও হিজড়াদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনে কিছু কাজ হচ্ছে। বিউটি পার্লারসহ কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। কেউ কেউ উদ্যোক্তা হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করছেন। এসব প্রচেষ্টা সফল করতে সামাজিক ও পারিবারিক স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, আর দশটা মানুষের মতো জীবনযাপনের সুযোগ দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির কারণে সম্প্রতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুজন তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এগুলো সমাজের ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং হিজড়াদের সম্পর্কে সমাজের সার্বিক ধারণা বদলে ভূমিকা রাখবে।

হিজড়া মানে যৌন কর্মী না, হিজড়া মানে ভিক্ষুক না। হিজড়া মানে সমাজের নিগৃহীত একজন মানুষ। তাকে মানুষের মতো করে বাঁচতে দিতে হবে। তাকে তার প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে। আর এ জন্য পাঠ্যবইয়ে যদি হিজড়াদের পরিচয় তুলে ধরা হয় তবে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই তাকে নারী, পুরুষের মতো আরেকজন হিসেবে চিনতে শিখবে। ভুলভাবে শিখে হিজড়াদের আলাদা করে দেখবে না, ভয় পাবে না, অস্পৃশ্যও মনে করবে না। তাদের সমাজের অংশ হিসেবেই চিনবে। পরিবারগুলোও লোকলজ্জার ভয়ে হিজড়া সন্তানকে লুকিয়ে রাখবে না, অস্বীকার করবে না।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত