ব্রেন চিপের বিপদ-আপদ

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:২৮ এএম

মস্তিষ্কে চিপ বসানোর যুগান্তকারী আবিষ্কার ঘটেছে ইলন মাস্কের উদ্যোগে। তবে এ চিপ মানবজীবনের ক্ষতি করবে না উপকার, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

মানুষের মস্তিষ্ককে বলা হয়ে থাকে তা আকাশের চেয়েও বিশাল। এ কথার অর্থ হলো, আকাশের যত গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে, মানবমস্তিষ্ক তারচেয়েও বেশি ধারণ করতে সক্ষম। তবে সেই মস্তিষ্কেরও সীমাবদ্ধতা আছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মস্তিষ্ক অকেজো হয়ে গেলে শরীরের বিভিন্ন অংশ কাজ করতে পারে না। বিজ্ঞানীরা নানাভাবে এ দশা থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সম্প্রতি সে সাফল্য ধরা দিয়েছে। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক মানুষের মস্তিষ্কে প্রথমবারের মতো ব্রেন চিপ যুক্ত করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিউরালিংক ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসের (বিসিআই) মাধ্যমে বিপ্লব ঘটাতে শুরু করেছে। বিসিআইগুলো মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড এবং বিশ্লেষণ করে। এ চিপের মাধ্যমে গুরুতর পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি নিজেই বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

সবকিছু গোপন

চিপ বসানোর খবরটি শুধু ইলন মাস্ক থেকেই জানা যায়। তিনি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম এক্স-এ পোস্ট করে বলেছিলেন, একজনের মস্তিষ্কে নিউরালিংক বসানো হয়েছে এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক ফলাফল খুবই ভালো এবং নিউরনের স্পাইকগুলো ভালোভাবে নজর রাখছে এই চিপ।

স্নায়ুপ্রযুক্তির গবেষকরা নিউরালিংকের মানব পরীক্ষা বিষয়ে উত্তেজিত। নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার উট্রেখটের স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক বিসিআই সোসাইটির সভাপতি মারিস্কা ভ্যানস্টিনসেল বলেন, আমি যা দেখতে চাই তা হলো এটি নিরাপদ এবং এটি মস্তিষ্কের সংকেত পরিমাপের ক্ষেত্রে কার্যকর এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দীর্ঘমেয়াদি।

নেচার ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়, মস্তিষ্কে এ চিপ বসানো সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যের অভাব রয়েছে। ইলন মাস্কের টুইটের বাইরে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা জানেন না, কোথায়, কার মস্তিষ্কে এ চিপ বসানো হয়েছে। এরপর এ পরীক্ষার ফলাফল কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে সে বিষয়েও কিছু জানা যায় না।

নিরীক্ষাটি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্যভান্ডারে নিবন্ধিত নয়। নিউরালিংক কেন তাদের ট্রায়াল নিবন্ধন করেনি সে বিষয়ে কাউকে কিছু জানায়ওনি।

সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, নিউরালিংকের এ ডিভাইসকে ‘লিঙ্ক’ বলা হয়। এটি প্রায় পাঁচটি মুদ্রার আকারের। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিভাইসটি মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে স্থাপন করা হয়।

কীভাবে কাজ করবে

অন্যান্য ব্রেন চিপের সঙ্গে নিউরালিংক আবিষ্কৃত চিপের কিছু পার্থক্য আছে। যুক্তরাষ্ট্রে যারা ব্রেন চিপ নিয়ে কাজ করছে তারা মস্তিষ্কের উপরিভাগে তা বসানোর প্রযুক্তি আবিষ্কার করে। তারা সাধারণত মস্তিষ্ক থেকে আসা অসংখ্য সংকেত একসঙ্গে ব্যাখ্যা করত। তবে নিউরালিংক তাদের চিপ বসিয়েছে মস্তিষ্কের ভেতরেই। তারা আলাদাভাবে স্নায়ুর বিভিন্ন সংকেত পাঠ করতে সক্ষম। তাদের ব্রেন চিপ দিয়ে স্মার্টফোন পরিচালনা করা যাবে।

কোম্পানির ব্রোশার অনুসারে, নিউরালিংক চিপে ৬৪টি নমনীয় পলিমার থ্রেড রয়েছে, যা মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করার জন্য ১০২৪টি ক্ষেত্র তৈরি করে। নিউরালিংক ডিভাইস মস্তিষ্কে যোগাযোগের ব্যান্ডউইথ বাড়াতে পারে। নিউরালিংক দাবি করছে যে, তারা এ চিপ মস্তিষ্কে বসানোর জন্য রোবট তৈরি করছে।

নিউরালিংক তার পরীক্ষার বিষয়ে সামান্য তথ্য প্রকাশ করার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে ওই গবেষণা এবং ব্যক্তির নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকবে। গবেষণায় জড়িত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন চিপ বসানোর পর স্ট্রোক হয়নি, রক্তপাত ঘটেনি এবং রক্তনালিরও কোনো ক্ষতি ঘটেনি। সংক্রমণ বোঝার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে তাকে। নিউরালিংকের ব্রোশিওর বলছে, স্বেচ্ছায় চিপ বসাতে যারা রাজি হবেন তাদের পাঁচ বছরের জন্য অনুসরণ করা হবে। তাদের সপ্তাহে কমপক্ষে দুবার কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হবে। তাদের অভিজ্ঞতার ওপর পর্যালোচনা হবে।

এর আগে বানরের মস্তিষ্কে পরীক্ষার সময় জানা যায়, নিউরালিংকের চিপগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে এগুলো মস্তিষ্কের সংকেতগুলোকে যথাযথভাবে ব্লুটুথের মাধ্যমে সংযুক্ত ডিভাইসে পাঠানো যায়। ইলন মাস্ক নিউরালিংক প্রতিষ্ঠা করেন ২০১৬ সালে। তিনি মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করে দৃষ্টি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা, বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, স্থূলতা ও শরীরিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে আসছেন। তবে ওই গবেষণায় কয়েকটি বানরের মৃত্যু হয়।

ডেইলি মেল জানায়, নিউরালিংকের তথ্যমতে, ‘সেলাই-মেশিনের মতো’ রোবটের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এ চিপ যুক্ত করা হয়। রোবটটি মাথার খুলির একটি ছোট অংশ সরিয়ে সুতার মতো ইলেক্টরোডগুলোকে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। এরপর ওই ছিদ্র সেলাই করে দেয়। তখন খুলির ওপর শুধু একটি দাগ অবশিষ্ট থাকে।

মাস্ক বলেছেন, এ পদ্ধতিটি মাত্র ৩০ মিনিট সময় নেয়। সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়ার প্রয়োজন হয় না এবং রোগী একই দিনে বাড়ি ফিরে যেতে সক্ষম।

মস্তিষ্কে নিউরন নামক বিশেষ কোষ থাকে, যা আমাদের পেশি এবং স্নায়ুর মতো শরীরের অন্যান্য কোষে সংকেত প্রেরণ করে। নিউরালিংক চিপের ইলেক্টরোডগুলো এই সংকেতগুলো পড়তে সক্ষম হয়। এটি বাহ্যিক প্রযুক্তি, যেমন কম্পিউটার বা স্মার্টফোন, বা পেশি আন্দোলনের মতো শারীরিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

মাস্ক বলেছেন, এটি একটি স্মার্টওয়াচ দিয়ে মাথার খুলির টুকরা প্রতিস্থাপন করার মতো।

নিউরালিংক

উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, নিউরালিংক একটি মার্কিন স্নায়ু-প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান। যেটি ইলন মাস্ক এবং সাত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর একটি দল নিয়ে প্রতিষ্ঠিতি। নিউরালিংক ২০১৬ সালে চালু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে, কোম্পানিটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ কিছু উচ্চপদস্থ স্নায়ুবিজ্ঞানী নিয়োগ করেছে। ২০১৯ সালে এটি ১৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল পায়। যার মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ছিল মাস্কের। সেই সময়ে নিউরালিংক ঘোষণা করে তারা একটি ডিভাইস নিয়ে কাজ করছে, যা মস্তিষ্কে স্থাপন করতে তারা সক্ষম হবে।

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা দ্য ওয়াল জানায়, নিউরালিংকের এ গবেষণায় সহযোগিতা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রোজেক্ট এজেন্সি। এ গবেষণায় জড়িত জাস্টিন স্যানচেজ জানান, বিশ^ জুড়ে ২ লাখের বেশি মানুষ মস্তিষ্কের রোগে ভোগেন। ‘অ্যাংজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেসন অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা’ তাদের এক গবেষণায় জানায়, অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকে ‘জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার’ হয়।

প্রতি বছর বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ এই রোগে ভোগে। এ ডিসঅর্ডার ছয় মাসের বেশিও স্থায়ী হয়। তখন তাকে ক্রনিক ডিসঅর্ডার বলে। তা ছাড়া ‘অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার’ কম বয়সীদের একটি বড় সমস্যা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্বেগ থেকে ফোবিয়া বা আতঙ্ক তৈরি হয়। যার থেকে উৎকণ্ঠা বাড়ে। ‘প্যানিক ডিসঅর্ডার’-এ আক্রান্ত হয় রোগী। ওষুধে এ রোগ সারে না। দীর্ঘদিন কাউন্সেলিং করাতে হয়। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো রোগ অনেক সময় কাউন্সেলিংয়েও পুরোপুরি যায় না। মস্তিষ্কের চিপ সেখানে উপকারী হয়ে উঠতে পারে।

তারা জানায়, নিউরালিংকের গবেষকদের দাবি, এই ডিভাইস তৈরি হয়েছে ছোট ইলেকট্রোড দিয়ে। তার মধ্যে এমন প্রোব আছে, যা সহজেই মস্তিষ্কের কোষে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। এ ডিভাইস মস্তিষ্কের ভেতরে কোনো ক্ষতি করবে না বা এর প্রতিক্রিয়াও দেখা যাবে না। মস্তিষ্কের কোষে প্রতিস্থাপন করলে এই যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে সারাতে পারবে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ক্রিয়া ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে। ব্রেন সার্জারির মতো ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের দরকার পড়বে না।

বিপদ

মাস্ক জানিয়েছেন, নিউরালিংক এমন ব্যক্তিদের সহায়তা করবে, যাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিকভাবে কাজ করে না। এ ধরনের ব্যক্তি নয়া প্রযুক্তির সাহায্যে মস্তিষ্কে যে কোনো দৃশ্যকল্প কল্পনা করে মোবাইল বা কম্পিউটার পরিচালনা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মাস্ক বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের কথা উল্লেখ করেন।

যখন প্রযুক্তিটি বিকাশের পরিকল্পনা প্রথম প্রকাশ করা হয়েছিল, তখন ফার্মটি এটিকে একটি উপায় হিসেবে স্থাপন করেছিল, যাতে কোয়াড্রিপ্লিজিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের মন দিয়ে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মতো প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।

২০২০ সালের এক প্রদর্শনীতে, মাস্ক এমন এক ‘টেলিপ্যাথি’র প্রতি ইঙ্গিত করেন, যা দুই ব্যক্তিকে প্রযুক্তির সাহায্যে যোগাযোগ করতে দেবে। তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে আপনি স্মৃতি সংরক্ষণ করতে এবং পুনরায় ব্যবহারে সক্ষম হবেন। আপনি মূলত আপনার স্মৃতিগুলোকে ব্যাকআপ হিসেবে সংরক্ষণ করতে পারেন এবং স্মৃতিগুলো পুনরুদ্ধার করতে পারেন। একই বছর, তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, চিপটি মানুষকে কথা না বলে যোগাযোগ করতে দেবে। পরে মাস্ক বলেছিলেন, যে নিউরালিংক প্রযুক্তির একটি ফোকাস হলো পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের দক্ষতা পুনরুদ্ধার করা। তবে সায়েন্স ফিকশন পাঠকরা জানেন, মস্তিষ্কে চিপ বসিয়ে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় ব্যক্তিকে। ব্যক্তির যাবতীয় মোবাইল ডিভাইস, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি থেকে অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার কাজ করতে পারে এ ব্রেন চিপ। যা বিপদ হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের জন্য। যদি মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে চলে যায়, তখন তা ব্যক্তির সমূহ বিপদের কারণ হয়ে উঠবে।

এ কারণে অনেকে দাবি তুলছেন, মস্তিষ্কের সার্বভৌমত্বের। তারা বলছেন, মস্তিষ্ক যেন অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে না যায়। তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে মানবজীবনে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যদি এ ব্রেন চিপ যুক্ত থাকে, তাহলেও কী ঘটবে সেটা কল্পনাও করা যায় না। বিজ্ঞানের সব কাজই ভালো, তবে সব কাজের পেছনে আরেকটি খারাপ দিকও উন্মোচিত হতে থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা রোবট আবিষ্কারের বেলায় যা দেখা গেছে। মস্তিষ্কে চিপ স্থাপনের ক্ষেত্রেও এমন নেতিবাচক ফলগুলো ভয়ংকর বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে সংশয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত